শিরোনাম

হুথিদের অগ্রযাত্রা ইরান যুদ্ধে কী প্রভাব ফেলবে

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
হুথিদের অগ্রযাত্রা ইরান যুদ্ধে কী প্রভাব ফেলবে
সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী হুথিদের প্রতিহত করতে হিমশিম খাচ্ছে

ইয়েমেনের তিহামার দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে হুথিদের অগ্রযাত্রা অধিকাংশ পর্যবেক্ষককে হতবাক করে দিয়েছে। ‘জাতীয় প্রতিরোধ’ নামে পরিচিত হুথি-বিরোধী জোট ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল বরাবর একটি উল্লেখযোগ্য ভূখণ্ডের অধিকারী ছিল। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই এর বেশিরভাগই হুথিদের দখলে চলে গেছে। কিছু হিসাব অনুযায়ী, ইরান-সমর্থিত বিদ্রোহীরা দেশটির কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপকূলরেখার প্রায় ১৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত দখল করে নিয়েছে।

অপ্রতিরোধ্য শক্তির পরিচয়

বিগত কয়েক বছরের মধ্যে গোষ্ঠীটির সবচেয়ে বড় সামরিক অভ্যুত্থান এটি। ১২ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধ, সৌদি আরবের বিধ্বংসী বিমান হামলা এবং আমেরিকান, ইসরায়েলি ও ব্রিটিশ বাহিনীর আক্রমণ সত্ত্বেও হুথিরা এখনও একটি অপ্রতিরোধ্য শক্তি।

ব্রাসেলস-ভিত্তিক ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অফ পিসের সিনিয়র বিশ্লেষক হিশাম আল-ওমেইসি বিবিসিকে বলেন, ‘এখন যেহেতু তারা সেখানে আছে, তারা নিজেদের ঘাঁটি গেড়ে বসবে। তাদের সেখান থেকে হটিয়ে দেওয়াটা আরও অনেক বেশি ব্যয়বহুল হবে।’

হুথি বাহিনীর সদস্যরা
হুথি বাহিনীর সদস্যরা

তেহরানের কৌশল ও দুই চোকপয়েন্টের নিয়ন্ত্রণ

হুথিরা একা নয়। তারা ইরানের সমর্থন পায়। পাশাপাশি লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজার হামাস এবং সিরিয়ার আসাদ সরকারের- বিপর্যয় ও পরাজয়ের পরিপ্রেক্ষিতে এ সমর্থন তেহরানের জন্য আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই তারা হুথিদের দিকে তাদের সমর্থন ঘুরিয়ে দিয়েছে।

যদিও বেশিরভাগ বিশ্লেষকই একমত যে হুথিদেরকে কেবল ইরানের পুতুল হিসেবে আখ্যা দেওয়াটা ভুল। গত কয়েক দিনের ঘটনা এক নতুন বাস্তবতা সামনে এনেছে। ইরানের এখন একটি নয়, বরং দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালি।

লন্ডনের চ্যাথাম হাউস থিঙ্ক ট্যাঙ্কের রিসার্চ ফেলো ফারেয়া আল-মুসলিমী বলেন, এখন ইরান সরাসরি এবং প্রক্সিদের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের দুটি সবচেয়ে কৌশলগত জলপথ নিয়ন্ত্রণ করে এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও তেল বাণিজ্যের ৩৫ শতাংশেরও সরবরাহ হয় এই পথে।

একে পারমাণবিক বোমা অর্জনের মতোই শক্তিশালী একটি ক্ষমতা বলে উল্লেখ করেন তিনি। হুথিরা লোহিত সাগরের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেওয়ায়, আন্তর্জাতিক নৌচলাচলে বাধা সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে গোষ্ঠীটির ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। গাজায় ইসরায়েলি হামলার পর গোষ্ঠীটির কর্মকাণ্ড প্রমাণ করেছে লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজ হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং ছোট আক্রমণকারী নৌযানের কাছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে একটি তেলবাহী ট্যাংকার নোঙর করা
বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে একটি তেলবাহী ট্যাংকার নোঙর করা

নৌচলাচলে অনিশ্চয়তা ও মার্কিন দ্বিধা

ভূখণ্ডগত সুবিধা অর্জন না করেই তারা বাব আল-মান্দেবের ভেতরে ও বাইরে এবং সুয়েজের দিকে আসা জাহাজগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছিল। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিবিসি রেডিও ৪-এর এক অনুষ্ঠানে ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ আয়োনা ক্রেইগ একথা বলেন। কিন্তু এখন তারা বাব আল-মান্দেব সংলগ্ন এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে, এবং এটি তাদের আরও অনেক বেশি সুবিধা দেবে।

শুক্রবার বিকেলে প্রকাশিত একটি বিবৃতি হুথি সামরিক বাহিনী বলেছে, সৌদি জাহাজগুলো ছাড়া অন্য সব কোম্পানির জন্য সামুদ্রিক চলাচল নিরাপদ থাকবে। তাদের পূর্ববর্তী হামলাগুলোতে হুথিরা বলেছিল তারা শুধু ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত জাহাজগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু করছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা এমন সব জাহাজে আঘাত হেনেছে যেগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো সম্পর্কই ছিল না।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কি তবুও এতে জড়িত হতে চাইবে? তেলের দাম আবার বাড়তে থাকায়, নতুন কোনো সংঘাত তার জনপ্রিয়তার হার বা নভেম্বরের মধ্যবর্তী মার্কিন নির্বাচনে তার রিপাবলিকান দলের সম্ভাবনা বাড়াতে খুব একটা সাহায্য করবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

অ্যাক্সিওস-এর তথ্য অনুযায়ী, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পক্ষ থেকে সরাসারি হামলার আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন ট্রাম্প। অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনের ক্রমবর্ধমান সংঘাত নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং সৌদি আরবের প্রতি সমর্থন জোরদার করার জন্য কাজ করছে। একই সঙ্গে সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা এড়ানোর চেষ্টা করছে।

সৌদি আরবের জ্বালানি তেল সরবরাহের পাইপ লাইনে হামলা
সৌদি আরবের জ্বালানি তেল সরবরাহের পাইপ লাইনে হামলা

আঞ্চলিক উত্তেজনা ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ

সৌদি আরবে উদ্বেগের কারণ শুধু বাব আল-মান্দেবের সম্ভাব্য হুমকি নয়। সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে হুতিদের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার স্যাটেলাইট চিত্র ইঙ্গিত করে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তেল রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প এ রুটকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

এর মধ্য দিয়ে ইরানের ইয়েমেনি মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরান সরাসরি হামলার নির্দেশ না দিয়ে থাকলেও, এর সুফল যে তারা পাবে এটা স্পষ্ট।

লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক ও বিশ্লেষক বারাআ শাইবান বলেন, ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে বড় এই সংঘাত বৃদ্ধির সূত্রপাত জুলাই মাসে। তখন হুতিদের একটি প্রতিনিধিদল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া থেকে ফিরে আসে। তিনি বলেন, ‘এর পরপরই উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। এবং খুব স্পষ্টভাবেই মনে হয়েছে যে (ইরান) এখন লোহিত সাগরে আরও বড় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’

ইয়েমেন যখন আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে, সৌদি আরব যখন লোহিত সাগরে তার অর্থনৈতিক জীবনরেখা রক্ষায় উদ্বিগ্ন, এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দৃশ্যত এ সংঘাতে জড়াতে অনাগ্রহী, তখন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত নতুন এবং সম্ভাব্য বিপজ্জনক এক মাত্রা পেয়েছে।

আর ১২ বছরের গৃহযুদ্ধে বাস্তুচ্যুত, বিপর্যস্ত, ক্ষুধার্ত এবং দারিদ্র্যপীড়িত ইয়েমেনি জনগণের জন্য, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলবে।

সূত্র: বিবিসি

/এমএকে/