শিরোনাম

একই পরিবারের ৩ রাষ্ট্রনেতা যেসব দেশে

একই পরিবারের ৩ রাষ্ট্রনেতা যেসব দেশে
বাংলাদেশের জিয়া, ভারতের নেহেরু-গান্ধী ও পাকিস্তানের ভুট্টো পরিবার। ছবি: সংগৃহীত

প্রায় দুই দশক পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে আজ নতুন সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। যার সরকারপ্রধান হচ্ছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর ফলে তারেক রহমান ও তার পরিবার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি নতুন রেকর্ড গড়ছে। বিশ্বব্যাপী যেসব রাজনৈতিক পরিবারের তিন জন সদস্য কোনো দেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন, সেই তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছেন জিয়া পরিবার।

এর আগে বাবা জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। আর মা বেগম খালেদা জিয়া দেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনা করেন। এবার ছেলে তারেক রহমান বাংলাদেশে সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন।

রাজতন্ত্র বাদে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এর আগে বেশ কিছু পরিবারের একাধিক সদস্য ক্ষমতায় এসেছেন। কোন দেশে কোন পরিবারের একাধিক সদস্য রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে, তার একটি তালিকা নিচে উল্লেখ করা হলো—

বাংলাদেশে জিয়া পরিবার

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন এবং সেনাপ্রধান হন। এরপর তাকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এ এস এম সায়েম পদত্যাগ করলে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি নিজে চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে জিয়াউর রহমান শহীদ হন।

এরপর দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন তাঁর সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন এবং তিন দফা সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গত ৩০ ডিসেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়।

মায়ের মৃত্যুর পর তারেক রহমান বিএনপির চেয়ারম্যান হন। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তার নেতৃত্বে দলটি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এর আগে, গত ডিসেম্বর মাসে ১৭ বছরের নির্বাসনের পর যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে দেশে ফেরেন তিনি। ১৯৯১ সালের পর থেকে তার প্রতিষ্ঠিত দলটি এবার পর্যন্ত চারবার ক্ষমতায় এসেছে।

ভারতে নেহরু-গান্ধী পরিবার

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে ভারত। এরপর নেহরু-গান্ধী পরিবারের তিনজন সদস্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন জওহরলাল নেহরু। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের এই নেতা সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং দেশ পনুর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৪ সালের ২৭ মে দিল্লিতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

নেহরুর পরে দায়িত্ব পান তার মেয়ে ইন্দিরা গান্ধী। তিনি দুই দফা ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রথম দফা ১৯৬৬ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯৭৭ সালের মার্চ পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় দফা ১৯৮০ সালে কংগ্রেস সরকারের নেতৃত্বে, যা ১৯৮৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত চলে। ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রথম ও একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।

১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে দুই শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে ইন্দিরা গান্ধী নিহত হন। সেইদিনই তার ছেলে রাজীব গান্ধী ৪০ বছর বয়সে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং ভারতের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রেকর্ড গড়েন। এর সাত বছর পর ১৯৯১ সালের ২১ মে তামিলনাড়ুর চেন্নাইতে নির্বাচনী প্রচারকালে একটি আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে তার মৃত্যু হয়।

পাকিস্তানে ভুট্টো-জারদারি পরিবার

পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) প্রতিষ্ঠা করেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পিপিপি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে (বর্তমান পাকিস্তান) বড় জয় পায়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা ছাড়েন এবং ২০ ডিসেম্বর নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। তার নেতৃত্বে পাকিস্তানে নতুন সংবিধান প্রবর্তন করা হয়, যার অধীনে ১৯৭২ সালের ২১ এপ্রিল তিনি দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন।

১৯৭৩ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর ভুট্টো দেশের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং ১৯৭৭ সালের ৫ জুলাই পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকেন। জেনারেল জিয়াউল হকের সামরিক শাসনামলে ১৯৭৯ সালে তাকে ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

এরপর দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন তার মেয়ে বেনজির ভুট্টো। পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত বেনজির ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তান তথা মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। এই মেয়াদে তিনি ১৯৯০ সালের আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৯৩ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৯৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত আবারও প্রধানমন্ত্রী থাকেন। ২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডির লিয়াকতবাগে নির্বাচনী সমাবেশে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে বেনজির ভুট্টো নিহত হন।

পরবর্তীতে তার স্বামী আসিফ আলী জারদারি ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রথম দফায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের মার্চ থেকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

শ্রীলঙ্কায় বন্দরনায়েকে পরিবার

এসডব্লিউআরডি বন্দরনায়েকে ছিলেন শ্রীলঙ্কার চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী। ১৯৫৬ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। এর আগে ১৯৫১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন রাজনৈতিক দল শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টি। আধুনিক শ্রীলঙ্কার (তৎকালীন সিলন) অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে তাকে গণ্য করা হয়। ১৯৫৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি আততায়ীর গুলিতে নিহত হন।

স্বামীর মৃত্যুর পর দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন তার স্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে। ১৯৬০ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন এবং বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেন। তিনি মোট চার মেয়াদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তার কন্যা চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গাও রাজনীতিতে সফল হয়েছেন এবং শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী উভয় পদেই দায়িত্ব পালন করেছেন।

থাইল্যান্ডে সিনাওয়াত্রা পরিবার

থাকসিন সিনাওয়াত্রা ২০০১ সালে থাই রক থাই পার্টি থেকে প্রধানমন্ত্রী হন এবং ২০০৬ সালের সামরিক অভ্যুত্থান পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরিবারটির আরেক সদস্য ইংলাক সিনাওয়াত্রা ২০১১ সালে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হন। তবে ২০১৪ সালে সাংবিধানিক আদালত তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দিলে তিনি পদত্যাগ করেন।

থাকসিন সিনাওয়াত্রার মেয়ে পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০২৫ সালের আগস্টে বরখাস্ত হন। পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা ঐতিহ্যবাহী সিনাওয়াত্রা পরিবার থেকে দেশের শীর্ষ পদে পৌঁছানো তৃতীয় ব্যক্তি।

উত্তর কোরিয়ায় কিম পরিবার

বাবা, ছেলে ও নাতি একই পরিবারের তিন প্রজন্মের সদস্যরা রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছানোর উদাহরণ রয়েছে উত্তর কোরিয়ায়। কিম পরিবার ১৯৪৮ সাল থেকে দেশটি শাসন করছে।

কিম ইল সাং উত্তর কোরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা এবং ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টি অব কোরিয়ার নেতা হিসেবে ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে সরকারপ্রধানের দায়িত্বে আসেন। তিনি ১৯৭২ সালে দেশের প্রেসিডেন্ট হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ১৯৯৪ সালের জুলাই পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন।

বাবার মৃত্যুর পর ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা (প্রেসিডেন্ট) হন কিম জং ইল। তিনি ২০১১ সালের ডিসেম্বরে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর কিম জং উন তার উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনিই উত্তর কোরিয়ার শাসন করছেন।

গ্রিসে পাপানড্রেউ পরিবার

ইউরোপের দেশ গ্রিসের প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবার হলো পাপানড্রেউ পরিবার। এই পরিবার থেকে তিন প্রজন্মের তিনজন ব্যক্তি দেশটির সরকারপ্রধান হয়েছেন।

নিকারাগুয়ায় সামোজা পরিবার

একই পরিবারের তিনজনের দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়ার নজির আছে নিকারাগুয়ায়। দেশটিতে এই রাজনৈতিক পরিবার ‘সামোজা পরিবার’ নামে পরিচিত।

পেরুর প্রাদো পরিবার

মারিয়ানো ইগনাসিও প্রাদো ছিলেন পেরুর এমন একজন রাষ্ট্রপ্রধান, পরবর্তী সময়ে তাঁর পরিবারের আরো দুজন দেশ শাসন করেছেন।

একই পরিবার থেকে দুজন রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান

বিশ্বের অনেক দেশে একটি রাজনৈতিক পরিবারের দুই সদস্য দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো–

যুক্তরাষ্ট্রে বাবা-ছেলে জুটি জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ও জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন।

বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার মেয়ে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছেন।

সিঙ্গাপুরে লি কুয়ান ইউ ও লি সেইন লুং।

কানাডায় পিয়েরে ট্রুডো ও জাস্টিন ট্রুডো।

ইন্দোনেশিয়ায় সুকর্ণ ও মেঘবতী সুকর্ণপুত্রী।

সিরিয়ায় বাবা-ছেলে জুটি হাফিজ আল-আসাদ ও বাশার আল-আসাদ।

লেবাননে রফিক হারিরি ও সাদ হারিরি।

কিউবায় ভাই দুইজন ফিদেল কাস্ত্রো ও রাউল কাস্ত্রো।

ফিলিপাইনে ফার্দিনান্দ মার্কোস ও ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র।

শ্রীলঙ্কায় ২০১৯-২০২২ সালের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ছিলেন গোতাবায়া রাজাপক্ষে এবং তার ভাই মাহিন্দা রাজাপক্ষে দেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।

জাপানে বাবা-ছেলে জুটি ইয়াসুও ফুকুদা ও তাকেও ফুকুদা সরকার পরিচালনা করেছেন। নেপালের প্রভাবশালী কৈরালা পরিবারের একাধিক সদস্যও দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন।

/জেএইচ/