শিরোনাম

বাজেটে সবার জন্য কম-বেশি বরাদ্দ আছে: অর্থমন্ত্রী

বাজেটে সবার জন্য কম-বেশি বরাদ্দ আছে: অর্থমন্ত্রী
রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

সব শ্রেণি, পেশা, ধর্ম ও বর্ণের-সবাই বিএনপি সরকারের প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আওতায় আছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

শুক্রবার (১২ জুন) বিকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব কথা বলেন। এর আগে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী।

অর্থমন্ত্রী এ সময় বলেন, ‘বাজেট বলতে মূলত জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলনের কথা বলি। আমাদের সংবিধানও বলা হয়েছে জনগণের ইচ্ছায় জনগণের সম্মতিতে দেশ চালাতে।’ এই সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা অনেক উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর জন্য আমরা চেষ্টা করেছি সবার সঙ্গে কথা বলতে, সবার মতামত নিতে। যতটুকু সম্ভব আমরা পুরোপুরিভাবে চেষ্টা করেছি।’

সেজন্য এই বাজেটের প্রেক্ষাপট একটু ভিন্ন উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে আমাদের বাজেট চিন্তায় ছিল বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মানুষকে নিয়ে আসার। তাদের জীবনযাত্রার মান, তাদের ভবিষ্যৎ সবসময় বাজেটে প্রতিফলিত হয় না। এবারের বাজেটে আমরা চেষ্টা করেছি সবাইকে আনার। আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে কোনো শ্রেণি, পেশা, ধর্ম, বর্ণের কেউ এই বাজেটের আওতার বাইরে আছে বলে আমি মনে করি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় দেশের সম্পদ লুণ্ঠন হয়েছে, দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে দেওয়া হয়েছে, অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় চলে গেছে। রাজনৈতিক অধিকার, সামাজিক অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। আমরা এই সীমাবদ্ধতার মধ্যে উচ্চ-আকাঙ্ক্ষা এবং একটি অন্তভূক্তিমূলক বাজেট করার চেষ্টা করেছি।’

মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের এই সীমিত সম্পদের মধ্যে সবার জন্য কম-বেশি বরাদ্দ দেওয়া আছে, প্রোগ্রাম দেওয়া আছে এবং রোডম্যাপ দেওয়া আছে। শুধু পলিসি বা নীতিমালা নয়, আমরা রোডম্যাপও দিয়েছি। এটা বাস্তবায়ন করতে গেলে আমাদের কী করতে হবে, সেটাও পরিষ্কারভাবে বলা বলা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন জ্বালানি খাতে বড় অভিঘাত এসেছে। তাছাড়া আগের যা আমরা ইনহেরিট করেছি, সেই প্রেক্ষাপটে বাজেট করতে গিয়ে সবার কথা মাথায় রেখে সবার জন্য বাংলাদেশ বা অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়নের মৌলিক নৈতিক ভিত্তি আমাদের বিবেচনায় ছিল।

মূল্যস্ফীতি কমাতে নীতি বাস্তবায়নের ওপর ‘ভরসা’

কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতির ধকলের মধ্যে দিয়ে যাওয়া মানুষকে স্বস্তি দিতে নীতি বাস্তবায়নের ওপর ‘ভরসা’ রাখতে চান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আমাদের পলিসিগুলো যদি আমরা ঠিকমতো বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন হবে বলে আমি মনে করি না।’

নতুন অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৭ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্যের কথা বলেছেন তিনি। যদিও সবশেষ মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে সাড়ে ৯ শতাংশের কাছাকাছি চলে গেছে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘মূল্যস্ফীতিটা গত বেশ কয়েক বছর ধরে বাড়তে বাড়তে ৯ শতাংশের উপরে তিন বছর ধরে চলছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের বিষয়টা। আপনারা জানেন ব্যাংকগুলোতে যেহেতু বিরাট একটা মূলধন ঘাটতি রয়ে গেছে লুটপাটের কারণে, ঋণ নেওয়ার কারণে। সেসব কারণে তহবিল খরচ কিন্তু অনেক বেশি রয়ে গেছে, এটার প্রতিফলন কিন্তু মূল্যস্ফীতিতে পড়ছে।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমদানি করা পণ্যের দাম যুদ্ধের কারণে আরো বাড়ছে। সুতরাং আমরা আশা করছি যে আগামী দিনে আমরা যে রিফর্মের কথাগুলো বলেছি, তার মাধ্যমে ব্যবসার খরচ কমানোর চেষ্টা করছি।’

ইতোমধ্যে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে মূল্যস্ফীতিতে আবার প্রভাব পড়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, তেলের মূল্য বাড়ানো মানে পরিবহন মূল্য বাড়বে এবং সব ক্ষেত্রে এটার একটা প্রতিফলন পড়বে। সুতরাং বাইরের যে মূল্যস্ফীতিটা আসছে (আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি) এটাকে মোকাবিলা করা কঠিন। কিন্তু আমাদের অভ্যন্তরীণ যে জায়গাগুলো নিয়ন্ত্রণ করলে ব্যবসার খরচ কমবে সেই জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে।

বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি হলে দুর্নীতি কমবে বলে আশা করছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, তাই বেতন সমন্বয় করা জরুরি। স্বাভাবিকভাবে মানুষের যখন অভাব থাকে তখন দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়ার একটা প্রবণতা থাকে। এটা তো অস্বীকার করে লাভ নেই।

অর্থমন্ত্রী বলেন, গত ১১ বছর ধরে পে-স্কেল নেই,‘ কিন্তু এর মধ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ফলে সরকারি কর্মচারীদের ব্যয় মেটাতে সমস্যা হচ্ছে। বেসরকারি খাতে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বেতন বাড়লেও সরকারি খাতে সে সমন্বয় হয়নি। আমরা আশা করছি বেতন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতি স্বাভাবিকভাবে কমবে। তাদের যখন আয় বাড়বে, তাদের যখন জীবন যাত্রা একটু উন্নত হবে। তখন নিশ্চয়ই দুর্নীতি কমবে।’

ঢাকার বাইরে পর্যটন ‘হাব’ হচ্ছে

পর্যটক টানতে ঢাকার বাইরে একটি ‘হাব’ তৈরির কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, যেখানে থিয়েটার থেকে শুরু করে বিনোদনের সব ধরনের ব্যবস্থা থাকবে।

বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতির উন্নয়নে প্রাথমিকভাবে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বরাদ্দ থেকে পর্যটন খাতও চাইলে অর্থ পাবে। এছাড়া সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর খাত থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ করার পরিকল্পনা আছে সরকারের।

সৃজনশীল অর্থনীতি কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সৃজনশীল অর্থনীতি নিয়ে যে কাজটা আমরা করতে চাচ্ছি তার মধ্যে ঢাকাসহ দেশের সব জায়গায় বড় উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি আছে। ৮০০ কোটি টাকা দিয়ে আমরা শুরু করছি এই কাজ, যেটা কোনোদিন বাংলাদেশে কেউ চিন্তাও করেনি। ‘

বাংলাদেশে ‘ধর্মীয় পর্যটনের’ সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে ধর্মীয় পর্যটন হতে পারে। বৌদ্ধদের অনেক কিছু আছে। যারা এখানে আসবে, এগুলোকে আমরা কোনোদিন ‘রিস্টোর’ করি নাই। কোনোদিন এই সাইটগুলোকে ওইভাবে ডেভেলপ করি নাই। ওইখানে কোনো অবকাঠামো তৈরি করি নাই। আমাদের এই তালিকার মধ্যে সেটাও আছে।”

বিকাল ৩টা ১০ মিনিটে সংবাদ সম্মেলন শুরু হয়। এতে অর্থমন্ত্রী ছাড়াও তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন ও বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, ডাক-টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ প্রমুখ।

/বিবি/