শিরোনাম

অনিশ্চিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, বিকল্প হতে পারে যে কৌশল

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
অনিশ্চিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, বিকল্প হতে পারে যে কৌশল
নির্যাতন ও সহিংসতার মুখে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। মিয়ানমারে নির্যাতন ও সহিংসতার মুখে পালিয়ে আসা প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ শুধু মানবিক দায়িত্বই পালন করেনি, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ উদ্যোগ ছিল সরকার ও সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষের সহমর্মিতার প্রতিফলন।

তবে প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনও অধরাই রয়ে গেছে। মিয়ানমারের চলমান অস্থিরতা, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব সংকট এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা না থাকায় স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। যদিও প্রত্যাবাসনই এই সংকটের একমাত্র ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই সমাধান, তবু দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশকে এখন একটি অন্তর্বর্তীকালীন কৌশল গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, কেবল আন্তর্জাতিক ত্রাণ সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে সমাধান নয়। বরং রোহিঙ্গাদের জন্য শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা উচিত। কারিগরি প্রশিক্ষণ, হস্তশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, ডিজিটাল দক্ষতা, সেলাই ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো বিভিন্ন পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ তাদের আত্মনির্ভরশীল হতে সহায়তা করতে পারে। এছাড়া যথাযথ তদারকির মাধ্যমে ক্ষুদ্র শিল্প ও কৃষিভিত্তিক প্রকল্প গড়ে তোলার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। এতে রোহিঙ্গারা অর্থবহ কাজে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা থেকে সৃষ্ট হতাশা, অপরাধ ও উগ্রপন্থার ঝুঁকিও কমবে।

তারা বলেন, রোহিঙ্গা সংকট কেবল বাংলাদেশের নয়; এটি একটি বৈশ্বিক মানবিক সংকট। অতীতে আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের শরণার্থীদের তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের নজির রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে ঝুঁকিপূর্ণ ও যোগ্য রোহিঙ্গাদের জন্য তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগ অনুসন্ধান করতে পারে।

পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমঘাটতি থাকা দেশগুলোতে বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ভ্রমণ নথি ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাংলাদেশি নাগরিক নয়, বরং শরণার্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক দাতাদের আগ্রহ ও সহায়তা ক্রমেই কমছে। ভবিষ্যতে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা হঠাৎ কমে গেলে রোহিঙ্গা শিবির ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী উভয়ের জন্যই বড় ধরনের নিরাপত্তা ও মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে। তাই সংকট আরও গভীর হওয়ার আগেই বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।

তবে এসব অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা কোনোভাবেই প্রত্যাবাসনের বিকল্প নয়। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছাসেবী ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই চূড়ান্ত লক্ষ্য। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে এমন একটি দ্বিমুখী কৌশল গ্রহণ করতে হবে, যেখানে একদিকে আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা বিবেচনায় আত্মনির্ভরশীলতা, আন্তর্জাতিক দায়ভার ভাগাভাগি এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

/এসবি/