ফ্রান্সে স্কুলের বিক্ষোভ কেন বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিল

ফ্রান্সে স্কুলের বিক্ষোভ কেন বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিল
সিজেডএন ডেস্ক

শিক্ষকসংকট ও বিদ্যালয়ের দুরবস্থা নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন শ্রমিক ও ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকেরা। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি সেবার অবনতি ও সরকারের প্রতি দীর্ঘদিনের ক্ষোভে বিক্ষোভ এখন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
ফ্রান্সে স্কুলের পরিবেশ ও শিক্ষকসংকটের প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়ন ও ২০১৮ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকেরা।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার দেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নেন প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। অধিকাংশ বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি স্থানে ভাঙচুর, লুটপাট ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকোর্নু জানিয়েছেন, এসব ঘটনায় ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ১৫০ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।
স্কুলের বিক্ষোভ যেভাবে ছড়িয়ে পড়ল
গত মাসে প্যারিসের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট ও দুর্বল অবকাঠামোর প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা ছোট শ্রেণিকক্ষ, পর্যাপ্ত শিক্ষক, উন্নত ভবন ও সহনীয় সময়সূচির দাবি জানান। পরে বোর্দো, রেন, নান্ত, লিওঁ, লিল ও মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলনে শ্রমিক সংগঠন ও ‘ইয়েলো ভেস্ট’ সমর্থকদের অংশগ্রহণ নতুন মাত্রা যোগ করে। তাদের অভিযোগ, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও সাধারণ মানুষের আয় ও সরকারি সেবার মান সেই অনুপাতে বাড়ছে না।
এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমসাময়িক ইতিহাসের অধ্যাপক এমিল চাবালের মতে, বর্তমান বিক্ষোভ ফ্রান্সে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সামাজিক অসন্তোষের ধারাবাহিকতা। শিক্ষার্থীদের দাবি ও শ্রমিকদের অর্থনৈতিক উদ্বেগ এক জায়গায় মিলিত হওয়ায় সরকারের ওপর চাপ বেড়েছে।
বাজেট নিয়ে অসন্তোষ কেন
সরকারের প্রস্তাবিত ২০২৭ সালের বাজেটে ৫৪ বিলিয়ন ইউরো বা প্রায় ৬০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের ব্যয় সংকোচন ও করসংক্রান্ত পদক্ষেপ রাখা হয়েছে। বাজেট ঘাটতি কমাতে সরকার এসব পদক্ষেপ প্রয়োজনীয় বলে দাবি করছে।
তবে প্রস্তাবিত পদক্ষেপ নিয়ে শ্রমিক সংগঠনগুলোর আপত্তি রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন নির্ধারণে ব্যবহৃত বেতন কাঠামোর সমন্বয় স্থগিত রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। সংগঠনগুলোর দাবি, এতে টানা চতুর্থ বছরের মতো বেতন কাঠামোর সমন্বয় আটকে যেতে পারে।
ফলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও সুযোগ-সুবিধার দাবি, শ্রমিকদের বেতন এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ একই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী দোনাতেল্লা দেলা পোর্তার মতে, তরুণদের আন্দোলন সামাজিক বৈষম্য, সরকারি ব্যয় ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কেরও সুযোগ তৈরি করছে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক সংকট
প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, বিক্ষোভে সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচার করা হবে। লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক টাউন হল আগুনে প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সরকারি ভবন ও দোকানপাটেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।
তবে বিক্ষোভকারীদের একটি ক্ষুদ্র অংশ সহিংসতায় জড়িত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, চলমান বিক্ষোভে পুলিশের স্টান গ্রেনেডের আঘাতে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের একটি হাত বিচ্ছিন্ন হয়েছে। কাঁদানে গ্যাসের ক্যানিস্টারের আঘাতে ১৪ বছর বয়সী আরেক কিশোরের চোয়াল ভেঙেছে। সংস্থাটি শিশুদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের নিন্দা জানিয়েছে।
বামপন্থী দল ফ্রান্স আনবাউডের নেতা জঁ-লুক মেলানশোঁ সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের দমন করার অভিযোগ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, সরকার বিক্ষোভকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখবে, নাকি এর পেছনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো মোকাবিলা করবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে কোনো দল বা জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় ফ্রান্সে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এতে বাজেট, কর ও সরকারি সেবা নিয়ে ঐকমত্য গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে। অধ্যাপক এমিল চাবালের মতে, এই পরিস্থিতিতে মানুষের অসন্তোষকে কার্যকর রাজনৈতিক সমাধানের দিকে নিয়ে যাওয়ার মতো উদ্যোগের অভাব রয়েছে।
কারা রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারেন
বর্তমান অস্থিরতা থেকে কট্টর ডানপন্থী নেত্রী মেরিন লে পেন রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারেন বলে মনে করেন নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক পল স্মিথ। তবে বিশ্লেষকদের মধ্যে এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে।
লে পেন শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বিক্ষোভকারীদের দাবিকে ‘বৈধ সামাজিক দাবি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, আন্দোলনকারীরা চরম বামপন্থীদের হাতে জিম্মি।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, কট্টর ডানপন্থীরা জনঅসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক সংকটের আলোচনাকে অভিবাসনবিরোধী বক্তব্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে বামপন্থীরা বৈষম্য ও ব্যয় সংকোচনের নীতিকে সংকটের কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন।
২০২৭ সালের এপ্রিলে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। তার আগে রাজনৈতিক দলগুলোকে একদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সক্ষমতা দেখাতে হবে, অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষা ও সরকারি সেবার সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনা দিতে হবে।
সূত্র: আল জাজিরা

শিক্ষকসংকট ও বিদ্যালয়ের দুরবস্থা নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন শ্রমিক ও ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকেরা। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি সেবার অবনতি ও সরকারের প্রতি দীর্ঘদিনের ক্ষোভে বিক্ষোভ এখন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
ফ্রান্সে স্কুলের পরিবেশ ও শিক্ষকসংকটের প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়ন ও ২০১৮ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকেরা।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার দেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নেন প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। অধিকাংশ বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি স্থানে ভাঙচুর, লুটপাট ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকোর্নু জানিয়েছেন, এসব ঘটনায় ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ১৫০ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।
স্কুলের বিক্ষোভ যেভাবে ছড়িয়ে পড়ল
গত মাসে প্যারিসের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট ও দুর্বল অবকাঠামোর প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা ছোট শ্রেণিকক্ষ, পর্যাপ্ত শিক্ষক, উন্নত ভবন ও সহনীয় সময়সূচির দাবি জানান। পরে বোর্দো, রেন, নান্ত, লিওঁ, লিল ও মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলনে শ্রমিক সংগঠন ও ‘ইয়েলো ভেস্ট’ সমর্থকদের অংশগ্রহণ নতুন মাত্রা যোগ করে। তাদের অভিযোগ, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও সাধারণ মানুষের আয় ও সরকারি সেবার মান সেই অনুপাতে বাড়ছে না।
এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমসাময়িক ইতিহাসের অধ্যাপক এমিল চাবালের মতে, বর্তমান বিক্ষোভ ফ্রান্সে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সামাজিক অসন্তোষের ধারাবাহিকতা। শিক্ষার্থীদের দাবি ও শ্রমিকদের অর্থনৈতিক উদ্বেগ এক জায়গায় মিলিত হওয়ায় সরকারের ওপর চাপ বেড়েছে।
বাজেট নিয়ে অসন্তোষ কেন
সরকারের প্রস্তাবিত ২০২৭ সালের বাজেটে ৫৪ বিলিয়ন ইউরো বা প্রায় ৬০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের ব্যয় সংকোচন ও করসংক্রান্ত পদক্ষেপ রাখা হয়েছে। বাজেট ঘাটতি কমাতে সরকার এসব পদক্ষেপ প্রয়োজনীয় বলে দাবি করছে।
তবে প্রস্তাবিত পদক্ষেপ নিয়ে শ্রমিক সংগঠনগুলোর আপত্তি রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন নির্ধারণে ব্যবহৃত বেতন কাঠামোর সমন্বয় স্থগিত রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। সংগঠনগুলোর দাবি, এতে টানা চতুর্থ বছরের মতো বেতন কাঠামোর সমন্বয় আটকে যেতে পারে।
ফলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও সুযোগ-সুবিধার দাবি, শ্রমিকদের বেতন এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ একই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী দোনাতেল্লা দেলা পোর্তার মতে, তরুণদের আন্দোলন সামাজিক বৈষম্য, সরকারি ব্যয় ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কেরও সুযোগ তৈরি করছে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক সংকট
প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, বিক্ষোভে সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচার করা হবে। লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক টাউন হল আগুনে প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সরকারি ভবন ও দোকানপাটেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।
তবে বিক্ষোভকারীদের একটি ক্ষুদ্র অংশ সহিংসতায় জড়িত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, চলমান বিক্ষোভে পুলিশের স্টান গ্রেনেডের আঘাতে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের একটি হাত বিচ্ছিন্ন হয়েছে। কাঁদানে গ্যাসের ক্যানিস্টারের আঘাতে ১৪ বছর বয়সী আরেক কিশোরের চোয়াল ভেঙেছে। সংস্থাটি শিশুদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের নিন্দা জানিয়েছে।
বামপন্থী দল ফ্রান্স আনবাউডের নেতা জঁ-লুক মেলানশোঁ সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের দমন করার অভিযোগ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, সরকার বিক্ষোভকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখবে, নাকি এর পেছনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো মোকাবিলা করবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে কোনো দল বা জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় ফ্রান্সে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এতে বাজেট, কর ও সরকারি সেবা নিয়ে ঐকমত্য গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে। অধ্যাপক এমিল চাবালের মতে, এই পরিস্থিতিতে মানুষের অসন্তোষকে কার্যকর রাজনৈতিক সমাধানের দিকে নিয়ে যাওয়ার মতো উদ্যোগের অভাব রয়েছে।
কারা রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারেন
বর্তমান অস্থিরতা থেকে কট্টর ডানপন্থী নেত্রী মেরিন লে পেন রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারেন বলে মনে করেন নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক পল স্মিথ। তবে বিশ্লেষকদের মধ্যে এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে।
লে পেন শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বিক্ষোভকারীদের দাবিকে ‘বৈধ সামাজিক দাবি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, আন্দোলনকারীরা চরম বামপন্থীদের হাতে জিম্মি।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, কট্টর ডানপন্থীরা জনঅসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক সংকটের আলোচনাকে অভিবাসনবিরোধী বক্তব্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে বামপন্থীরা বৈষম্য ও ব্যয় সংকোচনের নীতিকে সংকটের কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন।
২০২৭ সালের এপ্রিলে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। তার আগে রাজনৈতিক দলগুলোকে একদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সক্ষমতা দেখাতে হবে, অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষা ও সরকারি সেবার সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনা দিতে হবে।
সূত্র: আল জাজিরা

ফ্রান্সে স্কুলের বিক্ষোভ কেন বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিল
সিজেডএন ডেস্ক

শিক্ষকসংকট ও বিদ্যালয়ের দুরবস্থা নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন শ্রমিক ও ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকেরা। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি সেবার অবনতি ও সরকারের প্রতি দীর্ঘদিনের ক্ষোভে বিক্ষোভ এখন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
ফ্রান্সে স্কুলের পরিবেশ ও শিক্ষকসংকটের প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়ন ও ২০১৮ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকেরা।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার দেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নেন প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। অধিকাংশ বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি স্থানে ভাঙচুর, লুটপাট ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকোর্নু জানিয়েছেন, এসব ঘটনায় ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ১৫০ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।
স্কুলের বিক্ষোভ যেভাবে ছড়িয়ে পড়ল
গত মাসে প্যারিসের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট ও দুর্বল অবকাঠামোর প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা ছোট শ্রেণিকক্ষ, পর্যাপ্ত শিক্ষক, উন্নত ভবন ও সহনীয় সময়সূচির দাবি জানান। পরে বোর্দো, রেন, নান্ত, লিওঁ, লিল ও মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলনে শ্রমিক সংগঠন ও ‘ইয়েলো ভেস্ট’ সমর্থকদের অংশগ্রহণ নতুন মাত্রা যোগ করে। তাদের অভিযোগ, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও সাধারণ মানুষের আয় ও সরকারি সেবার মান সেই অনুপাতে বাড়ছে না।
এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমসাময়িক ইতিহাসের অধ্যাপক এমিল চাবালের মতে, বর্তমান বিক্ষোভ ফ্রান্সে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সামাজিক অসন্তোষের ধারাবাহিকতা। শিক্ষার্থীদের দাবি ও শ্রমিকদের অর্থনৈতিক উদ্বেগ এক জায়গায় মিলিত হওয়ায় সরকারের ওপর চাপ বেড়েছে।
বাজেট নিয়ে অসন্তোষ কেন
সরকারের প্রস্তাবিত ২০২৭ সালের বাজেটে ৫৪ বিলিয়ন ইউরো বা প্রায় ৬০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের ব্যয় সংকোচন ও করসংক্রান্ত পদক্ষেপ রাখা হয়েছে। বাজেট ঘাটতি কমাতে সরকার এসব পদক্ষেপ প্রয়োজনীয় বলে দাবি করছে।
তবে প্রস্তাবিত পদক্ষেপ নিয়ে শ্রমিক সংগঠনগুলোর আপত্তি রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন নির্ধারণে ব্যবহৃত বেতন কাঠামোর সমন্বয় স্থগিত রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। সংগঠনগুলোর দাবি, এতে টানা চতুর্থ বছরের মতো বেতন কাঠামোর সমন্বয় আটকে যেতে পারে।
ফলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও সুযোগ-সুবিধার দাবি, শ্রমিকদের বেতন এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ একই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী দোনাতেল্লা দেলা পোর্তার মতে, তরুণদের আন্দোলন সামাজিক বৈষম্য, সরকারি ব্যয় ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কেরও সুযোগ তৈরি করছে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক সংকট
প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, বিক্ষোভে সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচার করা হবে। লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক টাউন হল আগুনে প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সরকারি ভবন ও দোকানপাটেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।
তবে বিক্ষোভকারীদের একটি ক্ষুদ্র অংশ সহিংসতায় জড়িত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, চলমান বিক্ষোভে পুলিশের স্টান গ্রেনেডের আঘাতে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের একটি হাত বিচ্ছিন্ন হয়েছে। কাঁদানে গ্যাসের ক্যানিস্টারের আঘাতে ১৪ বছর বয়সী আরেক কিশোরের চোয়াল ভেঙেছে। সংস্থাটি শিশুদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের নিন্দা জানিয়েছে।
বামপন্থী দল ফ্রান্স আনবাউডের নেতা জঁ-লুক মেলানশোঁ সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের দমন করার অভিযোগ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, সরকার বিক্ষোভকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখবে, নাকি এর পেছনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো মোকাবিলা করবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে কোনো দল বা জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় ফ্রান্সে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এতে বাজেট, কর ও সরকারি সেবা নিয়ে ঐকমত্য গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে। অধ্যাপক এমিল চাবালের মতে, এই পরিস্থিতিতে মানুষের অসন্তোষকে কার্যকর রাজনৈতিক সমাধানের দিকে নিয়ে যাওয়ার মতো উদ্যোগের অভাব রয়েছে।
কারা রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারেন
বর্তমান অস্থিরতা থেকে কট্টর ডানপন্থী নেত্রী মেরিন লে পেন রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারেন বলে মনে করেন নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক পল স্মিথ। তবে বিশ্লেষকদের মধ্যে এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে।
লে পেন শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বিক্ষোভকারীদের দাবিকে ‘বৈধ সামাজিক দাবি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, আন্দোলনকারীরা চরম বামপন্থীদের হাতে জিম্মি।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, কট্টর ডানপন্থীরা জনঅসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক সংকটের আলোচনাকে অভিবাসনবিরোধী বক্তব্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে বামপন্থীরা বৈষম্য ও ব্যয় সংকোচনের নীতিকে সংকটের কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন।
২০২৭ সালের এপ্রিলে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। তার আগে রাজনৈতিক দলগুলোকে একদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সক্ষমতা দেখাতে হবে, অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষা ও সরকারি সেবার সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনা দিতে হবে।
সূত্র: আল জাজিরা









