শিরোনাম

সংসদের মাইক কাণ্ডে ফেঁসেই গেলেন ৮ প্রকৌশলী

সংসদের মাইক কাণ্ডে ফেঁসেই গেলেন ৮ প্রকৌশলী
গ্রাফিক্স: সিটিজেন জার্নাল

জাতীয় সংসদ ভবনের আলোচিত মাইক কাণ্ডের পর অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে এবার দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) স্বশরীরে হাজির হতে হয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ৮ প্রকৌশলীকে। অধিবেশন কক্ষে স্থাপিত অত্যাধুনিক সাউন্ড সিস্টেম ক্রয়, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারকাজে ব্যাপক অনিয়ম, বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে পাচারের অভিযোগে অনুসন্ধান চলাকালে নোটিশের পর হাজির হন তারা।

জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই সাউন্ড সিস্টেমে বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। শব্দ বিভ্রাটের কারণে স্পিকার ক্ষোভ প্রকাশ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তদন্ত কমিটিও সংশ্লিষ্টদের শনাক্তে কাজ শুরু করে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮, ১৯ ও ২০ মে বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকৌশলীদের তলব করা হলেও তারা নির্ধারিত সময়ে হাজির হননি। পরে গত ৩ জুন দুদকে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য দেন তারা। এ সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট, বিদেশ সফরের তথ্য, স্ত্রী-সন্তানের পরিচয় এবং সম্পদসংক্রান্ত নথিপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে।

তলবকৃতদের মধ্যে রয়েছেন গণপূর্তের ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল (ই/এম) জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) মাহবুবুল হক চৌধুরী, নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম-৭) আনোয়ার হোসেন, চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মহিবুল ইসলাম, নির্বাহী প্রকৌশলী শমীরণ মিস্ত্রী, ই/এম কারখানা উপবিভাগ-২ এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এস এম ফরহাদুজ্জামান আজাদ, ই/এম বিভাগ-৩ এর সহকারী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং অবসরপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী শেখ রিয়াজ হোসেন।

দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সংসদ ভবন ও স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদে একের পর এক কাজ পেয়েছে কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড (সিটিএল)। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদুর রহিম জোয়ারদারের বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক অসাধু প্রকৌশলীর সহায়তায় প্রতিযোগিতামূলক দর প্রক্রিয়া ছাড়াই বড় বড় প্রকল্পের কাজ বাগিয়ে নেয় সিটিএল নামের প্রতিষ্ঠানটি। শুধু সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম নয়, স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন মেডিকেল সরঞ্জাম ক্রয়েও অতিমূল্যায়নের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষের সিমালটেনিয়াস ইন্টারপ্রিটেশন সিস্টেম (এসআইএস) ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে সেটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলে সিটিএল প্রায় ৯ কোটি ৪ লাখ টাকার প্রাক্কলন জমা দেয়।

দুদকের দাবি, যে ‘শিওর’ ব্র্যান্ডের সিস্টেম মেরামতের কথা বলা হয়েছে, সেই প্রযুক্তির সরঞ্জাম বর্তমানে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানই আর তৈরি করে না। এরপরও অচল ও পুরোনো প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি সংস্কারের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা হয়েছে। এমনকি প্রকৌশলীদের যাতায়াত, আবাসন ও সম্মানী বাবদ অতিরিক্ত ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকার বিলও দাবি করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশ সচিবালয়, উচ্চ আদালত, ঢাকা জজ কোর্ট, অফিসার্স ক্লাব, বঙ্গভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ফার্ণিচার ক্রয় ও অন্যান্য কেনাকাটায় একচেটিয়ে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় ছিলেন প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক ও তার অনুসারীরা।

নথিপত্র তলব

দুদকের সহকারী পরিচালক প্রবীর কুমার দাসের নেতৃত্বে একটি বিশেষ অনুসন্ধান টিম ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদ ভবনের বিগত কয়েক বছরের টেন্ডার, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার এবং ক্রয়সংক্রান্ত নথিপত্র তলব করেছে। এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে একাধিক চিঠিও পাঠানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম, বৈদ্যুতিক অবকাঠামো ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুল হক চৌধুরী, নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফুর রহমান এবং উপসহকারী প্রকৌশলী সামসুল ইসলাম।

এই ঘটনার পর মাইক বিভ্রাটের ঘটনার পর গণপূর্তের ই/এম বিভাগ-৭ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনকে তাৎক্ষণিকভাবে বদলি করা হয়। তার স্থলাভিষিক্ত হন ই/এম বিভাগ-১২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী রিসালাত বারী।

এদিকে, সংস্কারকাজের কার্যাদেশ পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আমানত এন্টারপ্রাইজের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ৪ কোটি টাকার সংস্কারকাজের দায়িত্ব পেলেও প্রতিষ্ঠানটি নিজে কাজ না করে দায়িত্ব হস্তান্তর করে সিটিএলের কাছে। একইভাবে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ ও হুইপদের বাসভবনের কয়েক কোটি টাকার কাজ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাতে নির্বাহী প্রকৌশলী অনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিজেডএন টোয়েন্টিফোর বলেন ‘আমি এই বিষয়ে জানি না। ঠিকাদার ঠিক মতো কাজ করেনি।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

/এসএ/