শিরোনাম

বিমান-রেল-সড়ক-সেতু উন্নয়নে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকার বরাদ্দ

সিটিজেন ডেস্ক
সিটিজেন ডেস্ক
বিমান-রেল-সড়ক-সেতু উন্নয়নে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকার বরাদ্দ
বিমান-রেল-সড়ক-সেতু উন্নয়নে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকার বরাদ্দ

দেশের যোগাযোগ অবকাঠামোকে আরও আধুনিক, দক্ষ ও বহুমুখী করে তুলতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিমান, রেল, সড়ক, সেতু ও নৌপরিবহন খাতের জন্য ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৪৮ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে এ খাতের বরাদ্দে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তব্য উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে শক্তিশালী যোগাযোগ অবকাঠামোর বিকল্প নেই। এ লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার সড়ক, রেল, নৌ ও বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

সড়ক ও সেতু খাতের উন্নয়নে সরকার মহাসড়ক আধুনিকীকরণ, গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোরগুলোকে চার লেনে উন্নীতকরণ এবং সমন্বিত যোগাযোগ কাঠামোর মাধ্যমে একটি মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমানে ৯৪টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনা কমাতে ‘সেফটি সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ ভিত্তিক বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্প পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া যানবাহনের ফিটনেস কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে অটোমেটেড ফিটনেস সার্টিফিকেট ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে এবং পেশাদার চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। ভবিষ্যতের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করতে প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার জাতীয় এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার জন্য সম্ভাব্য করিডোর চিহ্নিত করা হয়েছে। রাজধানীর যানজট নিরসনে নতুন রিং রোড ও রেডিয়াল রোড নির্মাণের পরিকল্পনাও সরকারের কর্মসূচির অংশ।

নগর পরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে ছয়টি মেট্রোরেল লাইনের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে মনোরেলভিত্তিক ফিডার নেটওয়ার্ক যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ধাপে ধাপে পুরোনো বাসের পরিবর্তে ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দ্বিতীয় যমুনা সেতু, তৃতীয় মেঘনা সেতু এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সড়ক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে ইলেকট্রনিক টোল ও স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাও চালুর প্রস্তুতি চলছে।

রেলওয়ে খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, নিরাপদ, আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। দেশের সব জেলাকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনা, সমুদ্র ও স্থলবন্দরগুলোর সঙ্গে রেল সংযোগ সম্প্রসারণ, আধুনিক লোকোমোটিভ, ক্যারেজ ও ওয়াগন সংগ্রহ এবং রেলওয়ের অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া সৈয়দপুর ও পাহাড়তলী রেলওয়ে ওয়ার্কশপ আধুনিকায়ন, স্থানীয়ভাবে কোচ ও লোকোমোটিভ সংযোজন, ডুয়াল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ এবং উন্নত সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালুর কাজ চলমান রয়েছে। ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন ও উচ্চগতির রেল যোগাযোগ চালুর পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে।

বিশেষভাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে ঢাকা-কুমিল্লা অংশে একটি নতুন কর্ডলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে এ রুটের দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার কমে আসবে এবং যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় উভয়ই সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ে করিডোর গড়ে তোলা এবং চট্টগ্রামকে একটি আঞ্চলিক লজিস্টিক হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নৌপরিবহন খাতেও ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। ব্যয়-সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে অভ্যন্তরীণ নৌপথের উন্নয়ন, ড্রেজিং কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং কন্টেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ চলছে। নদীবন্দর ও লঞ্চঘাট আধুনিকায়নের পাশাপাশি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর বাস্তবায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন, জেটি ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কার্গো হ্যান্ডলিং কার্যক্রম শক্তিশালী করা হচ্ছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বে-টার্মিনাল, পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল এবং লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিয়মিত ড্রেজিং ও খনন কার্যক্রমের মাধ্যমে নৌযান চলাচল নির্বিঘ্ন রাখার উদ্যোগও অব্যাহত রয়েছে।

বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে সরকার বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ এভিয়েশন হাবে পরিণত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে একটি আঞ্চলিক বিমান পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জাতীয় এয়ার কানেকটিভিটি গ্রিড গড়ে তোলা, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ যাত্রী ও লজিস্টিক হাবে উন্নীত করা এবং কক্সবাজার, যশোর, রাজশাহী ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক গেটওয়ে হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ১৪টি আধুনিক উড়োজাহাজ কেনার লক্ষ্যে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। বিমানবন্দরের প্রায় ৯৪ হাজার বর্গমিটার এলাকায় উচ্চগতির ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

পর্যটন শিল্পকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার জিডিপিতে এ খাতের অবদান ৬ থেকে ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ জন্য বিনিয়োগবান্ধব রোডম্যাপ প্রণয়ন, পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ বিমানের আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ, যাত্রীসেবা উন্নয়ন এবং কার্গো ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি বাড়ানো, সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে আগামী অর্থবছরে যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

/এমআর/