শিরোনাম

সাহসী বাজেট, জোর দিতে হবে বাস্তবায়নে: বিল্ড-এর প্রতিক্রিয়া

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
সাহসী বাজেট, জোর দিতে হবে বাস্তবায়নে: বিল্ড-এর প্রতিক্রিয়া
প্রতীকী ছবি

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি বেশ সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী, যা প্রথাগত অর্থনৈতিক চিন্তাধারা থেকে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বাজেটটি ব্যবসা-বান্ধব, যেখানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস, কর কমানো এবং সরকারি সেবাসমূহের ব্যাপক অটোমেশনের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার সুস্পষ্ট প্রচেষ্টা রয়েছে।

ব্যবসা সহজীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই বাজেটে ইতিবাচক মানসিকতা প্রতিফলিত হয়েছে। কর ছাড়ের পরিধি বাড়ানো এবং বিভিন্ন খাতে করের হার হ্রাসের মাধ্যমে সরকার অর্থনীতিকে গতিশীল করার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা বিনিয়োগ-বান্ধব কর নীতিরই প্রতিফলন। সামগ্রিকভাবে, সরকারের এই উদারীকরণ এজেন্ডাকে আমরা স্বাগত জানাই।

বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ (যা ২০২৪-২৫ সালে ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ) এবং মূল্যস্ফীতির হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ-এ নামিয়ে আনার (বর্তমান ৯ দশমিক ২ শতাংশ থেকে) পরিকল্পনা করা হয়েছে। ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভূ-রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষিতে এই লক্ষ্যমাত্রাগুলো বেশ চ্যালেঞ্জিং। ৯ দশমিক ৩৮ লক্ষ কোটি টাকার মোট বাজেটে, যা জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং আর্থিক শৃঙ্খলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

তবে, এই বাজেটের সাফল্য পুরোপুরি নির্ভর করছে এর সময়োপযোগী ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। বাজেটটিতে অনেক ব্যবসা-বান্ধব বৈশিষ্ট্য থাকলেও, উচ্চ ঘাটতি বাজেট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বল অবস্থা, রাজস্ব সংগ্রহের ধীরগতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মতো বড় চ্যালেঞ্জগুলো এখনো বিদ্যমান। এই আর্থিক ও ব্যাংকিং দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

বর্তমান অবস্থা বিবেচনায়, রাজস্ব সংগ্রহের ৬ দশমিক ৯৫ লক্ষ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। শুধুমাত্র টিআইএন ধারীর সংখ্যা বাড়িয়ে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। উৎসে কর (টিডিএস) সংগ্রহে স্বচ্ছতা এবং অর্থ বিল ২০২৬-২৭ এ ঘোষিত রিফান্ড ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর না হলে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে। এছাড়া, খুচরা পর্যায়ে ০ দশমিক ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর আরোপের বিষয়টি রিগ্রেসিভ, যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর বোঝা বাড়াবে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচিতে ১ দশমিক ৪৫ লক্ষ কোটি টাকার বরাদ্দ গত বছরের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি। তবে এর মধ্যে পেনশন খাতের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ ০ দশমিক ৩৯ লক্ষ কোটি টাকা, যা মোট সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির ২৭ শতাংশ। পেনশনভোগীদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় রাখা কতটা যৌক্তিক, তা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

মোট উন্নয়ন ব্যয় ৩ দশমিক ১৬ লক্ষ কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ৩ লক্ষ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। মোট ব্যয়ের ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে, যা প্রবৃদ্ধি সহায়ক বিনিয়োগের ইঙ্গিত দেয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রণালয়গুলোর বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, অথচ বাজেটে তা উত্তরণে কোনো কার্যকর নির্দেশনা নেই।

বাজেট ঘাটতি ২ দশমিক ৪৩ লক্ষ কোটি টাকা (জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ)। এই ঘাটতি পূরণে সরকার ১ দশমিক ২৭ লক্ষ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং ১ দশমিক ১৬ লক্ষ কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে।

উল্লেখযোগ্য, ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১ দশমিক ১২ লক্ষ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের সংশোধিত হিসাবের চেয়ে ৬ হাজার কোটি টাকা কম। এটি ব্যাংক খাতের চাপ কমানোর ইঙ্গিত প্রদান করলেও, ব্যাংক ঋণের উপর অতিনির্ভরশীলতা বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ সংকোচন অব্যাহত থাকবে।

রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বর্তমান অর্থবছরের চেয়ে ১৭ শতাংশ বেশি। এনবিআর-এর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা না বাড়লে এই লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব। ই-ফাইলিং, ভ্যাট অটোমেশন, কাস্টমস আধুনিকায়ন এবং ‘বাংলাদেশ সিংগেল উইন্ডো’-এর মতো উদ্যোগসমূহ এখনো প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারেনি। বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকটের কারণে বৈদেশিক ঋণের অনিশ্চয়তা থাকায় সরকারকে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হতে পারে।

এছাড়া, কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) জন্য ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।

রপ্তানি প্রণোদনার ওপর উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ এবং ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং সেবার ওপর উইথ হোল্ডিং ট্যাক্স ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ-এ নামিয়ে আনা হয়েছে। ক্যাপটিভ পাওয়ার থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ওপর কর ৪ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশ-এ হ্রাস করা হয়েছে, যা শিল্পের উৎপাদন খরচ কমাবে। তবে এলডিসি-উত্তর সময়ে রপ্তানি প্রণোদনা পর্যায়ক্রমে তুলে নিতে হবে, তাই ডব্লিউটিও-সম্মত রপ্তানি সুবিধা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

সব ধরনের আমদানিকৃত সেবাকে (প্রথম তফশিল ব্যতীত) ১৫ শতাংশ ভ্যাট কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে। এটি ডিজিটাল অর্থনীতি থেকে রাজস্ব বাড়াবে, তবে এর ফলে সৃষ্ট ‘ক্যাসকেডিং ইফেক্ট’ বা করের ওপর করের বোঝা ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মূসক আইনের ৫৪ ধারার সংশোধনী এনবিআরকে করযোগ্য মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা দিয়েছে, এটি রাজস্ব ফাঁকি রোধে সহায়ক হলেও, করদাতাদের হয়রানি এড়াতে সুস্পষ্ট ভ্যালুয়েশন গাইডলাইন প্রয়োজন।

মূসক আইনের ৬৩ ধারার সংশোধনী অনুযায়ী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ৪ শতাংশ টার্নওভার করের পরিবর্তে সর্বোচ্চ ২ লক্ষ টাকা নির্দিষ্ট কর দেওয়ার বিধান ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য ইতিবাচক, তবে কোন কোন অর্থনৈতিক কার্যক্রম এর অন্তর্ভুক্ত হবে তা আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এছাড়া, ভ্যাট রিটার্ন জমার সময়সীমা ৪৫ দিন থেকে বাড়িয়ে ১০৫ দিন করা হয়েছে, যা ব্যবসায়ীদের কমপ্লায়েন্স চাপ কমাবে।

ভ্যাট আপিলের জন্য বাধ্যতামূলক জমা ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার। তবে অংশীজনদের মতে, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) ক্ষেত্রেও একই সুযোগ প্রয়োজন, যেখানে এখনো ৫০ শতাংশ জমার বিধান রয়েছে।

ডিজিটাল অর্থনীতিতে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের ভ্যাট অব্যাহতি একটি বড় ইতিবাচক দিক, তবে এর সুফল পেতে মেধাস্বত্ব (আইপি) অধিকারের সঠিক প্রয়োগ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া নতুন ‘ফ্রি ট্রেড জোন’ কাঠামো বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইনের সাথে যুক্ত করবে।

ছোট রপ্তানিকারকদের জন্য ১০০ শতাংশ ব্যাংক গ্যারান্টিতে কাঁচামাল আমদানির সুবিধা আরও দুটি খাতে বাড়ানো হয়েছে। রপ্তানি বহুমুখীকরণের স্বার্থে আমাদের প্রস্তাব, একটি ছোট ‘নেতিবাচক তালিকা’ রেখে এই সুবিধা সব রপ্তানিমুখী খাতের জন্য উন্মুক্ত করা হোক। এছাড়া, অ্যাগ্রো, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্মাসিউটিক্যালসসহ যেসব খাতের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো সবসময় ১০০ শতাংশ রপ্তানিমুখী নয়। ব্যাংক গ্যারান্টি সংক্রান্ত বিষয়টি আরও স্পষ্টীকরণ প্রয়োজন।

পরিশেষে, সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য, এই বাজেটে ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানিতে আমদানিশুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে—ইলেকট্রিক বাইকের ক্ষেত্রে ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশ এবং গাড়ির ক্ষেত্রে ৯৩ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ-এ নামিয়ে আনা হয়েছে। এছাড়া, ইভি চার্জার ও চার্জিং স্টেশনের ওপর আমদানিশুল্ক ৩৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য করা হয়েছে এবং ব্যাটারির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া করমুক্ত রাখা হয়েছে। এই উদ্যোগগুলো নিঃসন্দেহে ইতিবাচক, তবে শুধুমাত্র কর অব্যাহতির সুবিধা বা রিবেট যথেষ্ট নয়। যেহেতু এই খাতটির জন্য নতুন উদ্যোক্তা ও অংশীজনদের প্রয়োজন, তাই তাদের উৎসাহিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিসহায়তা ও বিনিয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

/এমআর/