যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত কী থামাতে পারবেন মধ্যস্থতাকারীরা

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত কী থামাতে পারবেন মধ্যস্থতাকারীরা
সিজেডএন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত রোধ এবং বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়া ঠেকাতে নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছেন আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা। সোমবার (২০ জুলাই) ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই নিশ্চিত করেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়া ঠেকাতে মধ্যস্থতাকারীরা সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। যদিও আলোচনার কৌশলগত কারণে বিস্তারিত তথ্য দিতে তিনি রাজি হননি। কাতার, মিশর ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী দেশ ওয়াশিংটন ও তেহরানের কাছে একটি সমঝোতা প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এ প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো ১০ দিনের জন্য একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি দিয়ে গত মাসে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা স্মারকটি (এমওইউ) পুনরুজ্জীবিত করা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আবার স্বাভাবিক করা।
এমন এক সময়ে এ কূটনৈতিক উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে, যখন মাঠে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে এগোচ্ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এ সংঘাত সামরিক লক্ষ্যবস্তুর গণ্ডি পেরিয়ে বেসামরিক অবকাঠামো পর্যন্ত গড়িয়েছে এবং উভয় পক্ষই নিজেদের প্রকাশ্য অবস্থান আরও কঠোর করে তুলেছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে উপযুক্ত মূল্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং মার্কিন বিমান হামলা এখন ইরানের আরও গভীর অভ্যন্তরে বিস্তৃত হয়েছে। জবাবে ইরানও পুরো অঞ্চলজুড়ে জাহাজ ও বিভিন্ন স্থাপনার ওপর পাল্টা হামলা জোরদার করেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সংঘাত সামাল দিতে ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়েছিল। পাশাপাশি আলোচনার একটি রূপরেখাও তৈরি করেছিল। কিন্তু গত এক মাস ধরে সম্পর্কের অবনতির জেরে নতুন করে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়, যেখানে উভয় সরকারই বারবার একে অপরকে চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত করেছে।
নতুন এ মধ্যস্থতা প্রস্তাবে মূলত হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে জোর দেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে মার্কিন নৌ অবরোধের অধীনে থাকা ইরান-অনুমোদিত উত্তরের পথ এবং ইরানি হামলার ঝুঁকিতে থাকা মার্কিন-সমর্থিত দক্ষিণের পথ- উভয় নৌপথই সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। চুক্তি সুরক্ষায় আলোচকদের সুযোগ দিতে ১০ দিনের জন্য সামরিক অভিযান বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ট্রানজিট ফি ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) অংশগ্রহণে একটি যৌথ পরিচালনা তহবিল গঠন কিংবা নিরাপত্তা পরিষেবা ফি আদায়ের বিষয়টিও আলোচনায় রাখা হয়েছে।
তবে এ আলোচনা বাস্তবে কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাইমন ম্যাবন জানান, পূর্বের সমঝোতা স্মারকটি ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট রাখা হয়েছিল যাতে দুই দেশই নিজেদের সুবিধাজনক ব্যাখ্যা দিতে পারে। কিন্তু সেই নমনীয়তাই এর বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায় এবং উভয় পক্ষকে একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলার সুযোগ করে দিয়ে তা ভেস্তে দেয়। তাই যেকোনো নতুন চুক্তিতে দুই পক্ষেরই আরও সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট অঙ্গীকারের প্রয়োজন হবে।
সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অধ্যাপক মাবনের মতে, ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে নিজেদের দর কষাকষির মূল শক্তি হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির পর ট্রাম্পের ওপর কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার রাজনৈতিক চাপ বেড়েছে। ফলে উভয় দেশই পাল্টাপাল্টি প্রতিশোধের এক বিপদজনক চক্রে আটকা পড়ছে। তবে ‘হরাইজন এনগেজ’- এর নিরাপত্তা পরিচালক অ্যালেক্স আলমেদার মতে, মার্কিন হামলা গভীর অভ্যন্তরে বিস্তৃত হলেও এর মূল অংশ এখনও হরমুজ এলাকাতেই সীমাবদ্ধ, যা ইঙ্গিত দেয় হোয়াইট হাউস এখনও সংঘাতটি অনিয়ন্ত্রিত হতে দিতে চায় না।
অন্যদিকে কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী সহ-সভাপতি ত্রিতা পারসি মনে করেন, সামরিক বোমাবর্ষণ চলতে থাকলে আলোচনার টেবিলে ফেরার ব্যাপারে ইরানের কোনো তাগিদ থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার টেবিলে না জিতে সামরিক পথ বেছে নিলে কূটনীতি সফল হওয়া কঠিন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, প্রতিটি নতুন হামলার সঙ্গে সঙ্গে এ সংঘাতকে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। ইরানি হামলায় কুয়েতের বিদ্যুৎ ও পানি পরিশোধন কেন্দ্র এবং বাহরাইন ও জর্ডানের বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তাহীনতা প্রকাশ পাচ্ছে। একইভাবে ইয়েমেনের হুথিরা সৌদি বন্দরগুলোতে সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দেওয়ায় এবং লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালিতে উত্তেজনা ছড়ালে তা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে। এর পাশাপাশি ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও যুদ্ধবিরতি নিয়ে তাদের অনিচ্ছাও কূটনৈতিক অগ্রগতির পথে বড় বাধা হতে পারে। ফলে ওয়াশিংটন ও তেহরান নিজেদের কঠোর অবস্থান থেকে সরে না এলে কেবল মধ্যস্থতাকারীদের চেষ্টায় শান্তি ফেরানো কঠিন হতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত রোধ এবং বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়া ঠেকাতে নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছেন আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা। সোমবার (২০ জুলাই) ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই নিশ্চিত করেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়া ঠেকাতে মধ্যস্থতাকারীরা সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। যদিও আলোচনার কৌশলগত কারণে বিস্তারিত তথ্য দিতে তিনি রাজি হননি। কাতার, মিশর ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী দেশ ওয়াশিংটন ও তেহরানের কাছে একটি সমঝোতা প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এ প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো ১০ দিনের জন্য একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি দিয়ে গত মাসে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা স্মারকটি (এমওইউ) পুনরুজ্জীবিত করা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আবার স্বাভাবিক করা।
এমন এক সময়ে এ কূটনৈতিক উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে, যখন মাঠে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে এগোচ্ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এ সংঘাত সামরিক লক্ষ্যবস্তুর গণ্ডি পেরিয়ে বেসামরিক অবকাঠামো পর্যন্ত গড়িয়েছে এবং উভয় পক্ষই নিজেদের প্রকাশ্য অবস্থান আরও কঠোর করে তুলেছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে উপযুক্ত মূল্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং মার্কিন বিমান হামলা এখন ইরানের আরও গভীর অভ্যন্তরে বিস্তৃত হয়েছে। জবাবে ইরানও পুরো অঞ্চলজুড়ে জাহাজ ও বিভিন্ন স্থাপনার ওপর পাল্টা হামলা জোরদার করেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সংঘাত সামাল দিতে ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়েছিল। পাশাপাশি আলোচনার একটি রূপরেখাও তৈরি করেছিল। কিন্তু গত এক মাস ধরে সম্পর্কের অবনতির জেরে নতুন করে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়, যেখানে উভয় সরকারই বারবার একে অপরকে চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত করেছে।
নতুন এ মধ্যস্থতা প্রস্তাবে মূলত হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে জোর দেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে মার্কিন নৌ অবরোধের অধীনে থাকা ইরান-অনুমোদিত উত্তরের পথ এবং ইরানি হামলার ঝুঁকিতে থাকা মার্কিন-সমর্থিত দক্ষিণের পথ- উভয় নৌপথই সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। চুক্তি সুরক্ষায় আলোচকদের সুযোগ দিতে ১০ দিনের জন্য সামরিক অভিযান বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ট্রানজিট ফি ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) অংশগ্রহণে একটি যৌথ পরিচালনা তহবিল গঠন কিংবা নিরাপত্তা পরিষেবা ফি আদায়ের বিষয়টিও আলোচনায় রাখা হয়েছে।
তবে এ আলোচনা বাস্তবে কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাইমন ম্যাবন জানান, পূর্বের সমঝোতা স্মারকটি ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট রাখা হয়েছিল যাতে দুই দেশই নিজেদের সুবিধাজনক ব্যাখ্যা দিতে পারে। কিন্তু সেই নমনীয়তাই এর বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায় এবং উভয় পক্ষকে একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলার সুযোগ করে দিয়ে তা ভেস্তে দেয়। তাই যেকোনো নতুন চুক্তিতে দুই পক্ষেরই আরও সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট অঙ্গীকারের প্রয়োজন হবে।
সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অধ্যাপক মাবনের মতে, ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে নিজেদের দর কষাকষির মূল শক্তি হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির পর ট্রাম্পের ওপর কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার রাজনৈতিক চাপ বেড়েছে। ফলে উভয় দেশই পাল্টাপাল্টি প্রতিশোধের এক বিপদজনক চক্রে আটকা পড়ছে। তবে ‘হরাইজন এনগেজ’- এর নিরাপত্তা পরিচালক অ্যালেক্স আলমেদার মতে, মার্কিন হামলা গভীর অভ্যন্তরে বিস্তৃত হলেও এর মূল অংশ এখনও হরমুজ এলাকাতেই সীমাবদ্ধ, যা ইঙ্গিত দেয় হোয়াইট হাউস এখনও সংঘাতটি অনিয়ন্ত্রিত হতে দিতে চায় না।
অন্যদিকে কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী সহ-সভাপতি ত্রিতা পারসি মনে করেন, সামরিক বোমাবর্ষণ চলতে থাকলে আলোচনার টেবিলে ফেরার ব্যাপারে ইরানের কোনো তাগিদ থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার টেবিলে না জিতে সামরিক পথ বেছে নিলে কূটনীতি সফল হওয়া কঠিন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, প্রতিটি নতুন হামলার সঙ্গে সঙ্গে এ সংঘাতকে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। ইরানি হামলায় কুয়েতের বিদ্যুৎ ও পানি পরিশোধন কেন্দ্র এবং বাহরাইন ও জর্ডানের বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তাহীনতা প্রকাশ পাচ্ছে। একইভাবে ইয়েমেনের হুথিরা সৌদি বন্দরগুলোতে সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দেওয়ায় এবং লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালিতে উত্তেজনা ছড়ালে তা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে। এর পাশাপাশি ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও যুদ্ধবিরতি নিয়ে তাদের অনিচ্ছাও কূটনৈতিক অগ্রগতির পথে বড় বাধা হতে পারে। ফলে ওয়াশিংটন ও তেহরান নিজেদের কঠোর অবস্থান থেকে সরে না এলে কেবল মধ্যস্থতাকারীদের চেষ্টায় শান্তি ফেরানো কঠিন হতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত কী থামাতে পারবেন মধ্যস্থতাকারীরা
সিজেডএন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত রোধ এবং বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়া ঠেকাতে নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছেন আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা। সোমবার (২০ জুলাই) ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই নিশ্চিত করেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়া ঠেকাতে মধ্যস্থতাকারীরা সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। যদিও আলোচনার কৌশলগত কারণে বিস্তারিত তথ্য দিতে তিনি রাজি হননি। কাতার, মিশর ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী দেশ ওয়াশিংটন ও তেহরানের কাছে একটি সমঝোতা প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এ প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো ১০ দিনের জন্য একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি দিয়ে গত মাসে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা স্মারকটি (এমওইউ) পুনরুজ্জীবিত করা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আবার স্বাভাবিক করা।
এমন এক সময়ে এ কূটনৈতিক উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে, যখন মাঠে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে এগোচ্ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এ সংঘাত সামরিক লক্ষ্যবস্তুর গণ্ডি পেরিয়ে বেসামরিক অবকাঠামো পর্যন্ত গড়িয়েছে এবং উভয় পক্ষই নিজেদের প্রকাশ্য অবস্থান আরও কঠোর করে তুলেছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে উপযুক্ত মূল্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং মার্কিন বিমান হামলা এখন ইরানের আরও গভীর অভ্যন্তরে বিস্তৃত হয়েছে। জবাবে ইরানও পুরো অঞ্চলজুড়ে জাহাজ ও বিভিন্ন স্থাপনার ওপর পাল্টা হামলা জোরদার করেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সংঘাত সামাল দিতে ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়েছিল। পাশাপাশি আলোচনার একটি রূপরেখাও তৈরি করেছিল। কিন্তু গত এক মাস ধরে সম্পর্কের অবনতির জেরে নতুন করে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়, যেখানে উভয় সরকারই বারবার একে অপরকে চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত করেছে।
নতুন এ মধ্যস্থতা প্রস্তাবে মূলত হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে জোর দেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে মার্কিন নৌ অবরোধের অধীনে থাকা ইরান-অনুমোদিত উত্তরের পথ এবং ইরানি হামলার ঝুঁকিতে থাকা মার্কিন-সমর্থিত দক্ষিণের পথ- উভয় নৌপথই সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। চুক্তি সুরক্ষায় আলোচকদের সুযোগ দিতে ১০ দিনের জন্য সামরিক অভিযান বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ট্রানজিট ফি ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) অংশগ্রহণে একটি যৌথ পরিচালনা তহবিল গঠন কিংবা নিরাপত্তা পরিষেবা ফি আদায়ের বিষয়টিও আলোচনায় রাখা হয়েছে।
তবে এ আলোচনা বাস্তবে কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাইমন ম্যাবন জানান, পূর্বের সমঝোতা স্মারকটি ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট রাখা হয়েছিল যাতে দুই দেশই নিজেদের সুবিধাজনক ব্যাখ্যা দিতে পারে। কিন্তু সেই নমনীয়তাই এর বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায় এবং উভয় পক্ষকে একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলার সুযোগ করে দিয়ে তা ভেস্তে দেয়। তাই যেকোনো নতুন চুক্তিতে দুই পক্ষেরই আরও সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট অঙ্গীকারের প্রয়োজন হবে।
সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অধ্যাপক মাবনের মতে, ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে নিজেদের দর কষাকষির মূল শক্তি হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির পর ট্রাম্পের ওপর কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার রাজনৈতিক চাপ বেড়েছে। ফলে উভয় দেশই পাল্টাপাল্টি প্রতিশোধের এক বিপদজনক চক্রে আটকা পড়ছে। তবে ‘হরাইজন এনগেজ’- এর নিরাপত্তা পরিচালক অ্যালেক্স আলমেদার মতে, মার্কিন হামলা গভীর অভ্যন্তরে বিস্তৃত হলেও এর মূল অংশ এখনও হরমুজ এলাকাতেই সীমাবদ্ধ, যা ইঙ্গিত দেয় হোয়াইট হাউস এখনও সংঘাতটি অনিয়ন্ত্রিত হতে দিতে চায় না।
অন্যদিকে কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী সহ-সভাপতি ত্রিতা পারসি মনে করেন, সামরিক বোমাবর্ষণ চলতে থাকলে আলোচনার টেবিলে ফেরার ব্যাপারে ইরানের কোনো তাগিদ থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার টেবিলে না জিতে সামরিক পথ বেছে নিলে কূটনীতি সফল হওয়া কঠিন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, প্রতিটি নতুন হামলার সঙ্গে সঙ্গে এ সংঘাতকে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। ইরানি হামলায় কুয়েতের বিদ্যুৎ ও পানি পরিশোধন কেন্দ্র এবং বাহরাইন ও জর্ডানের বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তাহীনতা প্রকাশ পাচ্ছে। একইভাবে ইয়েমেনের হুথিরা সৌদি বন্দরগুলোতে সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দেওয়ায় এবং লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালিতে উত্তেজনা ছড়ালে তা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে। এর পাশাপাশি ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও যুদ্ধবিরতি নিয়ে তাদের অনিচ্ছাও কূটনৈতিক অগ্রগতির পথে বড় বাধা হতে পারে। ফলে ওয়াশিংটন ও তেহরান নিজেদের কঠোর অবস্থান থেকে সরে না এলে কেবল মধ্যস্থতাকারীদের চেষ্টায় শান্তি ফেরানো কঠিন হতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা

ইরানে মার্কিন হামলা অব্যাহত, পাল্টা জবাব তেহরানের
সৌদি আরবের ওপর সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞা জারি
মধ্যপ্রাচ্যে প্রধান ‘সমস্যা সৃষ্টিকারী’ ইরান: মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী


