এক্সপ্লইনার

ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর বিমানবন্দরে হামলা করলে কী ঘটতে পারে

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
 ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর বিমানবন্দরে হামলা করলে কী ঘটতে পারে
ইরান এয়ারের একটি বিমান অবতরণ করেছে

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার জেরে ইরানি বিমান সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক চলাচল বন্ধ করতে গেলে প্রতিবেশী দেশগুলোকে কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। প্রায় সাত মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ চরম বিপর্যস্ত। এর মধ্যে ইরানের এ নতুন হুমকি পুরো অঞ্চলের ভ্রমণ শিল্প এবং বিমান চলাচলে আরও বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে।

প্রতিবেশীদের প্রতি তেহরানের কড়া বার্তা

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মহসিন রেজাই রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের চাপিয়ে দেওয়া এ পদক্ষেপে সহযোগিতা করলে তেহরানও হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না।

এ বিষয়ে তিনি জানান, ‘আমি আমাদের সকল প্রতিবেশী দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের এই দুঃসাহসিক অভিযানে জড়িত না হওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। এই দুঃসাহসিক অভিযান খুব শীঘ্রই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।’

মার্কিন অর্থ দপ্তর সম্প্রতি ইরানের বিমান শিল্পকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করতে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। মাহান এয়ারসহ মোট ২৭টি ইরানি বিমান সংস্থাকে এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, যেসব বিমানবন্দর বা পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা ইরানি বিমানকে জ্বালানি, অবতরণ সুবিধা কিংবা টিকিট বিক্রির মতো সেবা দেবে, তারাও মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। এর পরপরই ইরানি বিমান সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়। এ প্রসঙ্গে রেজাই বলেন, ‘যদি কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতা করে বা তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের সংঘাতে জড়ায়, তাহলে তাদের বিমানবন্দরগুলো আর ইরানে ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারবে না।’

রিয়াদ বিমানবন্দরের কাছে হুথিদের হামলা
রিয়াদ বিমানবন্দরের কাছে হুথিদের হামলা

ফ্লাইট বাতিল ও আকাশপথের অচলাবস্থা

পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ইতোমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, আজারবাইজান ও জর্জিয়াগামী এবং সেখান থেকে ছেড়ে আসা সব ইরানি ফ্লাইট বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি বাগদাদ ও মাস্কাটের আকাশপথও এখন ইরানি বিমানের জন্য বন্ধ। যদিও তুরস্ক ও চীনের সঙ্গে কিছু ফ্লাইট চালু রয়েছে। তবুও এ দেশগুলোতেও বড় একটা অংশের ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলে বিমান চলাচল প্রায় থমকে গিয়েছিল। কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান ও জর্ডানের আকাশসীমায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর দেশগুলো বাধ্য হয়ে সাময়িকভাবে আকাশপথ বন্ধ করে দেয়।

পরবর্তীতে সীমিত পরিসরে ফ্লাইট চালু হলেও মধ্যপ্রাচ্যের বিমান সংস্থাগুলোর সময়সূচী স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার (আইএটিএ) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর মধ্যপ্রাচ্যের বিমান সংস্থাগুলোকে ৪.৩ বিলিয়ন ডলার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।

ইরানের হুমকি বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলবে

অন্য কোনো সার্বভৌম দেশের বিমানবন্দর ইরানি বিমান গ্রহণ করবে কি না, তা নিয়ে তেহরানের সরাসরি আইনগত এখতিয়ার নেই। তবে স্থানীয় জ্বালানি সরবরাহকারী ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলারদের ওপর মার্কিন পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার ভয় দেখিয়ে পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে ওয়াশিংটন।

অস্ট্রিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক ওলফগ্যাং পুশতাই মনে করেন, আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলোতে সরাসরি সামরিক হামলা চালানোর সম্ভাবনা ইরানের নেই। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ইরান এই বিমানবন্দরগুলোতে হামলা চালাবে, এমন সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।’ পুশতাই আরও বলেন, ‘আমি মনে করি না যে তুর্কি তাদের, কিংবা পাকিস্তান বা চীনের সঙ্গে কাজ করা বা সহযোগিতা করা বন্ধ করে দেবে। আর তাছাড়া, যেমনটা আমি বলেছি, বাইরে থেকে ইরানকে পরিষেবা দেওয়ার মতো অন্যান্য বিমান সংস্থাও রয়েছে, তাই এর বাস্তব প্রভাব সীমিতই থাকবে।’

তার মতে, এ নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বড় আঘাত হতে পারে মনস্তাত্ত্বিক। পুশতাই-এর ভাষ্যমতে, ‘এটি অবশ্যই ইরানিদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার ধারণা তৈরিতে অবদান রাখবে এবং সম্ভবত এ কারণেই ইরানের পক্ষ থেকে এই কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, আর্থিক খাতের নিষেধাজ্ঞার মতো বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের চোখে সরাসরি ধরা না পড়লেও, এ ধরনের বিমান অবরোধ অবশ্যই সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায়। তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করেছেন, শুধু বিমান নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমেই তেহরানকে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা কি দেশটির মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে? একেবারেই না। একেবারেই না।

মাশহাদ, ইরানের দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল শহর
মাশহাদ, ইরানের দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল শহর

ভ্রমণ ও পর্যটন শিল্পে বড় ধাক্কা

এই নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক এবং বড় ধাক্কা খাচ্ছে সাধারণ ইরানি ভ্রমণকারীরা। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ধারণক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় হাজার হাজার মানুষকে বাধ্য হয়ে তুরস্ক বা আর্মেনিয়ার মতো দেশগুলোতে স্থলপথে যাতায়াত করতে হচ্ছে। শুধু যাত্রী পরিবহনই নয়, এর জেরে ইরানের বিমান চলাচল শিল্প এবং এর সঙ্গে যুক্ত পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতের হাজার হাজার চাকরি এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সব মিলিয়ে চলমান সংঘাত এবং নতুন এ নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে মধ্যপ্রাচ্যের গোটা ভ্রমণ খাত এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে।

সূত্র: আল জাজিরা

/এমএকে/