শিরোনাম

পর্যাপ্ত মজুত, তবুও কেন সারের জন্য হাহাকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
পর্যাপ্ত মজুত, তবুও কেন সারের জন্য হাহাকার
নীলফামারীর ডোমার উপজেলার গোমনাতি বাজারের একটি গোডাউনে গোপনে মজুত করা সার

চলতি আমন মৌসুমে পর্যাপ্ত সার সরবরাহ ও কথিত সার সিন্ডিকেট ভাঙার দাবিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটছে। সার পেতে দেরি হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে এক পরিবেশকের গুদামে ভাঙচুর করেছেন ক্ষুব্ধ কৃষকরা। জেলার ভূরঙ্গামারীতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ হয়েছে। নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা বাজারে সারের গুদামে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। তবে বাধার মুখে গুদাম থেকে কেউ সার নিয়ে যেতে পারেনি। লালমনিরহাটেও মহাসড়ক অবরোধ করা হয়েছে।

কৃষি বিভাগ বলছে, বরাদ্দ বাড়লেও সার নিয়ে গুজবে বিভ্রান্ত হচ্ছেন কৃষকরা। বিশেষ করে নদীতীরবর্তী অঞ্চলের কৃষকরা আসন্ন রবি মৌসুম সামনে রেখে আগাম সার সংগ্রহে ঝুঁকছেন। এতে অতিরিক্ত চাহিদায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারের হাতে চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত সার মজুত আছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক হিসাবে দেখা যায়, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইউরিয়া সারের চাহিদা ১৪ লাখ ২৯ হাজার টন। এছাড়া টিএসপি ৪ লাখ ৬৭ হাজার টন, ডিএপি ১০ লাখ ২৩ লাখ টন এবং এমওপি সারের চাহিদা ৬ লাখ টন। সারের মোট চাহিদার পরিমাণ ৩৫ লাখ ২০ হাজার টন। এই চাহিদার বিপরীতে মজুত রয়েছে– ইউরিয়া সার ১৭ লাখ ৪৬ হাজার টন, টিএসপি ৯ লাখ ৪৫ হাজার টন, ডিএপি ১৩ লাখ ৮৪ হাজার টন এবং এমওপি ১১ লাখ টন। মোট মজুতের পরিমাণ প্রায় ৫১ লাখ ৮৩ হাজার টন। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারের সংগ্রহে উদ্বৃত্ত রয়েছে প্রায় ১৬ লাখ ৬৩ হাজার টন।

কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, সার নিয়ে জেলা পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নানা অপ্রচারও রয়েছে। ‘সার নেই’ এমনটি প্রচার করে তারা কৃষকদের উত্তেজিত করে তুলেছে। এছাড়া আসন্ন রবি মৌসুমকে কেন্দ্র করে কৃষকরা অধিক পরিমাণ সার মজুত করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির পেছনে এক শ্রেণির ডিলার, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীও জড়িত। সার নিয়ে সরকারের নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের সুবিধাভোগীরা। পরিকল্পিতভাবে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত তারা। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে সার পাচারের চেষ্টাও করছে। এছাড়া নতুন নীতিমালার আলোকে বিসিআইসি ডিলারদের একচেটিয়া ব্যবসা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা ও কৃষকদের কাছ থেকে কিছু খুচরা বিক্রেতারা সারের অতিরিক্ত মূল্য নিচ্ছে।

বরাদ্দের অর্ধেক উত্তোলন

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জুলাই এবং আগস্টে ডিলাররা ইচ্ছা করে সরকারি গুদাম থেকে বরাদ্দের অর্ধেক সার উত্তোলন করেন। ১৫ জেলার কৃষি কর্মকর্তারা এ ঘটনাটি কৃষি মন্ত্রণালয়কে অবহিত না করে গোপন রাখেন। পরপর দুই মাস সার অর্ধেক উত্তোলন করায় বাজারে সারের সংকট সৃষ্টি হয়। পরে কৃষি মন্ত্রণালয় অনুসন্ধান করে দেখেছে, পরিকল্পিতভাবে সরকারি গুদাম থেকে বরাদ্দকৃত সার উত্তোলন না করে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা চালানো হয়েছে।

এ কারণে এরইমধ্যে ১৫ জেলার কৃষি কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে। এছাড়া চারজন জেলা কৃষি কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার এবং আরও চারজনকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সল ইমাম এবং যুগ্ম সচিব ড. মো. জাহাঙ্গীর আলমকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, সার নিয়ে জেলা পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নানা অপ্রচারও রয়েছে। ‘সার নেই’ এমনটি প্রচার করে তারা কৃষকদের উত্তেজিত করে তুলেছে। এছাড়া আসন্ন রবি মৌসুমকে কেন্দ্র করে কৃষকরা অধিক পরিমাণ সার মজুত করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিলাররা আগে থেকে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বেশি দামে সার বিক্রি করতেন। বর্তমানে খুচরা বিক্রি বন্ধ। ফলে খুচরা বিক্রেতারা ভাড়াটে শ্রমিক সাধারণ কৃষকদের সঙ্গে লাইনে দাঁড় করিয়ে সার সংগ্রহ করছেন। তারা একবার সার নিয়ে ফের লাইনে দাঁড়ান। সার সংগ্রহ করে অবৈধ মজুত করছেন। তাদের কারণে অনেক সময় কৃষকরা সার থেকে বঞ্চিত হন। এই অনুপ্রবেশকারীরা ভিড়ে প্রবেশ করে হঠাৎ উসকে দিয়ে বিক্ষোভ সৃষ্টি করে।

ডিলার সিন্ডিকেট

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের আমলে একটি ইউনিয়নে একজন ডিলার ছিলেন। ডিলারের কাছ থেকে নিয়ে খুচরা বিক্রেতারা সার বিক্রি করতেন। এ প্রক্রিয়ায় একই ডিলার একাধিক ইউনিয়নে নিজের মা, বাবা, ছেলে, মেয়ের নামে ডিলারপিশ নিয়ে এক চেটিয়া ব্যবসা করেছেন। বর্তমান সরকার নতুন করে ডিলার নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন করে এবং সার বরাদ্দের এখতিয়ার কৃষি মন্ত্রণালয়ের হাতে নিয়ে আসে। এতে ডিলারদের একটি অংশ ক্ষুব্ধ হয় এবং সার সংকট সৃষ্টিতে তৎপর হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নতুন নীতিমালায় একটি ইউনিয়নে ৩ জন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়া ৬ জন খুচরা বিক্রেতা নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে। আগে থেকে যারা খুচরা বিক্রেতা ছিলেন, তাদের মধ্যে থেকে দুইজন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আর ৬ জন খুচরা বিক্রেতা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে একজনের স্থলে তিনজন ডিলার ব্যবসায় বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছে। এ কারণে আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া ঠিকাদারা ক্ষুব্ধ হয়েছে। এছাড়া ৬ জন খুচরা বিক্রেতা ব্যবসার সুযোগ পাওয়ায় অনেকের লাভে ভাগ বসেছে। ফলে তারও ক্ষুব্ধ হয়ে সার সংকট তৈরির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কৃষি বিভাগ বলছে, সারের সংকট নেই। চলতি আমন মৌসুমে সারের প্রয়োজনীয়তা শেষ পর্যায়ে। মাসভিত্তিক বরাদ্দ ও সরবরাহ স্বাভাবিক। কিন্তু সামনে সারের সংকট দেখা দিতে পারে– এমন একটি গুজব থেকে কৃষকদের মধ্যে এক ধরনের আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলবেষ্টিত এলাকার কৃষকদের মধ্যে এ আস্থার সংকট প্রবল। তারা ভাবছেন, সামনে ভুট্টা ও আলু চাষের সময় সারের সংকট দেখা দিতে পারে। ফলে এখন থেকে সার সংগ্রহ করে মজুতের চেষ্টা করছেন।

/এফসি/