শিরোনাম

ভারতের পার্লামেন্টে নারী সংরক্ষণ বিল নাকচ

সিটিজেন ডেস্ক
ভারতের পার্লামেন্টে নারী সংরক্ষণ বিল নাকচ
লোকসভায় সরকারের দাবি খণ্ডন করেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ অন্যান্য বিরোধী সংসদ সদস্যরা। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের সংসদ ও রাজ্য বিধানসভাগুলো নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণ করতে আনা সংবিধান সংশোধনী বিল ভোটাভুটিতে পরাজিত হয়েছে। ভারতীয় পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় এই সংবিধান সংশোধনী বিল এনেছিল নরেন্দ্র মোদি সরকার।

নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণের এই প্রস্তাবটি কার্যকর করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হত, আর এর জন্য সভার অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ ভোট দরকার ছিল। তবে তা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে ভারতের ক্ষমতাসীন এনডিএ জোট। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) বিলটির পক্ষে ২৯৮টি এবং বিপক্ষে ২৩০টি ভোট পড়েছে।

সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেছেন, বাকি দুটি সংশোধনী বিল নিয়ে আর না এগোনোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সংসদে নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ প্রদানকারী আইনের সংশোধন এবং নির্বাচনী আসনের সীমানা নির্ধারণ সম্পর্কিত বিলগুলো নিয়ে শাসক ও বিরোধী সংসদ সদস্যদের মধ্যে বিতর্কের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ লোকসভায় বিরোধীদের জবাব দেন এবং তারপর ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়।

লোকসভায় বিতর্ক চলাকালীনই প্রায় আড়াই বছর আগে পাস হয়ে যাওয়া নারী সংরক্ষণ আইনটি হঠাৎ করেই বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) থেকে কার্যকর করে দেওয়া হয়। এই আইনে সংসদ ও রাজ্য বিধানসভাগুলোয় নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে, সরকারের প্রস্তাবিত সংবিধান (১৩১তম সংশোধনী) বিল ২০২৬-এ বলা হয়েছে যে, আসন সংরক্ষণ কার্যকর করা হবে নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের ভিত্তিতে।

এই পদক্ষেপের বিরোধীরা যুক্তি দিয়েছেন যে, ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ কেবল বর্তমানের ৫৪৩টি লোকসভা আসনের জন্যই করা উচিত, সীমানা পুনর্নির্ধারণের (ডিলিমিটেশন) ফলে সৃষ্ট বর্ধিত আসনগুলোর জন্য নয়।

সংবিধান সংশোধনী বিল নিয়ে বিতর্কের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অভিযোগ করেন, বিরোধী দল নারী সংরক্ষণের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, ইন্ডিয়া জোটের সব সদস্যই নানা অজুহাত দেখিয়ে নারী সংরক্ষণের স্পষ্ট বিরোধিতা করেছেন। অনেক জায়গায় মনে হয়েছে যে, আমাদের লক্ষ্যের চেয়ে বরং আমাদের বাস্তবায়ন পদ্ধতির বিরুদ্ধে রয়েছেন বিরোধীরা।

নারী সংরক্ষণ আইন এবং সীমানা নির্ধারণ কমিশন বিলের উপর ভোটের আগে লোকসভায় বিতর্কের সময় বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, প্রথম সত্যটি হলো, এটি কোনো নারী সংরক্ষণ বিল নয়। যে নারী সংরক্ষণ বিলটি ২০২৩ সালে পাস হয়েছিল। তিনি বলেন, এই বিলটি দেশের নির্বাচনী মানচিত্র পরিবর্তন করার একটি প্রচেষ্টা।

কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে জানানো হয়েছে যে তারা নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণ সমর্থন করলেও ডিলিমিটেশনের সঙ্গে এটিকে জুড়ে দেওয়ার বিরোধী। ডিলিমিটেশনের বিরোধিতায় রাজ্যবাসীকে এরইমধ্যে কালো পতাকা তোলার অনুরোধ করেছেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্টালিন।

তামিলনাড়ুর শাসক দল ডিএমকের সংসদ সদস্য কানিমোঝি করুণানিধি সংসদে বলেন, ভারতের ইতিহাসে যতবার ডিলিমিটেশন হয়েছে, তার সঙ্গে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের উপরেও জোর দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্যগুলো জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল। যেহেতু উত্তর ভারতের একাধিক রাজ্যে এই সাফল্য আসেনি, তাই ইন্দিরা গান্ধী ও অটল বিহারী বাজপেয়ী– উভয় সরকারই ডিলিমিটেশন হতে দেননি। আসন সংখ্যা স্থির করে দিয়েছিলেন।

ডিলিমিটেশন কেন

'সংবিধান (১৩১তম সংশোধনী) বিল ২০২৬'-এ প্রস্তাব করা হয়েছিল যে, নিম্নকক্ষে সর্বোচ্চ ৮৫০টি আসন থাকবে, যার মধ্যে ৮১৫টি আসন হবে বিভিন্ন রাজ্যের এবং ৩৫টি আসন হবে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর। বর্তমানে লোকসভায় সদস্য সংখ্যা ৫৪৩ জন এবং সংবিধান অনুযায়ী এর সর্বোচ্চ সদস্যসীমা ৫৫০-এ নির্ধারিত রয়েছে।

সরকারের এই প্রস্তাবের বিরোধীরা বলছেন যে, শুধু ৫৪৩টি আসনেই ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ দেওয়া উচিত, আসন সংখ্যা বাড়িয়ে সেগুলোয় ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ দেওয়া নয়।

এই বিলে সংবিধানের ৮১তম অনুচ্ছেদ সংশোধনেরও প্রস্তাব করা হয়েছিল। এই অনুচ্ছেদের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের আদমশুমারির ভিত্তিতে লোকসভার আসন সংখ্যাকে স্থির বা 'ফ্রিজ' করে রাখার সিদ্ধান্তটি বাতিল করার কথা বলা হয়েছিল।

ডিলিমিটেশন বিলে বলা হয়েছিল, কোন সালের আদমশুমারিকে প্রামাণ্য হিসেবে ধরা হবে সেটা পার্লামেন্ট ঠিক করবে। এই বিষয়টি নিয়ে সংসদের বিরোধী সদস্যরা প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের বক্তব্য, আসন বণ্টন করতেই হলে, সর্বশেষ আদমশুমারির ভিত্তিতেই আসন ভাগ করা উচিৎ। তা না হলে ক্ষমতাসীন দল নিজের রাজনৈতিক সুবিধা মতো ভবিষ্যৎ আদমশুমারির বছর নির্বাচন করে সেটকেই ডিলিমিটেশন ও নারী আসন-সংখ্যার ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করতে পারবে।

ভারতে ১০ বছর অন্তর আদমশুমারি করা হয়। শেষ আদমশুমারি হয়েছে ২০১১ সালে। কিন্তু তার পর ২০২১ সালে আর আদমশুমারি হয়নি। সম্প্রতি ঘোষণা হয়েছে, ২০২৬ ও ২০২৭ সালের অনেকটা অংশ জুড়ে চলবে আদমশুমারির কাজ। অর্থাৎ বর্তমানে ভারতে জনবিন্যাস সম্পর্কে অনেক ধারণাই দেড় দশক পুরোনো।

এই বিল দুটি যেহেতু সংবিধান সংশোধনী বিল, তাই পাস করার জন্য সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা আবশ্যক। অর্থাৎ শাসকদল একা এই বিল পাস করতে পারত না। অন্যান্য দলের একটি বড় অংশের সমর্থন দরকার ছিল তাদের। তবে সেই সমর্থন জোটাতে ব্যর্থ হলো মোদি সরকার।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

/এফসি/