বিক্ষোভে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে ফ্রান্স

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
বিক্ষোভে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে ফ্রান্স
ফ্রান্সে সংঘর্ষের একদিন পর একটি পোড়া গাড়ির ভেতর দিয়ে একজন পৌরকর্মীকে রাস্তা পরিষ্কার করতে দেখা যাচ্ছে

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি সেবার অবনতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিয়েছে। শনিবার দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে একজন বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন ছয় শতাধিক পুলিশ সদস্য। এ ছাড়া দুই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রবিবার সহিংসতার পর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও সড়ক পরিষ্কারের কাজ শুরু হয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ এই অস্থিরতায় কয়েকশ’ দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও দোকানপাটে লুটপাট চালানো হয়েছে, কোথাও সরকারি ভবনে আগুন দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের লিমোজেস শহরের ১৪৩ বছরের পুরোনো টাউন হলের বেশির ভাগ অংশ আগুনে পুড়ে গেছে।

কী ঘটেছে শনিবার

শনিবার ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়। এতে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ অংশ নেন। শুরুতে বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।

লিল, মার্সেই, স্ট্রাসবার্গ, বোর্দো ও প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন বিক্ষোভকারীদের কয়েকটি সহিংস গোষ্ঠীর সদস্যরা।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, এ ঘটনায় দুই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন ছয় শতাধিক পুলিশ সদস্য। বিক্ষোভ চলাকালে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে এক বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়।

প্যারিসে পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে সংঘর্ষের এলাকার কাছাকাছি একটি হোটেল থেকে অতিথিদের সরিয়ে নিতে হয়। সেখানে অবস্থান করা নেদারল্যান্ডসের এক উদ্যোক্তা পরিস্থিতিকে যুদ্ধক্ষেত্রের সঙ্গে তুলনা করেন।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতি কোথায়

সহিংসতায় ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরের দোকানপাট ও সরকারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্যারিসের রাস্তায় পোড়া গাড়ি, ভাঙা কাচ ও ভাঙচুরের চিহ্ন দেখা গেছে। রবিবার বিভিন্ন শহরে পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু হয়।

সবচেয়ে বড় ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে লিমোজেস শহরে। সেখানে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় টাউন হলের বেশির ভাগ অংশ পুড়ে গেছে। শহরটির মেয়র গিয়োম গেরাঁর ভাষ্য, ভবনটিতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ছিল পরিকল্পিত। ঘটনার সময় ভেতরে থাকা লোকজন নিজেদের জীবন নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন।

টাউন হলটি পুনর্নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ না পেলে পদত্যাগ করার হুমকি দিয়েছেন মেয়র। ভবনটির ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় ২০১৯ সালে প্যারিসের নটর ডেম ক্যাথেড্রালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের স্মৃতি ফিরে এসেছে।

বোর্দোর মেয়র জানিয়েছেন, তাঁর শহরে প্রায় ১০০টি দোকানে লুটপাট হয়েছে। মার্সেই শহরের মেয়রও সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

ফ্রান্সের বড় খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ক্যারেফোরের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলেক্সান্দার বোমপার্ড জানিয়েছেন, তাঁদের ৫০টি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২০টিতে লুটপাট চালানো হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি ইউরো ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

কেন বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল

এই আন্দোলনের শুরু গত মাসে। শ্রমজীবী মানুষের বসবাস বেশি, এমন কয়েকটি শহরতলিতে স্কুলের পরিবেশ ও শিক্ষকের সংকট নিয়ে প্রতিবাদ শুরু হয়। পরে সেই বিক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বৈষম্য, সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং জনসেবার মান নিয়ে অসন্তোষ।

ফ্রান্সে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানির বাড়তি দাম সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষও বাড়ছে। এসব সমস্যা ঘিরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমেছে।

বিক্ষোভে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নিলেও সহিংসতার জন্য দায়ী করা হচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে। ফরাসি সরকার বলছে, কট্টর বামপন্থী ও অতি বামপন্থী গোষ্ঠীর সদস্যদের পাশাপাশি অপরাধীরাও ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িত ছিল।

ম্যাক্রোঁ সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে

আগামী বছর ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তার আগে এই সহিংসতা প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও তাঁর সরকারের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করেছে।

প্রায় এক দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা ম্যাক্রোঁর সরকারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক দুরবস্থা, বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ ও সামাজিক অসন্তোষ সামাল দিতে ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক বিক্ষোভ সেই অসন্তোষেরই বড় প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু সহিংসতার জন্য চরম বামপন্থী গোষ্ঠী ও অপরাধীদের দায়ী করেছেন। অন্যদিকে অর্থনীতিমন্ত্রী রোলাঁ লেসক্যুর ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যারা ভাঙচুর করেছে, তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।

রবিবার রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর। তাঁর এই ভাষণে সহিংসতা মোকাবিলা, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা এবং জনজীবনে স্থিতিশীলতা ফেরানোর বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হতে পারে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ

ফ্রান্সের জন্য এখন তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হলো সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ, ক্ষতিগ্রস্ত সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা পুনরুদ্ধার এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা এবং জনসেবা স্বাভাবিক করাও জরুরি।

তবে শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করলেই সংকটের সমাধান হবে না। জীবনযাত্রার ব্যয়, বৈষম্য, শিক্ষা ও সরকারি সেবার মান নিয়ে মানুষের যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তার সমাধানও প্রয়োজন।

আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে এই পরিস্থিতি ফরাসি রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। সরকার কীভাবে সহিংসতা মোকাবিলা করে এবং সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমনে কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতির অনেকটাই নির্ভর করবে।

/এমআর/