অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই আসছে বিশাল বাজেট

অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই আসছে বিশাল বাজেট
মরিয়ম সেঁজুতি

মহল্লার চায়ের দোকান থেকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নীতিনির্ধারকদের বৈঠকখানা-সর্বত্রই এখন এক গভীর সংকটের আবহ। একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকার টানাপোড়েন। একদিকে দৃশ্যমান ইটের ওপর ইট গেঁথে আকাশের দিকে উঠে চলা মেগা প্রকল্পের ঝকঝকে উন্নয়ন, অন্যদিকে বাজারের থলে হাতে মধ্যবিত্তের মলিন মুখের দীর্ঘশ্বাস। এক অদ্ভুত দোলাচলে দাঁড়িয়ে আছে দেশের অর্থনীতি। যার একপাশে প্রবৃদ্ধির দুর্বার আকাঙ্ক্ষা, আর অপরপাশে টেনে ধরেছে মূল্যস্ফীতির কঠিন বাস্তবতা।
অর্থনীতির এই বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যেই দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট দিতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। এই বাজেট শুধু নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক পরিকল্পনাই নয়, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেরও প্রথম বড় পরীক্ষা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সম্ভাব্য বাজেটের আকার ধরা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাজেটের আকার বাড়ছে প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা।
কিন্তু আয়-ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই বাজেট বাস্তবায়নের বড় অংশই নির্ভর করছে ঋণের ওপর। সরকারের মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে ঘাটতি প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ জোগাড় করতে সরকারকে দেশীয় ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বাজেটের মূল লক্ষ্য চারটি। এগুলো হচ্ছে অর্থনীতিকে পুনরায় প্রবৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা। অর্থমন্ত্রী নিজেই সম্প্রতি সচিবালয়ে বলেছেন, অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতেই বড় বাজেট করতে হয়েছে।
তবে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, সরকারের জন্য এটি এক অগ্নিপরীক্ষা। একদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত মেনে সংস্কারের চাপ, অন্যদিকে দেশের ভেতরের অর্থনৈতিক সংকট। এবারের বাজেটে প্রবৃদ্ধির চেয়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম আরেক দফা বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব ভোক্তাদের ওপর পড়বে বলে অনেকেই মনে করছেন। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।
মূলত উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে বাজার। এছাড়া ব্যাংক খাতে তীব্র তারল্য সংকট, আর রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে চলছে চরম দৈন্যদশা। দেশের অর্থনীতি যখন এমন এক ত্রিমুখী সংকটে রীতিমতো ধুঁকছে, ঠিক তখন আসছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল বাজেট। ১১ জুন জাতীয় সংসদে দেশের নতুন অর্থবছরের এই বাজেট প্রস্তাব পেশ করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থনীতিবিদরা একে এক ‘শাঁখের করাত’ বাজেট হিসেবে অ্যাখ্যা দিচ্ছে। একদিকে উন্নয়নশীল দেশের তকমা ধরে রাখতে দৃশ্যমান অবকাঠামো ও প্রবৃদ্ধির গতি বজায় রাখার রাষ্ট্রীয় তাগিদ, অন্যদিকে বাজারের আগুনে পুড়তে থাকা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ক্ষোভ প্রশমনের চ্যালেঞ্জ। এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রীকে মেলাতে হচ্ছে এক জটিল সমীকরণ।
এ প্রসঙ্গে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন একটি অনুষ্ঠানে সম্প্রতি বলেছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হিসাবে রাখতে হবে। কারণ মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের ওপর।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বন্দর, জ্বালানি ও পরিবহন খাতে অব্যবস্থাপনার কারণেই উৎপাদন খরচ বেড়েছে, যা শিল্পপাতকে আরও চাপে ফেলবে। এ বাজেট বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে তা উল্টো অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে বলেও মনে করেন তিনি। ড. জাহিদ আরো বলেন, মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়তে পারে, যা সামগ্রিকভাবে মুদ্রা বাজারে অস্তিত্ব তৈরি করতে পারবে।
বাজারের আগুন বনাম সামষ্টিক অর্থনীতি
উন্নয়নের একটি স্তম্ভ যখন মাথা তুলে দাঁড়ায়, তখন তা শুধু রড-সিমেন্টের কাঠামো থাকে না, হয়ে ওঠে একটি জাতির স্বপ্নের স্মারক। কিন্তু সেই স্বপ্নের সুড়ঙ্গ বেয়ে যখন বাজারের আগুন এসে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে হানা দেয়, তখন স্বপ্ন আর বাস্তবের দূরত্ব অনেক বেড়ে যায়।
সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং ডলারের উচ্চমূল্য সেই লক্ষ্য অর্জনকে কঠিন করে তুলছে।
‘মেট্রোরেলে চড়ে দ্রুত বাড়ি ফেরা যায় ঠিকই, কিন্তু সেই বাড়িতে গিয়ে যখন দেখি চালের ড্রাম ফাঁকা, তখন ওই গতিটুকু বড় বেশি নিষ্ঠুর মনে হয়।’— কারওয়ান বাজারের এক চিলতে আলো-আঁধারিতে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন এক বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক সোলায়মান রায়হান।
তার এই মলিন মুখের আকুতি কোনো এক ব্যক্তির নয়। তিনি সেই বিশাল জনগোষ্ঠীরই প্রতিনিধি, যার কাছে জিডিপির ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফের চেয়ে থালার ভাতের নিশ্চয়তা অনেক বেশি দামি।
রেমিট্যান্সের প্রবাহ কিছুটা আশার আলো দেখালেও সামষ্টিক অর্থনীতির বাকি সব সূচকই নেতিবাচক ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে পারছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ফলে তীব্র অর্থ সংকটে পড়েছে সরকার। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে সরকারকে আবারো ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর করতে হবে, যা ইতিমধ্যে তারল্য সংকটে ভোগা বেসরকারি খাতকে আরও বেশি সংকুচিত করতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এবারের বাজেট কোনো সাধারণ হিসাব-নিকাশের খাতা নয়, এটি আসলে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। রাষ্ট্র যখনই পরিকাঠামো উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে বিপুল অর্থ বাজারে ছাড়ে, সেই বাড়তি টাকাই আবার তরল হয়ে ধেয়ে যায় নিত্যপণ্যের বাজারের দিকে। ফলে চাল, ভোজ্য তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। প্রবৃদ্ধির এই রথকে সচল রাখতে গিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট যেভাবে শূন্য হচ্ছে, তা যেন এক অলিখিত ট্র্যাজেডি।
বার্ষিক উন্নয়ন ব্যয়ের রেকর্ড পরিকল্পনা
বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় কমাচ্ছে না সরকার। আগামী অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ৩ লাখ কোটি টাকার ব্যয় মেটাতে ঋণের লক্ষ্য থাকছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পরিবহন ও যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির চাপ আছে। সে কারণে বেড়েছে এডিপির আকার। তাদের মতে, এত বড় উন্নয়ন ব্যয়ের বাস্তবায়ন সক্ষমতা নেই সরকারের।
যদিও অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলছেন, নানামুখী সংস্কার ও তদারকিতে বাস্তবায়ন জোরদার করা হবে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাজেটের আকার নয়, বাস্তবায়ন সক্ষমতাই গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো প্রকল্প শেষ হচ্ছে কি না, প্রকল্প ব্যয়ের যৌক্তিকতা কতটুকু এবং বরাদ্দকৃত অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না-সেসব বিষয় অবশ্যই দেখতে হবে।
এসব সিপিডি নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজেটে হিসাব–নিকাশ করে অঙ্ক মেলানো গেলেও বাস্তবায়নের জন্য দেখতে হবে নানা বিষয়। অথচ সেদিকে মনোযোগ কম দেওয়া হচ্ছে। সুতরাং আকারের পাশাপাশি বাস্তবায়নের সক্ষমতা অর্জন করার অঙ্গীকারও রাজনৈতিক সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার হতে হবে।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অগ্রাধিকার
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। নতুন বাজেটে এ খাতে প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে।
বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড এবং বিভিন্ন নগদ সহায়তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হতে পারে। এসব কর্মসূচি নিম্নআয়ের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়াবে বলে সরকার মনে করছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘ মেয়াদে দারিদ্র্য কমাতে হলে শুধু ভাতা নয়, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
কোন পথে মুক্তি
টানাপোড়েনের এই বাজেটে সরকার শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারবে নাকি প্রবৃদ্ধির খতিয়ানকেই এগিয়ে রাখবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই মুহূর্তে বিলাসী উন্নয়ণ প্রকল্পের লাগাম টেনে সেই অর্থ সরাসরি সাধারণ মানুষের খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যবহার করতে হবে।
এছাড়া বাজার যারা আড়ালে থেকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই সিন্ডিকেটের ভেঙে দেওয়া এবং স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সুলভ মূল্যের রেশনিং ব্যবস্থা জোরদার করাই হতে পারে এই মুহূর্তের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
উন্নয়ন আর বেঁচে থাকার এই কঠিন লড়াইয়ে ১১ জুনের বাজেট সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফেরাবে, নাকি সংকটের বোঝা আরও ভারী করবে-তা নিয়ে সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

মহল্লার চায়ের দোকান থেকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নীতিনির্ধারকদের বৈঠকখানা-সর্বত্রই এখন এক গভীর সংকটের আবহ। একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকার টানাপোড়েন। একদিকে দৃশ্যমান ইটের ওপর ইট গেঁথে আকাশের দিকে উঠে চলা মেগা প্রকল্পের ঝকঝকে উন্নয়ন, অন্যদিকে বাজারের থলে হাতে মধ্যবিত্তের মলিন মুখের দীর্ঘশ্বাস। এক অদ্ভুত দোলাচলে দাঁড়িয়ে আছে দেশের অর্থনীতি। যার একপাশে প্রবৃদ্ধির দুর্বার আকাঙ্ক্ষা, আর অপরপাশে টেনে ধরেছে মূল্যস্ফীতির কঠিন বাস্তবতা।
অর্থনীতির এই বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যেই দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট দিতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। এই বাজেট শুধু নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক পরিকল্পনাই নয়, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেরও প্রথম বড় পরীক্ষা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সম্ভাব্য বাজেটের আকার ধরা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাজেটের আকার বাড়ছে প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা।
কিন্তু আয়-ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই বাজেট বাস্তবায়নের বড় অংশই নির্ভর করছে ঋণের ওপর। সরকারের মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে ঘাটতি প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ জোগাড় করতে সরকারকে দেশীয় ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বাজেটের মূল লক্ষ্য চারটি। এগুলো হচ্ছে অর্থনীতিকে পুনরায় প্রবৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা। অর্থমন্ত্রী নিজেই সম্প্রতি সচিবালয়ে বলেছেন, অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতেই বড় বাজেট করতে হয়েছে।
তবে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, সরকারের জন্য এটি এক অগ্নিপরীক্ষা। একদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত মেনে সংস্কারের চাপ, অন্যদিকে দেশের ভেতরের অর্থনৈতিক সংকট। এবারের বাজেটে প্রবৃদ্ধির চেয়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম আরেক দফা বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব ভোক্তাদের ওপর পড়বে বলে অনেকেই মনে করছেন। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।
মূলত উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে বাজার। এছাড়া ব্যাংক খাতে তীব্র তারল্য সংকট, আর রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে চলছে চরম দৈন্যদশা। দেশের অর্থনীতি যখন এমন এক ত্রিমুখী সংকটে রীতিমতো ধুঁকছে, ঠিক তখন আসছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল বাজেট। ১১ জুন জাতীয় সংসদে দেশের নতুন অর্থবছরের এই বাজেট প্রস্তাব পেশ করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থনীতিবিদরা একে এক ‘শাঁখের করাত’ বাজেট হিসেবে অ্যাখ্যা দিচ্ছে। একদিকে উন্নয়নশীল দেশের তকমা ধরে রাখতে দৃশ্যমান অবকাঠামো ও প্রবৃদ্ধির গতি বজায় রাখার রাষ্ট্রীয় তাগিদ, অন্যদিকে বাজারের আগুনে পুড়তে থাকা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ক্ষোভ প্রশমনের চ্যালেঞ্জ। এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রীকে মেলাতে হচ্ছে এক জটিল সমীকরণ।
এ প্রসঙ্গে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন একটি অনুষ্ঠানে সম্প্রতি বলেছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হিসাবে রাখতে হবে। কারণ মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের ওপর।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বন্দর, জ্বালানি ও পরিবহন খাতে অব্যবস্থাপনার কারণেই উৎপাদন খরচ বেড়েছে, যা শিল্পপাতকে আরও চাপে ফেলবে। এ বাজেট বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে তা উল্টো অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে বলেও মনে করেন তিনি। ড. জাহিদ আরো বলেন, মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়তে পারে, যা সামগ্রিকভাবে মুদ্রা বাজারে অস্তিত্ব তৈরি করতে পারবে।
বাজারের আগুন বনাম সামষ্টিক অর্থনীতি
উন্নয়নের একটি স্তম্ভ যখন মাথা তুলে দাঁড়ায়, তখন তা শুধু রড-সিমেন্টের কাঠামো থাকে না, হয়ে ওঠে একটি জাতির স্বপ্নের স্মারক। কিন্তু সেই স্বপ্নের সুড়ঙ্গ বেয়ে যখন বাজারের আগুন এসে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে হানা দেয়, তখন স্বপ্ন আর বাস্তবের দূরত্ব অনেক বেড়ে যায়।
সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং ডলারের উচ্চমূল্য সেই লক্ষ্য অর্জনকে কঠিন করে তুলছে।
‘মেট্রোরেলে চড়ে দ্রুত বাড়ি ফেরা যায় ঠিকই, কিন্তু সেই বাড়িতে গিয়ে যখন দেখি চালের ড্রাম ফাঁকা, তখন ওই গতিটুকু বড় বেশি নিষ্ঠুর মনে হয়।’— কারওয়ান বাজারের এক চিলতে আলো-আঁধারিতে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন এক বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক সোলায়মান রায়হান।
তার এই মলিন মুখের আকুতি কোনো এক ব্যক্তির নয়। তিনি সেই বিশাল জনগোষ্ঠীরই প্রতিনিধি, যার কাছে জিডিপির ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফের চেয়ে থালার ভাতের নিশ্চয়তা অনেক বেশি দামি।
রেমিট্যান্সের প্রবাহ কিছুটা আশার আলো দেখালেও সামষ্টিক অর্থনীতির বাকি সব সূচকই নেতিবাচক ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে পারছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ফলে তীব্র অর্থ সংকটে পড়েছে সরকার। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে সরকারকে আবারো ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর করতে হবে, যা ইতিমধ্যে তারল্য সংকটে ভোগা বেসরকারি খাতকে আরও বেশি সংকুচিত করতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এবারের বাজেট কোনো সাধারণ হিসাব-নিকাশের খাতা নয়, এটি আসলে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। রাষ্ট্র যখনই পরিকাঠামো উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে বিপুল অর্থ বাজারে ছাড়ে, সেই বাড়তি টাকাই আবার তরল হয়ে ধেয়ে যায় নিত্যপণ্যের বাজারের দিকে। ফলে চাল, ভোজ্য তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। প্রবৃদ্ধির এই রথকে সচল রাখতে গিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট যেভাবে শূন্য হচ্ছে, তা যেন এক অলিখিত ট্র্যাজেডি।
বার্ষিক উন্নয়ন ব্যয়ের রেকর্ড পরিকল্পনা
বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় কমাচ্ছে না সরকার। আগামী অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ৩ লাখ কোটি টাকার ব্যয় মেটাতে ঋণের লক্ষ্য থাকছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পরিবহন ও যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির চাপ আছে। সে কারণে বেড়েছে এডিপির আকার। তাদের মতে, এত বড় উন্নয়ন ব্যয়ের বাস্তবায়ন সক্ষমতা নেই সরকারের।
যদিও অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলছেন, নানামুখী সংস্কার ও তদারকিতে বাস্তবায়ন জোরদার করা হবে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাজেটের আকার নয়, বাস্তবায়ন সক্ষমতাই গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো প্রকল্প শেষ হচ্ছে কি না, প্রকল্প ব্যয়ের যৌক্তিকতা কতটুকু এবং বরাদ্দকৃত অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না-সেসব বিষয় অবশ্যই দেখতে হবে।
এসব সিপিডি নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজেটে হিসাব–নিকাশ করে অঙ্ক মেলানো গেলেও বাস্তবায়নের জন্য দেখতে হবে নানা বিষয়। অথচ সেদিকে মনোযোগ কম দেওয়া হচ্ছে। সুতরাং আকারের পাশাপাশি বাস্তবায়নের সক্ষমতা অর্জন করার অঙ্গীকারও রাজনৈতিক সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার হতে হবে।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অগ্রাধিকার
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। নতুন বাজেটে এ খাতে প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে।
বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড এবং বিভিন্ন নগদ সহায়তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হতে পারে। এসব কর্মসূচি নিম্নআয়ের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়াবে বলে সরকার মনে করছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘ মেয়াদে দারিদ্র্য কমাতে হলে শুধু ভাতা নয়, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
কোন পথে মুক্তি
টানাপোড়েনের এই বাজেটে সরকার শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারবে নাকি প্রবৃদ্ধির খতিয়ানকেই এগিয়ে রাখবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই মুহূর্তে বিলাসী উন্নয়ণ প্রকল্পের লাগাম টেনে সেই অর্থ সরাসরি সাধারণ মানুষের খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যবহার করতে হবে।
এছাড়া বাজার যারা আড়ালে থেকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই সিন্ডিকেটের ভেঙে দেওয়া এবং স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সুলভ মূল্যের রেশনিং ব্যবস্থা জোরদার করাই হতে পারে এই মুহূর্তের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
উন্নয়ন আর বেঁচে থাকার এই কঠিন লড়াইয়ে ১১ জুনের বাজেট সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফেরাবে, নাকি সংকটের বোঝা আরও ভারী করবে-তা নিয়ে সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই আসছে বিশাল বাজেট
মরিয়ম সেঁজুতি

মহল্লার চায়ের দোকান থেকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নীতিনির্ধারকদের বৈঠকখানা-সর্বত্রই এখন এক গভীর সংকটের আবহ। একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকার টানাপোড়েন। একদিকে দৃশ্যমান ইটের ওপর ইট গেঁথে আকাশের দিকে উঠে চলা মেগা প্রকল্পের ঝকঝকে উন্নয়ন, অন্যদিকে বাজারের থলে হাতে মধ্যবিত্তের মলিন মুখের দীর্ঘশ্বাস। এক অদ্ভুত দোলাচলে দাঁড়িয়ে আছে দেশের অর্থনীতি। যার একপাশে প্রবৃদ্ধির দুর্বার আকাঙ্ক্ষা, আর অপরপাশে টেনে ধরেছে মূল্যস্ফীতির কঠিন বাস্তবতা।
অর্থনীতির এই বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যেই দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট দিতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। এই বাজেট শুধু নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক পরিকল্পনাই নয়, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেরও প্রথম বড় পরীক্ষা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সম্ভাব্য বাজেটের আকার ধরা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাজেটের আকার বাড়ছে প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা।
কিন্তু আয়-ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই বাজেট বাস্তবায়নের বড় অংশই নির্ভর করছে ঋণের ওপর। সরকারের মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে ঘাটতি প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ জোগাড় করতে সরকারকে দেশীয় ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বাজেটের মূল লক্ষ্য চারটি। এগুলো হচ্ছে অর্থনীতিকে পুনরায় প্রবৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা। অর্থমন্ত্রী নিজেই সম্প্রতি সচিবালয়ে বলেছেন, অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতেই বড় বাজেট করতে হয়েছে।
তবে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, সরকারের জন্য এটি এক অগ্নিপরীক্ষা। একদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত মেনে সংস্কারের চাপ, অন্যদিকে দেশের ভেতরের অর্থনৈতিক সংকট। এবারের বাজেটে প্রবৃদ্ধির চেয়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম আরেক দফা বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব ভোক্তাদের ওপর পড়বে বলে অনেকেই মনে করছেন। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।
মূলত উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে বাজার। এছাড়া ব্যাংক খাতে তীব্র তারল্য সংকট, আর রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে চলছে চরম দৈন্যদশা। দেশের অর্থনীতি যখন এমন এক ত্রিমুখী সংকটে রীতিমতো ধুঁকছে, ঠিক তখন আসছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল বাজেট। ১১ জুন জাতীয় সংসদে দেশের নতুন অর্থবছরের এই বাজেট প্রস্তাব পেশ করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থনীতিবিদরা একে এক ‘শাঁখের করাত’ বাজেট হিসেবে অ্যাখ্যা দিচ্ছে। একদিকে উন্নয়নশীল দেশের তকমা ধরে রাখতে দৃশ্যমান অবকাঠামো ও প্রবৃদ্ধির গতি বজায় রাখার রাষ্ট্রীয় তাগিদ, অন্যদিকে বাজারের আগুনে পুড়তে থাকা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ক্ষোভ প্রশমনের চ্যালেঞ্জ। এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রীকে মেলাতে হচ্ছে এক জটিল সমীকরণ।
এ প্রসঙ্গে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন একটি অনুষ্ঠানে সম্প্রতি বলেছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হিসাবে রাখতে হবে। কারণ মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের ওপর।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বন্দর, জ্বালানি ও পরিবহন খাতে অব্যবস্থাপনার কারণেই উৎপাদন খরচ বেড়েছে, যা শিল্পপাতকে আরও চাপে ফেলবে। এ বাজেট বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে তা উল্টো অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে বলেও মনে করেন তিনি। ড. জাহিদ আরো বলেন, মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়তে পারে, যা সামগ্রিকভাবে মুদ্রা বাজারে অস্তিত্ব তৈরি করতে পারবে।
বাজারের আগুন বনাম সামষ্টিক অর্থনীতি
উন্নয়নের একটি স্তম্ভ যখন মাথা তুলে দাঁড়ায়, তখন তা শুধু রড-সিমেন্টের কাঠামো থাকে না, হয়ে ওঠে একটি জাতির স্বপ্নের স্মারক। কিন্তু সেই স্বপ্নের সুড়ঙ্গ বেয়ে যখন বাজারের আগুন এসে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে হানা দেয়, তখন স্বপ্ন আর বাস্তবের দূরত্ব অনেক বেড়ে যায়।
সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং ডলারের উচ্চমূল্য সেই লক্ষ্য অর্জনকে কঠিন করে তুলছে।
‘মেট্রোরেলে চড়ে দ্রুত বাড়ি ফেরা যায় ঠিকই, কিন্তু সেই বাড়িতে গিয়ে যখন দেখি চালের ড্রাম ফাঁকা, তখন ওই গতিটুকু বড় বেশি নিষ্ঠুর মনে হয়।’— কারওয়ান বাজারের এক চিলতে আলো-আঁধারিতে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন এক বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক সোলায়মান রায়হান।
তার এই মলিন মুখের আকুতি কোনো এক ব্যক্তির নয়। তিনি সেই বিশাল জনগোষ্ঠীরই প্রতিনিধি, যার কাছে জিডিপির ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফের চেয়ে থালার ভাতের নিশ্চয়তা অনেক বেশি দামি।
রেমিট্যান্সের প্রবাহ কিছুটা আশার আলো দেখালেও সামষ্টিক অর্থনীতির বাকি সব সূচকই নেতিবাচক ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে পারছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ফলে তীব্র অর্থ সংকটে পড়েছে সরকার। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে সরকারকে আবারো ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর করতে হবে, যা ইতিমধ্যে তারল্য সংকটে ভোগা বেসরকারি খাতকে আরও বেশি সংকুচিত করতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এবারের বাজেট কোনো সাধারণ হিসাব-নিকাশের খাতা নয়, এটি আসলে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। রাষ্ট্র যখনই পরিকাঠামো উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে বিপুল অর্থ বাজারে ছাড়ে, সেই বাড়তি টাকাই আবার তরল হয়ে ধেয়ে যায় নিত্যপণ্যের বাজারের দিকে। ফলে চাল, ভোজ্য তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। প্রবৃদ্ধির এই রথকে সচল রাখতে গিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট যেভাবে শূন্য হচ্ছে, তা যেন এক অলিখিত ট্র্যাজেডি।
বার্ষিক উন্নয়ন ব্যয়ের রেকর্ড পরিকল্পনা
বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় কমাচ্ছে না সরকার। আগামী অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ৩ লাখ কোটি টাকার ব্যয় মেটাতে ঋণের লক্ষ্য থাকছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পরিবহন ও যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির চাপ আছে। সে কারণে বেড়েছে এডিপির আকার। তাদের মতে, এত বড় উন্নয়ন ব্যয়ের বাস্তবায়ন সক্ষমতা নেই সরকারের।
যদিও অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলছেন, নানামুখী সংস্কার ও তদারকিতে বাস্তবায়ন জোরদার করা হবে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাজেটের আকার নয়, বাস্তবায়ন সক্ষমতাই গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো প্রকল্প শেষ হচ্ছে কি না, প্রকল্প ব্যয়ের যৌক্তিকতা কতটুকু এবং বরাদ্দকৃত অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না-সেসব বিষয় অবশ্যই দেখতে হবে।
এসব সিপিডি নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজেটে হিসাব–নিকাশ করে অঙ্ক মেলানো গেলেও বাস্তবায়নের জন্য দেখতে হবে নানা বিষয়। অথচ সেদিকে মনোযোগ কম দেওয়া হচ্ছে। সুতরাং আকারের পাশাপাশি বাস্তবায়নের সক্ষমতা অর্জন করার অঙ্গীকারও রাজনৈতিক সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার হতে হবে।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অগ্রাধিকার
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। নতুন বাজেটে এ খাতে প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে।
বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড এবং বিভিন্ন নগদ সহায়তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হতে পারে। এসব কর্মসূচি নিম্নআয়ের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়াবে বলে সরকার মনে করছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘ মেয়াদে দারিদ্র্য কমাতে হলে শুধু ভাতা নয়, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
কোন পথে মুক্তি
টানাপোড়েনের এই বাজেটে সরকার শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারবে নাকি প্রবৃদ্ধির খতিয়ানকেই এগিয়ে রাখবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই মুহূর্তে বিলাসী উন্নয়ণ প্রকল্পের লাগাম টেনে সেই অর্থ সরাসরি সাধারণ মানুষের খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যবহার করতে হবে।
এছাড়া বাজার যারা আড়ালে থেকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই সিন্ডিকেটের ভেঙে দেওয়া এবং স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সুলভ মূল্যের রেশনিং ব্যবস্থা জোরদার করাই হতে পারে এই মুহূর্তের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
উন্নয়ন আর বেঁচে থাকার এই কঠিন লড়াইয়ে ১১ জুনের বাজেট সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফেরাবে, নাকি সংকটের বোঝা আরও ভারী করবে-তা নিয়ে সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।




