শিরোনাম

যেভাবে জন্ম নিলো ‘গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’

যেভাবে জন্ম নিলো ‘গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’
গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

বিশ্বরেকর্ড গড়ার খবর এখন প্রায়ই সংবাদের শিরোনাম হয়। কখনো সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো কাজ করে, কখনো সবচেয়ে বড় আয়োজনের মাধ্যমে, আবার কখনো বিস্ময়কর কোনো দক্ষতা দেখিয়ে মানুষ জায়গা করে নিচ্ছেন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে। বাংলাদেশেও নতুন কোনো রেকর্ডের খবর এলেই তা হয়ে ওঠে আলোচনার বিষয়। সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সবখানেই শুরু হয় চর্চা। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য বিশ্বের লাখো মানুষ চেষ্টা করে চলেছেন, সেটির জন্মের ইতিহাস কী আমাদের জানা আছে?

মজার বিষয় হলো, গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের সূচনা কোনো গবেষণাগারে, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে নয়। এর শুরু একটি তর্ক থেকে। একেবারে সাধারণ, দৈনন্দিন এক তর্ক।

স্যার হিউ বিভার
স্যার হিউ বিভার

সময়টা ১৯৫১ সাল। আয়ারল্যান্ডের ওয়েক্সফোর্ড কাউন্টিতে শিকারে বেরিয়েছিলেন গিনেস ব্রুয়ারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্যার হিউ বিভার। শিকার শেষে আড্ডা চলছিল। কথার ফাঁকে আলোচনা গিয়ে ঠেকে একটি প্রশ্নে, ইউরোপের সবচেয়ে দ্রুতগতির শিকারি পাখি কোনটি?

প্রশ্নটা যত সহজ, উত্তরটা তত নয়। আড্ডায় উপস্থিত কেউই নিশ্চিতভাবে উত্তর দিতে পারলেন না। একজন এক পাখির নাম বলছেন, আরেকজন অন্য নাম। তর্ক চলল, কিন্তু নিষ্পত্তি হলো না। পরে বইপত্র ঘেঁটেও নির্ভরযোগ্য উত্তর খুঁজে পাওয়া গেল না। সেই মুহূর্তেই হিউ বিবারের মনে একটি প্রশ্ন জাগল, এ ধরনের তথ্য নিয়ে তো প্রতিদিনই অসংখ্য তর্ক হয়। অথচ সবার জন্য গ্রহণযোগ্য এমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার নেই কেন?

সেই প্রশ্নই বদলে দেয় ইতিহাস। ১৯৫৩ সালে হিউ বিভার ভাবলেন, এমন একটি বই তৈরি করা যায় কি না, যেখানে বিশ্বের নানা ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে ছোট, সবচেয়ে দ্রুত, সবচেয়ে দীর্ঘ কিংবা সবচেয়ে ব্যতিক্রমী সব তথ্য এক জায়গায় পাওয়া যাবে। এমন একটি বই, যা তর্কের অবসান ঘটাবে এবং তথ্যের নির্ভরযোগ্য উৎস হয়ে উঠবে।

ভাবনাটি বাস্তবে রূপ নিতে বেশি সময় লাগেনি। ১৯৫৪ সালে তিনি দায়িত্ব দেন যমজ দুই গবেষক ও সাংবাদিক নরিস ম্যাকহুইর্টার এবং রস ম্যাকহুইর্টারকে। তারা শুরু করেন বিশাল তথ্য সংগ্রহের কাজ। খেলাধুলা, প্রকৃতি, বিজ্ঞান, মানবদেহ, প্রাণিজগৎ, যে ক্ষেত্রেই নজর দেওয়া হয়েছে, সেখান থেকেই খুঁজে বের করা হয়েছে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রেকর্ডগুলো।

দুই ভাই সাংবাদিক নরিস ম্যাকহুইর্টার এবং রস ম্যাকহুইর্টার
দুই ভাই সাংবাদিক নরিস ম্যাকহুইর্টার এবং রস ম্যাকহুইর্টার

এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা সেই গবেষণার ফল প্রকাশিত হয় ২৭ আগস্ট ১৯৫৫ সালে। বাজারে আসে ‘দ্য গিনেস বুক অব রেকর্ডস’। শুরুর দিকে বইটির উদ্দেশ্য ছিল মূলত গিনেস ব্রুয়ারির প্রচারণা। বিভিন্ন পাব ও রেস্তোরাঁয় বিনা মূল্যে বিতরণ করা হতো এটি। কিন্তু প্রকাশের পর অপ্রত্যাশিত এক ঘটনা ঘটে। পাঠক বইটিকে শুধু তথ্যের উৎস হিসেবে নয়, বিস্ময়ের ভাণ্ডার হিসেবেও গ্রহণ করেন। কে সবচেয়ে লম্বা, কোন প্রাণী সবচেয়ে দ্রুত, কোথায় সবচেয়ে বড় স্থাপনা, এমন অসংখ্য তথ্য মানুষকে আকৃষ্ট করতে শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যেই বইটি জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে যায়।

নোয়াখালীর তরুণ কনক কর্মকার গিনেস ওয়ার্ল্ড বইয়ে নাম উঠিয়ে একে একে গড়েছেন ২৯টি বিশ্বরেকর্ড। ছবি: ফেসবুক
নোয়াখালীর তরুণ কনক কর্মকার গিনেস ওয়ার্ল্ড বইয়ে নাম উঠিয়ে একে একে গড়েছেন ২৯টি বিশ্বরেকর্ড। ছবি: ফেসবুক

এরপর গিনেসের গল্প আর থেমে থাকেনি। ধীরে ধীরে মানুষ শুধু রেকর্ড সম্পর্কে জানতে চায়নি, নিজেরাও সেই তালিকায় জায়গা করে নিতে চেয়েছে। ফলে একটি তথ্যবই পরিণত হয় বৈশ্বিক স্বীকৃতির মঞ্চে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ আবেদন করতে শুরু করেন নতুন নতুন রেকর্ড নিয়ে। সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয় কঠোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া, বিশেষজ্ঞ দল এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড।

আজ গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস শুধু একটি বই নয়, এটি একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান। প্রতি বছর হাজারো নতুন রেকর্ড যুক্ত হচ্ছে এর তালিকায়। কেউ নিজের সীমা অতিক্রম করতে, কেউ দেশকে পরিচিত করতে, আবার কেউ শুধুই অসম্ভবকে সম্ভব করার আনন্দে নাম লেখাচ্ছেন এই তালিকায়।