শিরোনাম
এক্সপ্লেইনার

হরমুজের মাইন অপসারণে যেভাবে ডুবুরি ও ডুবো ড্রোন ব্যবহার করেছিল যুক্তরাষ্ট্র

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
হরমুজের মাইন অপসারণে যেভাবে ডুবুরি ও ডুবো ড্রোন ব্যবহার করেছিল যুক্তরাষ্ট্র
হরমুজ প্রণালি ও জল মাইন (ইনসেটে)। কোলাজ: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

চার মাস ধরে রাতের আঁধারে হরমুজ প্রণালির তলদেশে এক বিপজ্জনক লড়াই চালিয়েছিল মার্কিন নৌবাহিনীর ডুবুরি ও সিল (SEAL) সদস্যরা। চালকবিহীন বোট আর উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সোনার প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমুদ্রের তলদেশে পুঁতে রাখা ইরানি মাইন খুঁজে বের করাই এ অভিযানের মূল উদ্দেশ্য। ফিনান্সিয়াল টাইমস-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথ সচল রাখতে ওয়াশিংটন আড়ালে থেকে তৎপরতা চালিয়েছিল।

প্রযুক্তির সাহায্যে মাইন শনাক্ত ও ধ্বংস

ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালিতে মাইন পুঁতে রাখার দাবি করে ইরান। এ জলপথটি ঝুঁকিমুক্ত করতে কোনো বড় নৌবহর না পাঠিয়ে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে অভিযান চালাচ্ছে মার্কিন বাহিনী। ড্রোন ও ডুবোযানের সোনার প্রযুক্তির সাহায্যে প্রথমে সন্দেহজনক বস্তু চিহ্নিত করেছিল। এরপর ছোট রাবার বোটে চেপে ডুবুরিরা গিয়ে সেগুলোতে বিস্ফোরক সংযুক্ত করে দূর থেকে বিস্ফোরণ ঘটায়।

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা জুন মাসে জানিয়েছিল, এ জলপথে প্রায় ৮০টি মাইন ছড়ানো রয়েছে। পরবর্তীতে সেন্ট্রাল কমান্ডের অধীনে পানির নিচের ড্রোন ব্যবহার করে নতুন পথ তৈরির চেষ্টা প্রকাশ্যে স্বীকার করে মার্কিন সামরিক বাহিনী। তবে দীর্ঘদিনের এ ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে এখন পর্যন্ত কোনো মার্কিন সৈন্য হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল করছে
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল করছে

প্রণালিটি কি এখন পুরোপুরি নিরাপদ?

ওমানের উপকূল ঘেঁষা দক্ষিণাঞ্চলীয় রুটটি কিছুটা ঝুঁকিমুক্ত করতে পেরেছে বলে মার্কিন বাহিনীর বরাতে জানিয়েছে শিপিং খাতের নিরাপত্তা উপদেষ্টারা। ওই পথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও পুরো প্রণালিকে এখনো শতভাগ নিরাপদ বলা যাচ্ছে না।

ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, মাইনগুলো ঠিক কোথায় কোথায় আছে তা কেবল তেহরানেরই জানা। মে মাসে একটি পাকিস্তানি জরিপকারী জাহাজ প্রথম একটি মাইনের অস্তিত্ব নিশ্চিত করে। এরপর ৩১ আগস্ট ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ড দাবি করে, অননুমোদিত পথ ব্যবহারের সময় দুটি নৌ-মাইনের আঘাতে একটি সুপারট্যাঙ্কারে আগুন ধরে যায়।

এদিকে, পরিষ্কার করা পথে পুনরায় মাইন বসানো ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ওয়াশিংটন। ৩০ আগস্ট লারাক দ্বীপে অবস্থানরত ইরানি রকেট লঞ্চারে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। সেগুলো প্রণালিতে নতুন করে মাইন ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

ভীতি ছড়িয়ে বাণিজ্য থামানোর মনস্তাত্ত্বিক খেলা

এ যুদ্ধটি কেবল সমুদ্রতলের বিস্ফোরক সরানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। মাইন ও ড্রোন হামলার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বীমা কোম্পানিগুলো যুদ্ধ-ঝুঁকি বীমার খরচ দশ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে একটি সাধারণ সুপারট্যাঙ্কারের বীমা মাশুল দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ কোটি ডলারে।

বাণিজ্য বন্ধ করতে বাস্তবে জাহাজ ডুবানোরও প্রয়োজন পড়ছে না ইরানের। মাইন ও ক্ষেপণাস্ত্রের উপস্থিতি নিয়ে বাজারে তৈরি হওয়া ভীতিই বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে এ পথ থেকে দূরে রাখার জন্য যথেষ্ট।

ইরানি তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমুখী চাপ

আন্তর্জাতিক জাহাজের জন্য পথ পরিষ্কার করার পাশাপাশি ইরানের তেল বাণিজ্যের ওপর নতুন করে আঘাত হানছে ওয়াশিংটন। মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে তিনটি ইরানি তেল ট্যাঙ্কারে হামলা চালায় সেন্টকম। এতে দুটি ট্যাঙ্কার পুরোপুরি অচল ও একটি ধ্বংস হয়।

বছরের পর বছর ধরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানের তেল বিক্রি আটকানোর যে চেষ্টা ওয়াশিংটন করত, জুলাইয়ের মধ্যভাগ থেকে শুরু হওয়া নৌ-অবরোধে তা সরাসরি সামরিক হামলায় রূপ নিয়েছে। যুদ্ধের আগে ইরান যেখানে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করত, আগস্টে তা অস্বাভাবিকভাবে কমে ২ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫৫ হাজার ব্যারেলে নেমে এসেছে।

তবে এ দ্বিমুখী কৌশলে বড় ধরনের সামরিক ঝুঁকিও রয়েছে। ওয়াশিংটন ইরানের তেলের ওপর যত বেশি চাপ সৃষ্টি করবে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ প্রণালিতে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাতে তেহরানের পাল্টা আঘাত হানার প্রবণতা ততই বাড়বে।

সূত্র: গালফ নিউজ

/এমএকে/