শিরোনাম

গিগাবিট বিশ্বে ধীরগতিতে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
গিগাবিট বিশ্বে ধীরগতিতে বাংলাদেশ
প্রতীকী ছবি

উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো যখন গিগাবিট গতির ইন্টারনেটের ওপর ভর করে ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণ করছে, তখন বাংলাদেশ ধীরগতির ইন্টারনেট, সীমিত ব্যবহার এবং দুর্বল ডিজিটাল অবকাঠামোর চ্যালেঞ্জে আটকে আছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চগতির ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট নিশ্চিত না হলে বিনিয়োগ, রপ্তানি, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল পেমেন্ট, স্টার্টআপ থেকে শুরু করে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হবে।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্টারনেট এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। পুরো বাংলাদেশে ইন্টারনেটে সংযোগের আওতায় এলেও বাস্তবে মাত্র ৫৩ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ নেটওয়ার্ক থাকলেও প্রতি নয়জনের মধ্যে তিনজন এখনো ইন্টারনেটের বাইরে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ। গত এক বছরে এ হার ৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৯ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে ব্যবহারকারী বাড়লেও সে অনুপাতে বাড়েনি ইন্টারনেটের গতি ও সেবার মান।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, মোবাইল ইন্টারনেট গতিতে বিশ্বের ১০৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯১তম। ফিক্সড ব্রডব্যান্ড গতিতে ১৪১টি দেশের মধ্যে অবস্থান ৯৩তম। বর্তমানে দেশে মোবাইল ইন্টারনেটের মধ্যম গতি প্রায় ৪৩ মেগাবিট প্রতি সেকেন্ড (এমবিপিএস) এবং ব্রডব্যান্ডের গতি প্রায় ৬৬ এমবিপিএস। বিপরীতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে মোবাইল ইন্টারনেটের গতি ৬৮১ এমবিপিএস এবং সিঙ্গাপুরে ব্রডব্যান্ডের গতি ৪২১ এমবিপিএস। এমনকি নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ ভিয়েতনামও মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড-উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে।

বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের সবচেয়ে বড় বাধা অবকাঠামোর অভাব নয়; বরং উচ্চমূল্যের স্মার্ট ডিভাইস, ব্যয়বহুল ডেটা প্যাকেজ এবং ডিজিটাল স্বাক্ষরতার ঘাটতি। এ কারণে নেটওয়ার্ক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো ডিজিটাল সেবার বাইরে রয়ে গেছে।

ধীরগতির ইন্টারনেটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে ডিজিটাল অর্থনীতিতে। অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, কিউআর কোডভিত্তিক পেমেন্ট, পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) লেনদেনসহ প্রায় সব ধরনের ক্যাশলেস সেবা নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগের ওপর। সংযোগ দুর্বল হলে লেনদেনে বিলম্ব, পেমেন্ট ব্যর্থ হওয়া কিংবা একই লেনদেন একাধিকবার সম্পন্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। যা গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের আস্থা কমিয়ে দেয়।

ওয়ান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহিত রহমান বলেন, নির্ভরযোগ্য ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট ছাড়া কার্যকর ক্যাশলেস সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। প্রয়োজনে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন থাকলেও লেনদেন চালিয়ে নেওয়ার মতো বিকল্প প্রযুক্তি উদ্ভাবনের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, গত সাত-আট বছরে মোবাইল ইন্টারনেট অবকাঠামোয় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ায় ফোরজি নেটওয়ার্কের গুণগত উন্নয়ন হয়নি। এ সময় প্রতিবেশী অনেক দেশ ফাইভজি প্রযুক্তিতে এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশ এখনো মোবাইল ইন্টারনেটের মানোন্নয়নে পিছিয়ে রয়েছে।

প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও স্মার্ট টেকনোলজিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহিরুল ইসলাম বলেন, আধুনিক ব্যবসার প্রায় সব কার্যক্রম-ক্লাউডভিত্তিক সেবা, ইআরপি, কাস্টমার সাপোর্ট ও সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনা-ইন্টারনেট নির্ভর। সংযোগ ধীর হলে উৎপাদনশীলতা কমে যায় এবং সেবা দিতে বিলম্ব হয়। তাই শুধু ইন্টারনেটের বিস্তার নয়, এর গতি, স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইডথের মানও উন্নত করা জরুরি।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতি দ্রুত ডিজিটাল অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ১২ শতাংশ রপ্তানি ডিজিটাল নির্ভর। ফলে ইন্টারনেটের গতি কম থাকলে রপ্তানি, আর্থিক লেনদেন ও প্রযুক্তিভিত্তিক সেবার সম্প্রসারণ ব্যাহত হবে।

তিনি বলেন, এখনই দেশে ডিজিটাল অর্থনীতিতে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটানোর সময় এসেছে।

অন্যদিকে, সরকার বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে তৃতীয় সাবমেরিন কেবল, ফাইভজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং উচ্চগতির স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের ডিজিটাল সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে এবং বিনিয়োগ, ব্যবসা ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

/এসবি/