শিরোনাম

বিএনপির ৬ মাসে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটেনি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
বিএনপির ৬ মাসে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটেনি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে দেশে কোনো গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

বাগেরহাটের মোংলায় নিখোঁজ মিরাজ শেখের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঘটনাটি স্বাধীনভাবে তদন্ত করা হয়েছে। তদন্তে বনদস্যুদের সঙ্গে মিরাজের সংশ্লিষ্টতা এবং তাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে।

মিরাজ শেখকে গুম করা হয়েছে—এমন অভিযোগের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মিরাজ শেখের রেকর্ডও সেই রকম। তার বাবা ও দাদার রেকর্ডও একই রকম। এ বিষয়ে এর বেশি বিস্তারিত আর বলতে চাই না।’

আজ শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর শাহবাগ জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ‘নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনতে বা তাদের সন্ধান পেতে চাই আইন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকার’ শীর্ষক অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’।

গুম প্রতিরোধে নতুন আইন

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শুধু কমিশন গঠন করলেই গুমের সমস্যার সমাধান হবে না। ভুক্তভোগীরা যাতে আদালতের দ্বারস্থ হয়ে বিচার ও প্রতিকার পান, সেই লক্ষ্যেই গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৬ করা হয়েছে।

আইনে গুমের সংজ্ঞা, অপরাধের ধরন, শাস্তি এবং তদন্তের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তি ফিরে না এলে তার উত্তরাধিকারীরা যাতে সম্পত্তির অধিকার পান এবং পরিবার পরিচালনা করতে পারেন, সে ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে। দায়ী ব্যক্তিদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব না হলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও তা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে।

আইনটি নিয়ে কারও পরামর্শ বা সংশোধনের প্রস্তাব থাকলে তা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার ভাষ্য, বিভিন্ন পক্ষ, জাতিসংঘের প্রতিনিধি, কূটনৈতিক মিশন ও মানবাধিকারকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেই আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। জাতীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের চেষ্টা করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে আইনটি সংশোধন করা যাবে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিয়েও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেই নতুন আইনটি করা হয়েছে এবং কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কারের উদ্যোগ

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংস্কারে কাজ করছে। বাহিনীগুলোর মনোবল ও পেশাদারত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি পুরস্কার ও শাস্তির ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।

সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় বিশেষায়িত বাহিনী গঠন, গোয়েন্দা সহায়তা বৃদ্ধি এবং সাইবার গোয়েন্দা সক্ষমতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এসব বাহিনীতে মানবাধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

মিরাজের ঘটনায় স্বাধীন তদন্তের দাবি

অনুষ্ঠানে মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন গুমসংক্রান্ত সাবেক তদন্ত কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন। তিনি বলেন, তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নিয়েছেন এবং ডিজিটাল তথ্য যাচাই করেছেন। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা পেয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।

নূর খান বলেন, মিরাজের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো আইনি পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বরং অভিযোগ অস্বীকার করতে বিভিন্ন বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষ ও সাক্ষীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

গুমের শিকার ব্যক্তিরা প্রতিটি মুহূর্ত অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুভয়ের মধ্যে কাটান উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক কারণে তাদের নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য সেই কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়।

নতুন গুমবিরোধী আইনের বিষয়ে নূর খান বলেন, গুমের ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অভিযুক্ত বাহিনীর অধীনে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া উচিত নয়। মানবাধিকার কমিশন, পুলিশের বাইরে কোনো স্বাধীন সংস্থা অথবা অন্য কোনো স্বতন্ত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

মিরাজ শেখের ঘটনায় পুলিশ ও কোস্টগার্ডের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করার দাবি জানান।

আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে আপত্তি

সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান বলেন, নতুন গুমবিরোধী আইনের ১৪, ১৯ ও ২১ ধারা স্বাধীন তদন্তের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে। তিনি দ্রুত এসব ধারা বাদ দেওয়ার দাবি জানান।

গুমের মামলার বিচার দ্রুত শেষ করতে পর্যাপ্ত অর্থ ও জনবল নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সম্মানজনক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থারও দাবি জানান তিনি।

অন্যদিকে সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, আগে গুমের শিকার পরিবারগুলো আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটালেও এখন তারা সম্মানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালন করতে পারছেন। তার দাবি, বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক মানের গুমবিরোধী ও মানবাধিকার কমিশন আইন করেছে। সঠিক বিচারের মাধ্যমে গুমের সংস্কৃতির অবসান হবে।

আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদেরও বিভিন্নভাবে হয়রানি ও বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। তাদের চাকরি ও শিক্ষার সুযোগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে, এমনকি ব্যাংক হিসাবও নজরদারিতে রাখা হয়েছে। মানবাধিকার নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রেও তাদের ভয় দেখানো হয়েছে।

গুমের ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রস্তাবিত আইনে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র তদন্তব্যবস্থা রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বাবার সন্ধান চান আদিবা

নিখোঁজ বাবা পারভেজ হোসেনের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার মেয়ে আদিবা ইসলাম। তিনি বলেন, তার বাবার কী পরিণতি হয়েছে, সেটি তারা জানতে চান। এটি কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়। বাবা কোথায় আছেন বা কেমন আছেন, কিছুই তারা জানেন না।

দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে করতে তারা ক্লান্ত উল্লেখ করে আদিবা বলেন, আর এভাবে অপেক্ষা ও কান্নার মধ্যে থাকতে চান না তারা। বাবার বিষয়ে দ্রুত একটি জবাব চান।

অনুষ্ঠানে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলামের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের হিউম্যান রাইটস অফিসার জাহিদ হোসেন, নেত্র নিউজের নির্বাহী সম্পাদক নাজমুল আহসান এবং গুমের শিকার বিভিন্ন ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা।

আলোচনা অনুষ্ঠানের পাশাপাশি জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে ‘বলপূর্বক অন্তর্ধান’ নিয়ে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। ‘যতদিন না তারা ফিরছে’ শিরোনামের প্রদর্শনীটির সমন্বয় করে নেত্র নিউজ।

/এমআর/