এক্সপ্লেইনার

ইরানের সঙ্গে নতুন সংঘাত কি ইসরায়েলের জন্য আত্মঘাতী হবে

সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
ইরানের সঙ্গে নতুন সংঘাত কি ইসরায়েলের জন্য আত্মঘাতী হবে
বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। ছবি: টাইমস অব ইসরায়েল

ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো সামরিক অভিযানে যাওয়া হবে এক মারাত্মক কৌশলগত ভুল। এই ধরনের পদক্ষেপ পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলকে একটি দীর্ঘ ও ভয়াবহ সংকটের মুখে ঠেলে দেবে। একই সঙ্গে, এটি তেল আবিবের জন্য অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলবে এবং এর থেকে বের হয়ে আসার পথ কঠিন করে তুলবে।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে এটি পরিষ্কার, তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত উদ্দেশ্য হাসিল করার হিসাব-নিকাশ বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। তা সত্ত্বেও, ইসরায়েলের কিছু রাজনৈতিক ও সামরিক মহল ইরানের সঙ্গে আবারও নতুন সংঘাতে জড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।

‌ইরানের তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
‌ইরানের তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

সীমানা ছাড়াবে সংকটের আগুন

জনপ্রিয় সংবাদপত্র ‘হারেৎজ’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে নতুন করে লড়াই শুরু করা হবে এক বিশাল কৌশলগত ভুল। এ ভুলের মাশুল কেবল ইরানের সীমানা বা দখলকৃত অঞ্চলের মধ্যেই আটকে থাকবে না। বরং তা ছড়িয়ে পড়ে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোকেও ধ্বংসাত্মক সংকটের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। ইসরায়েলি গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন এ শঙ্কাটাই প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একই সুরে কথা বলেছেন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ইৎজাক ব্রিক। আরেক হিব্রু পত্রিকা ‘মা’আরিভ’-এ লেখা এক নিবন্ধে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

ব্রিকের মতে, নীতি নির্ধারকরা যদি কেবল রাজনৈতিক হিসেব-নিকাশ বা অভ্যন্তরীণ চাপ কাটাতে গিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেন, তবে তার মাশুল দুই দেশের সীমারেখায় আটকে থাকবে না। ইসরায়েলের সামরিক কাঠামোর ভেতরে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি সতর্ক করেন, এই সংঘাত পুরো অঞ্চলে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে। এতে তেল আবিবের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও ঘনীভূত হবে এবং তারা এমন এক জালে আটকে পড়বে, যেখান থেকে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।

ভুল হিসাব ও চড়া মাশুল

ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধ ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ভাবনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। অতীতে তেল আবিবের একশ্রেণীর নীতি নির্ধারক মনে করতেন, উন্নত অস্ত্রশস্ত্র আর আমেরিকার জোরালো সামরিক সাহায্য নিয়ে হয়তো ইরানের ওপর নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করা এমন এক অনিশ্চিত পথ, যার শেষ কোথায় হবে তা আগে থেকে বলা অসম্ভব।

ইরানের শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং বহুমুখী শক্তির কারণে তারা প্রতিপক্ষের ওপর এমন চাপ তৈরি করতে সক্ষম, যা আক্রমণকারীদের শুরুর হিসাব-নিকাশকে পাল্টে দিতে পারে। ফলে নতুন করে কোনো লড়াই শুরুর আগে সামরিক, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পরিণতির কথা মাথায় রাখা জরুরি। কারণ একবার আগুন লাগলে তার নিয়ন্ত্রণ সংকট তৈরিকারীদের হাতে নাও থাকতে পারে।

এখানে বিষয়টি কেবল ইসরায়েলের সামরিক অবকাঠামোর ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। যুদ্ধের ব্যাপকতা ছড়িয়ে পড়লে পুরো অঞ্চলের মূল অবকাঠামো, অর্থনৈতিক কেন্দ্র, জ্বালানি ক্ষেত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথগুলো স্থবির হয়ে পড়বে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো ভৌগোলিক অবস্থান এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে মূল ভূমিকা রাখার কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই বৈশ্বিক তেল বাজার, বিশ্ব অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে।

এ কারণে হারেৎজের এ সতর্কবার্তাকে কেবল একটি অঞ্চলের নিরাপত্তার মোড়কে দেখলে চলবে না। এর পেছনে জড়িয়ে আছে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি। এক কথায়, তেহরানের সঙ্গে আবার যুদ্ধ বাঁধানো মানে এমন সব পক্ষকেও ক্ষতির মুখে ফেলা, যাদের কথা হয়তো তেল আবিব বা ওয়াশিংটন শুরুতে তাদের কথা ভাবেনি।

অভ্যন্তরীণ সংকট ও রাজনৈতিক খেলা

জেনারেল ব্রিকের বক্তব্যের আরেকটি বড় দিক হলো ইসরায়েলের ভেতরের জটিল পরিস্থিতি। বর্তমানে দেশটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত নানান সমস্যায় জর্জরিত। এমন সময়ে নতুন করে কোনো বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে তা দেশটির ভঙ্গুর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে।

বড় শঙ্কার জায়গা হলো, জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রকৃত ব্যয়ের কথা চিন্তা না করে কেবল রাজনৈতিক স্বার্থে যুদ্ধ বেছে নেওয়া হয় কি না। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বর্তমানে নিজ দেশের রাজনীতিতে নানা কোণ থেকে প্রচণ্ড চাপে রয়েছেন। তাই ইসরায়েলের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরকারের টিকে থাকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে আলাদা করে দেখাটা অত্যন্ত জরুরি।

অন্যদিকে, এ সমীকরণে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িয়ে পড়াও ঝুঁকিমুক্ত নয়। ওয়াশিংটনকে একদিকে যেমন ইসরায়েলকে সমর্থন দিতে হবে, অন্যদিকে এ অঞ্চলে অবস্থানরত তাদের নিজেদের সেনা ও ঘাঁটিগুলোর সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পারস্য উপসাগরে যেন সংকট ছড়িয়ে না পড়ে সেদিকেও নজর রাখতে হবে। সংঘাত যত বাড়বে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক মাশুলও তত বেশি হতে থাকবে। ফলে নতুন কোনো অভিযানকে সমর্থন দিলেই যে এর সব ফলাফল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে- এমন ভাবাটা হবে চূড়ান্ত ভুল।

কেন এ সংঘাত কৌশলগতভাবে ভুল

এখন তেল আবিব বা ওয়াশিংটনের জন্য মূল প্রশ্নটা কেবল হামলা শুরু করা নিয়ে নয়। মূল বিষয় হলো, আক্রমণ চালিয়ে তারা কি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে এবং যুদ্ধের পরিণতি সামলাতে পারবে? সামরিক অভিযান হয়তো শুরু করা সহজ, কিন্তু তা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক বা নিরাপত্তাগত সুবিধা আদায় করা সম্ভব নয়।

গত আট মাসের সংঘাতে দেখা গেছে, ইরানের পাল্টা আঘাত হানার এবং প্রতিপক্ষকে চড়া মাশুল দিতে বাধ্য করার যথেষ্ট সামর্থ্য রয়েছে। এ অভিজ্ঞতা তেহরানকে ঘিরে সামরিক সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। ইরানকে এমন কোনো দুর্বল পক্ষ ভাবার সুযোগ নেই, যারা সামরিক চাপ দেখলে কেবল সীমিত ও অনুমেয় কিছু পদক্ষেপে থেমে থাকবে।

প্রকৃতপক্ষে, ইরানের শক্তি হলো তারা তাদের সামরিক ক্ষমতাকে ভৌগোলিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ঠিক এ কারণেই ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো পদক্ষেপে এমন কিছু পরিণতি দেখা দেবে, যা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল কারও পক্ষেই সামলানো সম্ভব হবে না।

সব মিলিয়ে সতর্কবার্তাগুলো মূলত ইসরায়েলের নিজস্ব সামরিক ও বুদ্ধিভিত্তিক মহলের গভীর উদ্বেগেরই বহিঃপ্রকাশ। এ বার্তাগুলো প্রমাণ করে, কেবল অস্ত্রের মুখেই রাজনৈতিক বা কৌশলগত জয় আসে না- এ সত্যটি এখন দেশটির ভেতরের বড় একটি অংশ মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

তেল আবিব ও ওয়াশিংটনের সামনে প্রশ্ন কেবল যুদ্ধ করা বা না করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তারা কি অঞ্চলের এ নতুন বাস্তবতা মেনে নিয়ে শান্ত থাকবে, না এমন এক অনিশ্চিত ও বিপুল খরচের যুদ্ধে জড়াবে যার পরিণতি তাদের কল্পনারও বাইরে চলে যাবে সেটাই এখন দেখার বিষয়। ইরানের সঙ্গে নতুন করে লড়াই শুরু করা কোনো শক্তি প্রদর্শন হবে না, বরং তা হবে এক ঐতিহাসিক কৌশলগত ভুল, যার খেসারত দিতে হবে পুরো অঞ্চলকে।

/এমএকে/