মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জড়ানোর শঙ্কায় পাকিস্তান

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জড়ানোর শঙ্কায় পাকিস্তান
পাকিস্তানের করাচিতে আগস্ট মাসে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে একটি বিলবোর্ড। ছবি: গার্ডিয়ান

গত বছরের সেপ্টেম্বরে রিয়াদের মাটিতে দাঁড়িয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের কাছে বিশ্ব পরিস্থিতি অন্য রকম মনে হয়েছিল। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরকে বড় এক কূটনৈতিক বিজয় বলে মনে করেছিলেন। ওই চুক্তির মাধ্যমে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত পাকিস্তান যেমন মোটা অঙ্কের অর্থ ও বিনিয়োগ পাওয়ার পথ তৈরি করেছিল, তেমনি বিনিময়ে সৌদি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সৌদি ভূখণ্ডে হামলা হলে পাকিস্তানের মাঠে নামার শর্তও যুক্ত হয়েছিল। তখন হিসাবটা সহজ ছিল- যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সুসম্পর্ক বজায় থাকবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে বড় কোনো যুদ্ধের আশঙ্কা নেই।

ইয়েমেনের সানায় হুথি বিদ্রোহী যোদ্ধারা
ইয়েমেনের সানায় হুথি বিদ্রোহী যোদ্ধারা

চোখের পলকে বদলে যাওয়া সমীকরণ

কিন্তু সেই হিসাব বেশি দিন সহজ থাকলো না। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতেই পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালালে তেহরানও পাল্টা জবাবে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়তে শুরু করে। এর প্রভাবে ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে রিয়াদের পুরোনো সংঘাত নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। চলতি মাসের শুরুতে হুথিরা ইয়েমেনে বড় ধরনের ভূখণ্ডগত সাফল্য পাওয়ার পাশাপাশি সৌদি ভূখণ্ডে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। জবাবে সৌদি আরবও ইয়েমেনে বিমান হামলা জোরদার করে।

অনেকেই মনে করছেন, এ অঞ্চলে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হওয়া এখন সময়ের অপেক্ষা। আর এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন জেনারেল আসিম মুনির। আগস্টের প্রতিরক্ষা চুক্তিতে তুরস্ককে যুক্ত করে নাম দেওয়া হয় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’। চুক্তি অনুযায়ী, ৩ দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা মানে বাকি দুটির ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে। এ প্রসঙ্গে লন্ডনের কিংস কলেজের জ্যেষ্ঠ ফেলো ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আয়েশা সিদ্দিকা বলেছেন, ‘আমার মনে হয় না আসিম মুনির আঞ্চলিক ঝুঁকির মাত্রা সঠিক হিসাব করতে পেরেছিলেন। পাকিস্তানের সৈন্যদের এত দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রে নামাতে হতে পারে, তা তিনি হয়তো ভাবেননি।’

সৌদির কাছে উন্নত অস্ত্রশস্ত্র থাকলেও হুথিদের মতো বিদ্রোহীদের মোকাবিলার অভিজ্ঞতা তাদের কম। অন্যদিকে, ভারতের মতো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অভ্যস্ত পাকিস্তানি সেনা এ রণক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। রিয়াদ যদি এ চুক্তি কার্যকরের চাপ দেয়, তবে পাকিস্তানের সামনে সেনা পাঠানো ছাড়া বিকল্প থাকবে না। অর্থনৈতিকভাবেও পাকিস্তান এখন সম্পূর্ণ সৌদি সাহায্যনির্ভর, যারা সম্প্রতি ৮ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা দিয়েছে। দেশটির মন্ত্রী ও সামরিক কর্তারা প্রকাশ্যে সৌদি নিরাপত্তায় ‘নিঃশর্ত’ সমর্থনের কথা বললেও ভেতরে ভেতরে এ যুদ্ধে জড়ানো নিয়ে তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।

শিয়া-সুন্নি উত্তেজনার শঙ্কা

এ যুদ্ধে জড়ানো মানেই ইরানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সরাসরি অবস্থান নেওয়া, যা তেহরানের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কে ফাটল ধরাচ্ছে। তাছাড়া, হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামলে দেশের ভেতরেই ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। পাকিস্তানে বিপুল শিয়া জনগোষ্ঠীর বসবাস থাকায় সুন্নি-শিয়া উত্তেজনার পারদ চড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। আফগান তালেবানের সঙ্গে ইরানের সুসম্পর্ক থাকায় সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানি তালেবানদের উৎপাতও আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে। পাশাপাশি বেলুচিস্তানেও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নতুন মাত্রা পেতে পারে।

পাকিস্তান সিনেটের বিরোধীদলীয় নেতা রাজা নাসির আব্বাস সতর্ক করে বলেছেন, ‘পাকিস্তান যদি এ যুদ্ধে জড়ায়, তবে তা দেশের জন্য মহাবিপর্যয় নিয়ে আসবে। আমরা ইতোমধ্যে দুটি রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ সামলাচ্ছি। অর্থনীতি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী। এই সংঘাতের এক পক্ষে যোগ দিলে দেশে চরম বিশৃঙ্খলা ও ধর্মীয় মেরুকরণ তৈরি হবে।’ তিনি আরও জানান, এ চুক্তির শর্তগুলো সামরিক বাহিনীর হাতেই বন্দি, যা পার্লামেন্টেও তোলা হয়নি।

এপ্রিল মাসে জেনারেল আসিম মুনির মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্সকে ইসলামাবাদে স্বাগত জানান
এপ্রিল মাসে জেনারেল আসিম মুনির মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্সকে ইসলামাবাদে স্বাগত জানান

শেষ রক্ষা কি হবে

এখন পর্যন্ত চুক্তি সক্রিয় করার মতো সুনির্দিষ্ট কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। ইসলামাবাদ আশা করছে, রিয়াদ সরাসরি ইরানের সঙ্গে সর্বাত্মক যুদ্ধে যাবে না। চুক্তির আরেক অংশীদার তুরস্কও এ ঝামেলায় জড়াতে নারাজ। ‘পাক ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজ’-এর পরিচালক মুহাম্মদ আমির রানা বলেছেন, ‘ইয়েমেনের মাটিতে যেকোনো ধরনের পদক্ষেপে এড়াতে পাকিস্তান তার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি যুবরাজ নিজেও এই মুহূর্তে চুক্তিটি কার্যকর করতে খুব একটা আগ্রহী নন। তিনি বলেন, ‘সৌদি আরব যদি স্থলবাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়, পাকিস্তান হয়তো তাদের সহায়তা দেবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ সংকেত ছাড়া সৌদি আরব হুথিদের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করবে না। ট্রাম্প প্রশাসনও এই মুহূর্তে নতুন কোনো যুদ্ধের ফ্রন্ট খুলতে আগ্রহী নয়। তারা হুথিদের সঙ্গে আলোচনার পথই খোলা রাখতে চায়।’

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

/এমএকে/