শিরোনাম

গাদ্দাফির উত্তরসূরি সাইফকে হত্যা করে চার বন্দুকধারী

গাদ্দাফির উত্তরসূরি সাইফকে হত্যা করে চার বন্দুকধারী
সাইফ আল-ইসলাম। ছবি: রয়টার্স

লিবিয়ার প্রয়াত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির সবচেয়ে প্রভাবশালী ছেলে সাইফ আল-ইসলামের ওপর চার বন্দুকধারী হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করেছেন। ৫৩ বছর বয়সী সাইফ রাজধানী ত্রিপোলি থেকে ১৩৬ কিলোমিটার (৮৫ মাইল) দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত জিনতান শহরে নিহত হন।

গাদ্দাফি পরিবারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র আল-আরাবিয়াকে জানান, মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় হামলাকারীরা সাইফ আল-ইসলামের বাসভবনের বাগানে তাকে গুলি করে দ্রুত পালিয়ে যান। হামলা চালানোর আগে তারা বাড়ির নিরাপত্তা ক্যামেরাগুলো অকেজো করে দিয়েছিলেন।

সাইফ আল-ইসলামের প্রাণহানির ঘটনায় এখনো বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা হয়নি। তবে তার একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী একে ‘হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

সাইফ আল-ইসলামকে তার বাবা মুয়াম্মার গাদ্দাফির উত্তরসূরি ভাবা হতো। লিবিয়ার ক্ষমতা থেকে গাদ্দাফি উৎখাত হওয়ার পর তিনি এক দশক বন্দিজীবন কাটান। প্রত্যন্ত এক পাহাড়ি শহরে অজ্ঞাতবাসে থাকেন। লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করেন সাইফ– যা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।

কোনো আনুষ্ঠানিক পদ না থাকা সত্ত্বেও চার দশকের বেশি সময় লিবিয়া শাসন করা মুয়াম্মার গাদ্দাফির পরে তার ছেলে সাইফকেই দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি মনে করা হতো।

গাদ্দাফি ক্ষমতায় থাকাকালে সাইফ আল-ইসলাম লিবিয়ার রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখতেন। গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনা তার নেতৃত্বে পরিচালিত হতো। তিনি লিবিয়ার গণবিধ্বংসী অস্ত্র ত্যাগের আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৮৮ সালে স্কটল্যান্ডের লকার্বিতে প্যান অ্যাম ফ্লাইটে ১০৩ বোমা হামলায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়েও তিনিই আলোচনা করেছিলেন।

লিবিয়াকে বিশ্ব থেকে একঘরে অবস্থা থেকে মুক্ত করতে সংকল্পবদ্ধ সাইফ আল-ইসলাম পশ্চিমাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছিলেন। তিনি নিজেকে একজন সংস্কারক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করতেন। সংবিধান প্রণয়ন ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে অন্যদের প্রতি আহ্বান জানাতেন। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে পড়াশোনা করা এবং ইংরেজিতে সাবলীল কথা বলতে পারায় অনেক দেশের সরকার তাকে লিবিয়ার গ্রহণযোগ্য এবং পশ্চিমাবান্ধব মুখ হিসেবে দেখত।

২০১১ সালে যখন সাইফের বাবার দীর্ঘ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয়, তখন তিনি তার অনেক বন্ধুত্ব বিসর্জন দিয়ে পরিবার ও বংশের প্রতি অনুগত থাকার সিদ্ধান্ত নেন। বিদ্রোহীদের তিনি ‘ইঁদুর’ বলে সম্বোধন করেন। তাদের দমনে কঠোর অভিযানের অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী হয়ে ওঠেন সাইফ। বিদ্রোহের সময় বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা লিবিয়াতেই লড়াই করব, লিবিয়াতেই মরব।’

২০১১ সালের ১৯ নভেম্বর বিদ্রোহীদের হাতে আটক হওয়ার পর সাইফ আল-ইসলাম। ছবি: এপি
২০১১ সালের ১৯ নভেম্বর বিদ্রোহীদের হাতে আটক হওয়ার পর সাইফ আল-ইসলাম। ছবি: এপি

বিদ্রোহীরা রাজধানী ত্রিপোলি দখল করার পর সাইফ আল-ইসলাম বেদুইন উপজাতির ছদ্মবেশে প্রতিবেশী দেশ নাইজারে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তার বাবাকে বিদ্রোহীরা খুঁজে বের করে গুলি করে হত্যার প্রায় এক মাস পর, ‘আবু বকর সাদিক ব্রিগেড’ নামের একটি মিলিশিয়া বাহিনী মরুভূমির রাস্তা থেকে তাকে বন্দি করে পশ্চিমের শহর জিনতানে নিয়ে যায়।

পরের ৬ বছর সাইফ জিনতানে বন্দি ছিলেন, যা তার বাবা গাদ্দাফির আমলের বিলাসবহুল জীবন থেকে ছিল একেবারেই ভিন্ন। আগে তার পোষা বাঘ ছিল, তিনি বাজপাখি দিয়ে শিকার করতেন এবং লন্ডন সফরের সময় যুক্তরাজ্যের উচ্চবিত্ত সমাজের সঙ্গে মেলামেশা করতেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জিনতানে সাইফের সঙ্গে দেখা করেছিল। সেই সময় তার একটি দাঁত ভাঙা ছিল। সাইফ তাদের জানিয়েছিলেন, তিনি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। তাকে কারো সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয় না।

যুদ্ধাপরাধের দায়ে ২০১৫ সালে ত্রিপোলির একটি আদালত সাইফ আল-ইসলামকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার রায় দেন। পরে ২০১৭ সালে সাধারণ ক্ষমা আইনের আওতায় মিলিশিয়াদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর প্রাণহানির আশঙ্কায় জিনতানে কয়েক বছর আত্মগোপনে ছিলেন। ২০২১ সালে লিবিয়ার ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও পাগড়ি পরে সাইফ আল-ইসলাম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দিতে লিবিয়ার দক্ষিণের শহর সভায় নির্বাচনী কার্যালয়ে উপস্থিত হন।

আশা করা হয়েছিল, ২০১১ সালে ন্যাটোর সহায়তায় হওয়া যে বিদ্রোহ তার বাবাকে ক্ষমতাচ্যুত এবং দেশকে অস্থিতিশীলতায় নিমজ্জিত করেছিল, সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি জনগণের সমর্থন আদায় করে নেবেন। তবে তার প্রার্থিতা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। মুয়াম্মার গাদ্দাফির শাসনামলে যারা নির্যাতিত হয়েছিলেন, তারা সাইফের প্রার্থিতার তীব্র বিরোধিতা করেন। ২০১১ সালের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো থেকে গড়ে ওঠা শক্তিশালী সশস্ত্র দলগুলোও তার প্রার্থিতাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে।

২০২১ সালের শেষ দিকে নির্বাচনের নিয়মাবলি নিয়ে কোনো ঐকমত্য না হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ে। তখন সাইফ আল-ইসলামের প্রার্থিতা অন্যতম প্রধান বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ২০১৫ সালের দণ্ডাদেশের কারণে তাকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।

সাইফ এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার চেষ্টা করলে লিবিয়ার যোদ্ধারা আদালত ঘেরাও করে ফেলেন। এই ধারাবাহিক বিবাদ শেষ পর্যন্ত নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে পুরোপুরি ধসিয়ে দেয় এবং লিবিয়া আবার রাজনৈতিক অচলাবস্থায় ফিরে যায়।

/এফসি/