শিরোনাম

কমছে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন, এলএনজিতেও মিলছে না স্বস্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
কমছে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন, এলএনজিতেও মিলছে না স্বস্তি
প্রতীকী ছবি

দেশের গ্যাস খাত উৎপাদন সংকট, আমদানি সীমাবদ্ধতা ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। অন্যদিকে, এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়লেও সেই চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত অবকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্যবৃদ্ধি এবং কাতার থেকে সরবরাহ অনিশ্চয়তা যুক্ত হওয়ায় সংকট আরও গভীর হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, স্থানীয় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে এই পরিস্থিতি থেকে দ্রুত বের হওয়ার বাস্তবসম্মত উপায় নেই।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে গ্যাস সরবরাহ থাকে ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তা কমে প্রায় ২ হাজার ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন, আবাসিক গ্রাহক এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মেরামত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে এটি কবে পুরোপুরি চালু হবে, সে বিষয়ে এখনই নির্দিষ্ট সময় বলা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, পুরোনো গ্যাসকূপ সংস্কারের পরও প্রত্যাশিত উৎপাদন মিলছে না। একই সঙ্গে দেশের সবচেয়ে বড় উৎপাদক মার্কিন প্রতিষ্ঠান শেভরনের উৎপাদনও প্রতিবছর কমছে। যা সামগ্রিক সরবরাহের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন গড়ে প্রায় ১৫ কোটি ঘনফুট কমে যাচ্ছে। এর মধ্যে শেভরনের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকেই উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে প্রায় ১২ কোটি ঘনফুট। অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোর উৎপাদন কমছে প্রায় ৩ কোটি ঘনফুট। চলতি বছরের মার্চের শুরুতে শেভরনের বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক ৮১৫-৮২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হলেও জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে তা নেমে এসেছে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু স্থানীয় উৎপাদন এবং দুটি এলএনজি টার্মিনাল মিলিয়ে গড়ে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে মাত্র ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এই ঘাটতি আমদানি দিয়ে পূরণ করাও সহজ নয়, কারণ বিদ্যমান এলএনজি অবকাঠামো বাড়তি গ্যাস গ্রহণ ও সরবরাহের সক্ষমতা রাখে না।

এদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারেও এলএনজির দাম ঊর্ধ্বমুখী। জাপান-কোরিয়া মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ২১ দশমিক ৪৫ ডলারের ওপরে উঠেছে। যা পাঁচ মাস আগে ছিল প্রায় ১০ দশমিক ৬০ ডলার। ফলে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার এনার্জি থেকে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪০ কার্গো এলএনজি আসে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে দেশটির এলএনজি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আগামী কয়েক বছর চুক্তিভিত্তিক সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গ্যাস সংকট মোকাবিলায় একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তাব নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ১০০টি নতুন কূপ খননের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসব কূপ থেকে প্রত্যাশিত পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বর্তমান সংকট দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীনতার ফল। শুধুমাত্র এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের সক্ষমতা বাড়ানোই হতে পারে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

/এসবি/