ভেরিয়েশনের নামে ১৫০০ কোটি টাকা লোপাটের আয়োজন

ভেরিয়েশনের নামে ১৫০০ কোটি টাকা লোপাটের আয়োজন
রুবেল আবিদ

ঢাকা ওয়াসার গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার নির্মাণ কাজ ম্যারাথন প্রকল্পে রূপ নিয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে যে শুধু সময় বাড়ানো হচ্ছে তা নয়, ভেরিয়েশনের নামে চলছে অর্থ লোপাটের মহোৎসব। পিপিআর আইনের ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে ঠিকাদার-প্রকৌশলী মিলে আঁকছে ভাগ-বাটোয়ারার ছক। প্রকল্পের কাজ ৯৭ শতাংশ শেষ হয়ে গেলেও নানা অজুহাত দেখিয়ে ১৫০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যেটা অনুমোদিত মূল চুক্তি মূল্যের ৪৯.৯৭ শতাংশ। এ ছাড়া এই প্রকল্পের ২৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পাইপ বসানোর জন্য সুয়েজ নামের যে ফরাসি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়, তারা কম দামে অননুমোদিত চীনের কোম্পানি শ্যানডং গুয়োমিং থেকে কেনে। এর জন্য চীনের আদালতে সুয়েজের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। কিন্তু ওয়াসা বিষয়টি নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
প্রকল্পের অনুমোদিত মূল চুক্তি মূল্য ৩০০৬ কোটি ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৬৫২ টাকা। ১৫০১ কোটি ৯৬ লাখ ৯৭ হাজার ২২০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ায় এর নতুন চুক্তি মূল্য দাঁড়িয়েছে ৪৫০৮ কোটি ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৭২ টাকা। সংশোধিত পিপিআর আইন ২০২৫ অনুযায়ী, প্রকল্পের ব্যয় অনুমোদিত মূল চুক্তি মূল্যের চেয়ে অনধিক ১৫ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ বাড়ানো যাবে। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম মুরাদ ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাবের সমর্থনে পিপিআর আইন ২০০৮-এর একটি ধারা উল্লেখ করেছেন। যেখানে বলা আছে, ‘ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে, কোন মূল চুক্তির ব্যাপ্তি মোতাবেক কাজ জরুরী ভিত্তিতে সমাপ্ত করা আবশ্যক হইলে, যে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ মূল চুক্তি সম্পাদনের অনুমোদন প্রদান করিয়াছিল, উহার পরবর্তী উচ্চতর পর্যায়ের কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে তফসিল-২ এ বর্ণিত মূল্যসীমার ঊর্ধ্বের ভেরিয়েশন অর্ডার বা অতিরিক্ত কার্যাদেশ বা পুনরাবৃত্ত ক্রয়াদেশ অথবা অতিরিক্ত পণ্য সরবরাহের আদেশ প্রদান করা যাইবে।’

ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে প্রকল্প পরিচালক, ঠিকাদার ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বেশ কিছু প্রযুক্তিগত, প্রশাসনিক, জমি অধিগ্রহণে দেরি, সাইট হস্তান্তর বিষয়ক জটিলতা, প্রকল্প অঞ্চলে ‘অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে’ কবরস্থান ও পুকুরের অবস্থান, ডলারের মূল্যবৃদ্ধিসহ বেশ কিছু কারণ তুলে ধরা হয়েছে।
ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবের নথি অনুযায়ী দর সমন্বয় বাবদ ধরা হয়েছে ৬৬৭ কোটি ১৩ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। কর ও শুল্ক খাতে ব্যয়বৃদ্ধি দেখানো হয়েছে ৩৪০ কোটি ৩১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৮ টাকা। এ ছাড়া নকশা পরিবর্তনে ৬০ কোটি ৬১ লাখ টাকা। পুকুর অতিক্রমে ৭১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, সাশ্রয়ী ডিজাইন ভেরিয়েশনে ৮৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা, জমি অধিগ্রহণ জটিলতা মেটাতে ৫৪ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালকের ব্যয়বৃদ্ধির প্রস্তাবে বিশেষ করে উল্লেখ করা হয়েছে ঢাকা-সিলেট হাইওয়ের ক্রসিংয়ে বড় কালভার্ট নির্মাণের কথা। সেই দুটি কালভার্ট নির্মাণে বাড়তি ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। বর্তমানে ঢাকা-সিলেট হাইওয়েতে সংস্কার কাজের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। সড়ক ও জনপথ কর্তৃপক্ষ এই সুযোগে কালভার্ট দুটি নির্মাণ এবং ঢাকা-সিলেট হাইওয়ে ক্রসিংয়ে ৯৫০ মিটার পাইপ বসানোর কাজ শেষ করার জন্য ঢাকা ওয়াসাকে একাধিক চিঠি দিয়েছে। কিন্তু চিঠি পেয়েও ওয়াসা এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। হাইওয়ের সংস্কার শেষ হয়ে যাওয়ার পর কালভার্ট নির্মাণ ও পাইপ বসানোর কাজের জন্য নতুন করে আবার খোড়াখুঁড়ি এবং ভরাটের কাজ করতে হবে ওয়াসাকে। সে ক্ষেত্রে সময় ও ব্যয় দুটিই বাড়বে।

ঢাকা–সিলেট হাইওয়েতে কালভার্ট নির্মাণ ও পাইপলাইন বসানোর বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ওয়াহিদুল মুরাদের কাছে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে সিটিজেন জার্নালকে তিনি বলেছেন, ‘আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে বিষয়টির সুরাহা হয়ে যাবে।’
অনেকে আবার প্রশ্ন তুলেছেন, যে প্রকল্পের কাজ ৯৭ শতাংশ শেষ হয়ে গেছে, সেটির ব্যয় শেষ মুহূর্তে এসে ১৫০০ কোটি টাকা বাড়াতে হবে কেন! প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ কাজের ফরাসি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সুয়েজ তাদের জিম্মি করে রেখেছে। কিন্তু সুয়েজ বলছে, ঢাকা-সিলেট হাইওয়েতে পাইপলাইনের কাজের অনুমতি ওয়াসা থেকে পাচ্ছে না তারা। এ কাজের জন্য লোকবল আর যন্ত্রপাতি অলস বসিয়ে রাখতে হচ্ছে বলে জরিমানা বাবদ প্রতিদিন প্রায় ২৫ লাখ টাকা (২৪ লাখ ৯০ হাজার) নিচ্ছে সুয়েজ।
এটা মানুষের পানির চাহিদার বিপরীতে প্রতারণা করে টাকা বাড়ানোর অপচেষ্টা। দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানো দরকার। এটি না করে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর বিষয়টি নতুন ‘বোতলে পুরনো মদ’। ঘুরেফিরে একই কুমিরের ছানা দেখানোর মতো।
স্থপতি ইকবাল হাবিব
ঢাকা ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, ১৬০০ মিলিমিটার ব্যসের মোট ২৩ কিলোমিটার পাইপ বসানোর জন্য সুয়েজ ফ্রান্সের সেন্ট গোবিন, জাপানের কুবোট এবং চীনের শিংশিং নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। পাইপ অবশ্য কেনা হয় চীনের শিংশিং-এর কাছ থেকে। তাও পুরো পাইপ শিংশিং থেকে কেনেনি তারা। অর্ধেক শিংশিং-এর কাছ থেকে কিনে বাকি অর্ধেক কম দামে শ্যানডং গুয়োমিং নামের চীনের আরেকটি প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা হয়। বিষয়টি জানতে পেরে ক্ষুব্ধ শিংশিং চীনে আদালতের দ্বারস্থ হয়। অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের নিম্নমানের পাইপ বসানোর কারণে নানা কারিগরি ত্রুটি বের হলে ঢাকা ওয়াসাও চাপে পড়ে। বিশেষ করে যেসব স্থানে পাইপ জোড়া দেওয়া হয়েছে, সেখানে তা টেকসই হয়নি। আবার পানির বেগ বাড়ার সঙ্গে পাইপের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিচ্ছে।

ঢাকা ওয়াসার সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, পিপিআর (সরকারি ক্রয় বিধিমালা) মেনে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে উত্তীর্ণ করা হয়েছে। সেখানে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পুরো প্রকল্পের পাইপ সরবরাহ ও স্থাপনের চুক্তি করা হয়েছে। ফলে অর্ধেক পাইপ নিয়ে দরপত্রের অনুমোদিত তালিকার বাইরে গিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে পাইপ নেওয়ার আইনগত সুযোগ নেই।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, সুয়েজকে বসিয়ে বসিয়ে টাকা না দিয়ে বাকি ৩ শতাংশ কাজ অল্প খরচে দেশি কোনো প্রতিষ্ঠান দিয়ে করিয়ে নেওয়া যায় কিনা। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, কাজটি সুয়েজকে দিয়েই করাতে হবে। শেষ মুহূর্তে এসে প্রকল্পের অস্বাভাবিক ব্যয় বাড়ানো এবং দেশি প্রতিষ্ঠান দিয়ে বাকি কাজটুকু না করানোর বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ‘ভেরিয়শনের একটা প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে দর কষাকষি চলছে। স্থানীয় সরকারমন্ত্রীকে নিয়ে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যাওয়া হবে। সেখানে গিয়ে তিনি ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন। দেশি প্রতিষ্ঠান দিয়ে এখন আর কাজ করানো সম্ভব নয়। ঠিকাদার নিয়োগ করা রয়েছে। এখন নতুন করে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়।’

এর মধ্যেই চুক্তি বা কোনোপ্রকার অনুমোদন ছাড়া সুয়েজকে প্রকল্প পরিচালক ওয়াহিদুল ইসলাম ৬০০ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করেছেন। এটা তিনি কোন আইনের আওতায় করেছেন– এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি ওয়াহিদুল। ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ ব্যাপারে সিটিজেন জার্নালকে বলেছেন, ‘কাউকে অনুমোদনবিহীন কোনো টাকা দেওয়ার সুযোগ নেই।’
প্রকল্প পরিচালক ওয়াহিদুল ইসলাম প্রকল্পের সময় ও ব্যয়বৃদ্ধি নিয়ে বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণ করতে ৮ বছর সময় লেগে যায়। এ ছাড়া প্রকল্পের শুরুতে প্রতি ডলারের মূল্য ছিল ৭৮ থেকে ৮০ টাকা। বর্তমানে ডলারের মূল্য বেড়ে ১২২ টাকা হয়েছে। এ কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে বাস্তবে প্রকল্পের ব্যয় বাড়েনি।’ এরপর তিনি যোগ করেন, ‘সম্পূর্ণ বিদেশি ঋণে এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ডলারে পেমেন্ট করতে গিয়ে টাকার পরিমাণ আপাতদৃষ্টিতে বেশি মনে হচ্ছে।’
গন্ধর্বপুর প্রকল্পে ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব সিটিজেন জার্নালকে বলেছেন, ‘এটা মানুষের পানির চাহিদার বিপরীতে প্রতারণা করে টাকা বাড়ানোর অপচেষ্টা। দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানো দরকার। এটি না করে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর বিষয়টি নতুন ‘বোতলে পুরনো মদ’। ঘুরেফিরে একই কুমিরের ছানা দেখানোর মতো।’

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাবটি অন্তত দুইবার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ফিরিয়ে দিয়েছেন। এরপরও কেন প্রকল্প পরিচালক ব্যয়বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়ে যাচ্ছেন, এর কোনো সদুত্তর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে সিটিজেন জার্নালের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তার জনসংযোগ কর্মকর্তা হৃদয় মাহমুদ চয়ন জানান, মন্ত্রী এ বিষয়ে এখন সংবাদমাধ্যমে কথা বলবেন না। তিনি ৯ জুন গন্ধর্বপুর প্রকল্প পরিদর্শনে যাবেন, সেখানে হয়তো কথা বলতে পারেন।
প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বাড়ানোর এ প্রস্তাবকে অনেকেই বলছেন নানা বাহানায় অর্থ লোপাটের আয়োজন। ইকবাল হাবিব এমন কাজের জবাবদিহিতা দাবি করে বলেছেন, ‘এই প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর যথাযথ কারণ জনসমক্ষে প্রকাশ করা দরকার। প্রকল্পের ব্যয় সমীক্ষা করেই বাড়ানো হয়েছিল। কেন আবার ব্যয় বাড়ছে, তা বোধগম্য নয়। এটি জবাবদিহিতাহীন কার্যক্রম।’ এজন্য পরিকল্পনা কমিশন, আইএমইডি সমীক্ষা করেই পরবর্তী অনুমোদন দেবে বলে তিনি মনে করছেন।
ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী গন্ধর্বপুর পানি প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ৪৮ মাস। ১৩ মে ২০১৯ থেকে ১২ মে ২০২৩ পর্যন্ত। সেটি এখন আরও ৪১ মাস ১৮ দিন বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ মেয়াদের সময় বৃদ্ধি ৮৪ দশমিক ১০ শতাংশ। এই প্রস্তাব অনুযায়ী কাজ শেষ হওয়ার কথা এ বছরের অক্টোবরে। এই প্রকল্পের অর্থায়নে বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (ইআইবি) এবং ফ্রেঞ্চ ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (এএফডি) যুক্ত রয়েছে। অতিরিক্ত ব্যয়ের সংকুলান করতে ইআইবির সঙ্গে ইতোমধ্যে নতুন করে ৭০ মিলিয়ন ইউরো ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বর্ধিত প্রস্তাবের বিষয়ে এডিবি ইতোমধ্যে তাদের অনাপত্তি দিয়েছে।

সময়মতো প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়া এবং এখন সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিষয়ে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গন্ধর্বপুর প্রকল্পের কাজ ঠিকাদার তিন মাস আগে বন্ধ করে দিয়েছে। প্রকল্প নিয়ে অনেক ঝামেলা রয়েছে। ঢাকা-সিলেট রুটের পাইপলাইন কাজসহ বিভিন্ন কাজ এখনো বাকি রয়েছে। আমরা অনেক দূর কাজ এগিয়েছি। কীভাবে সেটি সম্পন্ন করা যায়, তা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। রীতিমতো এই কাজ নিয়ে যুদ্ধ করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ঠিকাদার থেকে শুরু করে স্বার্থসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করা হচ্ছে।’
ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর পানি দূষিত। এর জন্য প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের মেঘনা নদীর অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার পানি তুলে পরিশোধনের জন্যই হাতে নেওয়া হয় গন্ধর্বপুর পানি প্রকল্প। এর আওতায় বিষনন্দী থেকে গন্ধর্বপুর পর্যন্ত ২৩ কিলোমিটার কাঁচা পানির পাইপলাইন এবং ঢাকা শহরে ১৪ কিলোমিটার শোধিত পানির পাইপলাইন বসাচ্ছে ওয়াসা। ওয়াসা বলছে, প্রকল্পের কাজ শেষ হলে মাটির উপরিভাগ থেকে দৈনিক ৫০ কোটি লিটার পরিশোধিত পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

ঢাকা ওয়াসার গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার নির্মাণ কাজ ম্যারাথন প্রকল্পে রূপ নিয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে যে শুধু সময় বাড়ানো হচ্ছে তা নয়, ভেরিয়েশনের নামে চলছে অর্থ লোপাটের মহোৎসব। পিপিআর আইনের ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে ঠিকাদার-প্রকৌশলী মিলে আঁকছে ভাগ-বাটোয়ারার ছক। প্রকল্পের কাজ ৯৭ শতাংশ শেষ হয়ে গেলেও নানা অজুহাত দেখিয়ে ১৫০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যেটা অনুমোদিত মূল চুক্তি মূল্যের ৪৯.৯৭ শতাংশ। এ ছাড়া এই প্রকল্পের ২৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পাইপ বসানোর জন্য সুয়েজ নামের যে ফরাসি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়, তারা কম দামে অননুমোদিত চীনের কোম্পানি শ্যানডং গুয়োমিং থেকে কেনে। এর জন্য চীনের আদালতে সুয়েজের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। কিন্তু ওয়াসা বিষয়টি নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
প্রকল্পের অনুমোদিত মূল চুক্তি মূল্য ৩০০৬ কোটি ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৬৫২ টাকা। ১৫০১ কোটি ৯৬ লাখ ৯৭ হাজার ২২০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ায় এর নতুন চুক্তি মূল্য দাঁড়িয়েছে ৪৫০৮ কোটি ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৭২ টাকা। সংশোধিত পিপিআর আইন ২০২৫ অনুযায়ী, প্রকল্পের ব্যয় অনুমোদিত মূল চুক্তি মূল্যের চেয়ে অনধিক ১৫ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ বাড়ানো যাবে। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম মুরাদ ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাবের সমর্থনে পিপিআর আইন ২০০৮-এর একটি ধারা উল্লেখ করেছেন। যেখানে বলা আছে, ‘ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে, কোন মূল চুক্তির ব্যাপ্তি মোতাবেক কাজ জরুরী ভিত্তিতে সমাপ্ত করা আবশ্যক হইলে, যে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ মূল চুক্তি সম্পাদনের অনুমোদন প্রদান করিয়াছিল, উহার পরবর্তী উচ্চতর পর্যায়ের কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে তফসিল-২ এ বর্ণিত মূল্যসীমার ঊর্ধ্বের ভেরিয়েশন অর্ডার বা অতিরিক্ত কার্যাদেশ বা পুনরাবৃত্ত ক্রয়াদেশ অথবা অতিরিক্ত পণ্য সরবরাহের আদেশ প্রদান করা যাইবে।’

ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে প্রকল্প পরিচালক, ঠিকাদার ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বেশ কিছু প্রযুক্তিগত, প্রশাসনিক, জমি অধিগ্রহণে দেরি, সাইট হস্তান্তর বিষয়ক জটিলতা, প্রকল্প অঞ্চলে ‘অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে’ কবরস্থান ও পুকুরের অবস্থান, ডলারের মূল্যবৃদ্ধিসহ বেশ কিছু কারণ তুলে ধরা হয়েছে।
ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবের নথি অনুযায়ী দর সমন্বয় বাবদ ধরা হয়েছে ৬৬৭ কোটি ১৩ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। কর ও শুল্ক খাতে ব্যয়বৃদ্ধি দেখানো হয়েছে ৩৪০ কোটি ৩১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৮ টাকা। এ ছাড়া নকশা পরিবর্তনে ৬০ কোটি ৬১ লাখ টাকা। পুকুর অতিক্রমে ৭১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, সাশ্রয়ী ডিজাইন ভেরিয়েশনে ৮৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা, জমি অধিগ্রহণ জটিলতা মেটাতে ৫৪ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালকের ব্যয়বৃদ্ধির প্রস্তাবে বিশেষ করে উল্লেখ করা হয়েছে ঢাকা-সিলেট হাইওয়ের ক্রসিংয়ে বড় কালভার্ট নির্মাণের কথা। সেই দুটি কালভার্ট নির্মাণে বাড়তি ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। বর্তমানে ঢাকা-সিলেট হাইওয়েতে সংস্কার কাজের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। সড়ক ও জনপথ কর্তৃপক্ষ এই সুযোগে কালভার্ট দুটি নির্মাণ এবং ঢাকা-সিলেট হাইওয়ে ক্রসিংয়ে ৯৫০ মিটার পাইপ বসানোর কাজ শেষ করার জন্য ঢাকা ওয়াসাকে একাধিক চিঠি দিয়েছে। কিন্তু চিঠি পেয়েও ওয়াসা এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। হাইওয়ের সংস্কার শেষ হয়ে যাওয়ার পর কালভার্ট নির্মাণ ও পাইপ বসানোর কাজের জন্য নতুন করে আবার খোড়াখুঁড়ি এবং ভরাটের কাজ করতে হবে ওয়াসাকে। সে ক্ষেত্রে সময় ও ব্যয় দুটিই বাড়বে।

ঢাকা–সিলেট হাইওয়েতে কালভার্ট নির্মাণ ও পাইপলাইন বসানোর বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ওয়াহিদুল মুরাদের কাছে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে সিটিজেন জার্নালকে তিনি বলেছেন, ‘আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে বিষয়টির সুরাহা হয়ে যাবে।’
অনেকে আবার প্রশ্ন তুলেছেন, যে প্রকল্পের কাজ ৯৭ শতাংশ শেষ হয়ে গেছে, সেটির ব্যয় শেষ মুহূর্তে এসে ১৫০০ কোটি টাকা বাড়াতে হবে কেন! প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ কাজের ফরাসি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সুয়েজ তাদের জিম্মি করে রেখেছে। কিন্তু সুয়েজ বলছে, ঢাকা-সিলেট হাইওয়েতে পাইপলাইনের কাজের অনুমতি ওয়াসা থেকে পাচ্ছে না তারা। এ কাজের জন্য লোকবল আর যন্ত্রপাতি অলস বসিয়ে রাখতে হচ্ছে বলে জরিমানা বাবদ প্রতিদিন প্রায় ২৫ লাখ টাকা (২৪ লাখ ৯০ হাজার) নিচ্ছে সুয়েজ।
এটা মানুষের পানির চাহিদার বিপরীতে প্রতারণা করে টাকা বাড়ানোর অপচেষ্টা। দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানো দরকার। এটি না করে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর বিষয়টি নতুন ‘বোতলে পুরনো মদ’। ঘুরেফিরে একই কুমিরের ছানা দেখানোর মতো।
স্থপতি ইকবাল হাবিব
ঢাকা ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, ১৬০০ মিলিমিটার ব্যসের মোট ২৩ কিলোমিটার পাইপ বসানোর জন্য সুয়েজ ফ্রান্সের সেন্ট গোবিন, জাপানের কুবোট এবং চীনের শিংশিং নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। পাইপ অবশ্য কেনা হয় চীনের শিংশিং-এর কাছ থেকে। তাও পুরো পাইপ শিংশিং থেকে কেনেনি তারা। অর্ধেক শিংশিং-এর কাছ থেকে কিনে বাকি অর্ধেক কম দামে শ্যানডং গুয়োমিং নামের চীনের আরেকটি প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা হয়। বিষয়টি জানতে পেরে ক্ষুব্ধ শিংশিং চীনে আদালতের দ্বারস্থ হয়। অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের নিম্নমানের পাইপ বসানোর কারণে নানা কারিগরি ত্রুটি বের হলে ঢাকা ওয়াসাও চাপে পড়ে। বিশেষ করে যেসব স্থানে পাইপ জোড়া দেওয়া হয়েছে, সেখানে তা টেকসই হয়নি। আবার পানির বেগ বাড়ার সঙ্গে পাইপের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিচ্ছে।

ঢাকা ওয়াসার সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, পিপিআর (সরকারি ক্রয় বিধিমালা) মেনে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে উত্তীর্ণ করা হয়েছে। সেখানে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পুরো প্রকল্পের পাইপ সরবরাহ ও স্থাপনের চুক্তি করা হয়েছে। ফলে অর্ধেক পাইপ নিয়ে দরপত্রের অনুমোদিত তালিকার বাইরে গিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে পাইপ নেওয়ার আইনগত সুযোগ নেই।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, সুয়েজকে বসিয়ে বসিয়ে টাকা না দিয়ে বাকি ৩ শতাংশ কাজ অল্প খরচে দেশি কোনো প্রতিষ্ঠান দিয়ে করিয়ে নেওয়া যায় কিনা। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, কাজটি সুয়েজকে দিয়েই করাতে হবে। শেষ মুহূর্তে এসে প্রকল্পের অস্বাভাবিক ব্যয় বাড়ানো এবং দেশি প্রতিষ্ঠান দিয়ে বাকি কাজটুকু না করানোর বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ‘ভেরিয়শনের একটা প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে দর কষাকষি চলছে। স্থানীয় সরকারমন্ত্রীকে নিয়ে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যাওয়া হবে। সেখানে গিয়ে তিনি ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন। দেশি প্রতিষ্ঠান দিয়ে এখন আর কাজ করানো সম্ভব নয়। ঠিকাদার নিয়োগ করা রয়েছে। এখন নতুন করে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়।’

এর মধ্যেই চুক্তি বা কোনোপ্রকার অনুমোদন ছাড়া সুয়েজকে প্রকল্প পরিচালক ওয়াহিদুল ইসলাম ৬০০ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করেছেন। এটা তিনি কোন আইনের আওতায় করেছেন– এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি ওয়াহিদুল। ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ ব্যাপারে সিটিজেন জার্নালকে বলেছেন, ‘কাউকে অনুমোদনবিহীন কোনো টাকা দেওয়ার সুযোগ নেই।’
প্রকল্প পরিচালক ওয়াহিদুল ইসলাম প্রকল্পের সময় ও ব্যয়বৃদ্ধি নিয়ে বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণ করতে ৮ বছর সময় লেগে যায়। এ ছাড়া প্রকল্পের শুরুতে প্রতি ডলারের মূল্য ছিল ৭৮ থেকে ৮০ টাকা। বর্তমানে ডলারের মূল্য বেড়ে ১২২ টাকা হয়েছে। এ কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে বাস্তবে প্রকল্পের ব্যয় বাড়েনি।’ এরপর তিনি যোগ করেন, ‘সম্পূর্ণ বিদেশি ঋণে এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ডলারে পেমেন্ট করতে গিয়ে টাকার পরিমাণ আপাতদৃষ্টিতে বেশি মনে হচ্ছে।’
গন্ধর্বপুর প্রকল্পে ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব সিটিজেন জার্নালকে বলেছেন, ‘এটা মানুষের পানির চাহিদার বিপরীতে প্রতারণা করে টাকা বাড়ানোর অপচেষ্টা। দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানো দরকার। এটি না করে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর বিষয়টি নতুন ‘বোতলে পুরনো মদ’। ঘুরেফিরে একই কুমিরের ছানা দেখানোর মতো।’

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাবটি অন্তত দুইবার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ফিরিয়ে দিয়েছেন। এরপরও কেন প্রকল্প পরিচালক ব্যয়বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়ে যাচ্ছেন, এর কোনো সদুত্তর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে সিটিজেন জার্নালের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তার জনসংযোগ কর্মকর্তা হৃদয় মাহমুদ চয়ন জানান, মন্ত্রী এ বিষয়ে এখন সংবাদমাধ্যমে কথা বলবেন না। তিনি ৯ জুন গন্ধর্বপুর প্রকল্প পরিদর্শনে যাবেন, সেখানে হয়তো কথা বলতে পারেন।
প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বাড়ানোর এ প্রস্তাবকে অনেকেই বলছেন নানা বাহানায় অর্থ লোপাটের আয়োজন। ইকবাল হাবিব এমন কাজের জবাবদিহিতা দাবি করে বলেছেন, ‘এই প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর যথাযথ কারণ জনসমক্ষে প্রকাশ করা দরকার। প্রকল্পের ব্যয় সমীক্ষা করেই বাড়ানো হয়েছিল। কেন আবার ব্যয় বাড়ছে, তা বোধগম্য নয়। এটি জবাবদিহিতাহীন কার্যক্রম।’ এজন্য পরিকল্পনা কমিশন, আইএমইডি সমীক্ষা করেই পরবর্তী অনুমোদন দেবে বলে তিনি মনে করছেন।
ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী গন্ধর্বপুর পানি প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ৪৮ মাস। ১৩ মে ২০১৯ থেকে ১২ মে ২০২৩ পর্যন্ত। সেটি এখন আরও ৪১ মাস ১৮ দিন বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ মেয়াদের সময় বৃদ্ধি ৮৪ দশমিক ১০ শতাংশ। এই প্রস্তাব অনুযায়ী কাজ শেষ হওয়ার কথা এ বছরের অক্টোবরে। এই প্রকল্পের অর্থায়নে বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (ইআইবি) এবং ফ্রেঞ্চ ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (এএফডি) যুক্ত রয়েছে। অতিরিক্ত ব্যয়ের সংকুলান করতে ইআইবির সঙ্গে ইতোমধ্যে নতুন করে ৭০ মিলিয়ন ইউরো ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বর্ধিত প্রস্তাবের বিষয়ে এডিবি ইতোমধ্যে তাদের অনাপত্তি দিয়েছে।

সময়মতো প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়া এবং এখন সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিষয়ে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গন্ধর্বপুর প্রকল্পের কাজ ঠিকাদার তিন মাস আগে বন্ধ করে দিয়েছে। প্রকল্প নিয়ে অনেক ঝামেলা রয়েছে। ঢাকা-সিলেট রুটের পাইপলাইন কাজসহ বিভিন্ন কাজ এখনো বাকি রয়েছে। আমরা অনেক দূর কাজ এগিয়েছি। কীভাবে সেটি সম্পন্ন করা যায়, তা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। রীতিমতো এই কাজ নিয়ে যুদ্ধ করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ঠিকাদার থেকে শুরু করে স্বার্থসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করা হচ্ছে।’
ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর পানি দূষিত। এর জন্য প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের মেঘনা নদীর অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার পানি তুলে পরিশোধনের জন্যই হাতে নেওয়া হয় গন্ধর্বপুর পানি প্রকল্প। এর আওতায় বিষনন্দী থেকে গন্ধর্বপুর পর্যন্ত ২৩ কিলোমিটার কাঁচা পানির পাইপলাইন এবং ঢাকা শহরে ১৪ কিলোমিটার শোধিত পানির পাইপলাইন বসাচ্ছে ওয়াসা। ওয়াসা বলছে, প্রকল্পের কাজ শেষ হলে মাটির উপরিভাগ থেকে দৈনিক ৫০ কোটি লিটার পরিশোধিত পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

ভেরিয়েশনের নামে ১৫০০ কোটি টাকা লোপাটের আয়োজন
রুবেল আবিদ

ঢাকা ওয়াসার গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার নির্মাণ কাজ ম্যারাথন প্রকল্পে রূপ নিয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে যে শুধু সময় বাড়ানো হচ্ছে তা নয়, ভেরিয়েশনের নামে চলছে অর্থ লোপাটের মহোৎসব। পিপিআর আইনের ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে ঠিকাদার-প্রকৌশলী মিলে আঁকছে ভাগ-বাটোয়ারার ছক। প্রকল্পের কাজ ৯৭ শতাংশ শেষ হয়ে গেলেও নানা অজুহাত দেখিয়ে ১৫০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যেটা অনুমোদিত মূল চুক্তি মূল্যের ৪৯.৯৭ শতাংশ। এ ছাড়া এই প্রকল্পের ২৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পাইপ বসানোর জন্য সুয়েজ নামের যে ফরাসি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়, তারা কম দামে অননুমোদিত চীনের কোম্পানি শ্যানডং গুয়োমিং থেকে কেনে। এর জন্য চীনের আদালতে সুয়েজের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। কিন্তু ওয়াসা বিষয়টি নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
প্রকল্পের অনুমোদিত মূল চুক্তি মূল্য ৩০০৬ কোটি ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৬৫২ টাকা। ১৫০১ কোটি ৯৬ লাখ ৯৭ হাজার ২২০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ায় এর নতুন চুক্তি মূল্য দাঁড়িয়েছে ৪৫০৮ কোটি ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৭২ টাকা। সংশোধিত পিপিআর আইন ২০২৫ অনুযায়ী, প্রকল্পের ব্যয় অনুমোদিত মূল চুক্তি মূল্যের চেয়ে অনধিক ১৫ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ বাড়ানো যাবে। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম মুরাদ ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাবের সমর্থনে পিপিআর আইন ২০০৮-এর একটি ধারা উল্লেখ করেছেন। যেখানে বলা আছে, ‘ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে, কোন মূল চুক্তির ব্যাপ্তি মোতাবেক কাজ জরুরী ভিত্তিতে সমাপ্ত করা আবশ্যক হইলে, যে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ মূল চুক্তি সম্পাদনের অনুমোদন প্রদান করিয়াছিল, উহার পরবর্তী উচ্চতর পর্যায়ের কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে তফসিল-২ এ বর্ণিত মূল্যসীমার ঊর্ধ্বের ভেরিয়েশন অর্ডার বা অতিরিক্ত কার্যাদেশ বা পুনরাবৃত্ত ক্রয়াদেশ অথবা অতিরিক্ত পণ্য সরবরাহের আদেশ প্রদান করা যাইবে।’

ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে প্রকল্প পরিচালক, ঠিকাদার ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বেশ কিছু প্রযুক্তিগত, প্রশাসনিক, জমি অধিগ্রহণে দেরি, সাইট হস্তান্তর বিষয়ক জটিলতা, প্রকল্প অঞ্চলে ‘অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে’ কবরস্থান ও পুকুরের অবস্থান, ডলারের মূল্যবৃদ্ধিসহ বেশ কিছু কারণ তুলে ধরা হয়েছে।
ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবের নথি অনুযায়ী দর সমন্বয় বাবদ ধরা হয়েছে ৬৬৭ কোটি ১৩ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। কর ও শুল্ক খাতে ব্যয়বৃদ্ধি দেখানো হয়েছে ৩৪০ কোটি ৩১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৮ টাকা। এ ছাড়া নকশা পরিবর্তনে ৬০ কোটি ৬১ লাখ টাকা। পুকুর অতিক্রমে ৭১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, সাশ্রয়ী ডিজাইন ভেরিয়েশনে ৮৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা, জমি অধিগ্রহণ জটিলতা মেটাতে ৫৪ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালকের ব্যয়বৃদ্ধির প্রস্তাবে বিশেষ করে উল্লেখ করা হয়েছে ঢাকা-সিলেট হাইওয়ের ক্রসিংয়ে বড় কালভার্ট নির্মাণের কথা। সেই দুটি কালভার্ট নির্মাণে বাড়তি ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। বর্তমানে ঢাকা-সিলেট হাইওয়েতে সংস্কার কাজের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। সড়ক ও জনপথ কর্তৃপক্ষ এই সুযোগে কালভার্ট দুটি নির্মাণ এবং ঢাকা-সিলেট হাইওয়ে ক্রসিংয়ে ৯৫০ মিটার পাইপ বসানোর কাজ শেষ করার জন্য ঢাকা ওয়াসাকে একাধিক চিঠি দিয়েছে। কিন্তু চিঠি পেয়েও ওয়াসা এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। হাইওয়ের সংস্কার শেষ হয়ে যাওয়ার পর কালভার্ট নির্মাণ ও পাইপ বসানোর কাজের জন্য নতুন করে আবার খোড়াখুঁড়ি এবং ভরাটের কাজ করতে হবে ওয়াসাকে। সে ক্ষেত্রে সময় ও ব্যয় দুটিই বাড়বে।

ঢাকা–সিলেট হাইওয়েতে কালভার্ট নির্মাণ ও পাইপলাইন বসানোর বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ওয়াহিদুল মুরাদের কাছে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে সিটিজেন জার্নালকে তিনি বলেছেন, ‘আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে বিষয়টির সুরাহা হয়ে যাবে।’
অনেকে আবার প্রশ্ন তুলেছেন, যে প্রকল্পের কাজ ৯৭ শতাংশ শেষ হয়ে গেছে, সেটির ব্যয় শেষ মুহূর্তে এসে ১৫০০ কোটি টাকা বাড়াতে হবে কেন! প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ কাজের ফরাসি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সুয়েজ তাদের জিম্মি করে রেখেছে। কিন্তু সুয়েজ বলছে, ঢাকা-সিলেট হাইওয়েতে পাইপলাইনের কাজের অনুমতি ওয়াসা থেকে পাচ্ছে না তারা। এ কাজের জন্য লোকবল আর যন্ত্রপাতি অলস বসিয়ে রাখতে হচ্ছে বলে জরিমানা বাবদ প্রতিদিন প্রায় ২৫ লাখ টাকা (২৪ লাখ ৯০ হাজার) নিচ্ছে সুয়েজ।
এটা মানুষের পানির চাহিদার বিপরীতে প্রতারণা করে টাকা বাড়ানোর অপচেষ্টা। দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানো দরকার। এটি না করে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর বিষয়টি নতুন ‘বোতলে পুরনো মদ’। ঘুরেফিরে একই কুমিরের ছানা দেখানোর মতো।
স্থপতি ইকবাল হাবিব
ঢাকা ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, ১৬০০ মিলিমিটার ব্যসের মোট ২৩ কিলোমিটার পাইপ বসানোর জন্য সুয়েজ ফ্রান্সের সেন্ট গোবিন, জাপানের কুবোট এবং চীনের শিংশিং নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। পাইপ অবশ্য কেনা হয় চীনের শিংশিং-এর কাছ থেকে। তাও পুরো পাইপ শিংশিং থেকে কেনেনি তারা। অর্ধেক শিংশিং-এর কাছ থেকে কিনে বাকি অর্ধেক কম দামে শ্যানডং গুয়োমিং নামের চীনের আরেকটি প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা হয়। বিষয়টি জানতে পেরে ক্ষুব্ধ শিংশিং চীনে আদালতের দ্বারস্থ হয়। অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের নিম্নমানের পাইপ বসানোর কারণে নানা কারিগরি ত্রুটি বের হলে ঢাকা ওয়াসাও চাপে পড়ে। বিশেষ করে যেসব স্থানে পাইপ জোড়া দেওয়া হয়েছে, সেখানে তা টেকসই হয়নি। আবার পানির বেগ বাড়ার সঙ্গে পাইপের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিচ্ছে।

ঢাকা ওয়াসার সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, পিপিআর (সরকারি ক্রয় বিধিমালা) মেনে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে উত্তীর্ণ করা হয়েছে। সেখানে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পুরো প্রকল্পের পাইপ সরবরাহ ও স্থাপনের চুক্তি করা হয়েছে। ফলে অর্ধেক পাইপ নিয়ে দরপত্রের অনুমোদিত তালিকার বাইরে গিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে পাইপ নেওয়ার আইনগত সুযোগ নেই।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, সুয়েজকে বসিয়ে বসিয়ে টাকা না দিয়ে বাকি ৩ শতাংশ কাজ অল্প খরচে দেশি কোনো প্রতিষ্ঠান দিয়ে করিয়ে নেওয়া যায় কিনা। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, কাজটি সুয়েজকে দিয়েই করাতে হবে। শেষ মুহূর্তে এসে প্রকল্পের অস্বাভাবিক ব্যয় বাড়ানো এবং দেশি প্রতিষ্ঠান দিয়ে বাকি কাজটুকু না করানোর বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ‘ভেরিয়শনের একটা প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে দর কষাকষি চলছে। স্থানীয় সরকারমন্ত্রীকে নিয়ে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যাওয়া হবে। সেখানে গিয়ে তিনি ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন। দেশি প্রতিষ্ঠান দিয়ে এখন আর কাজ করানো সম্ভব নয়। ঠিকাদার নিয়োগ করা রয়েছে। এখন নতুন করে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়।’

এর মধ্যেই চুক্তি বা কোনোপ্রকার অনুমোদন ছাড়া সুয়েজকে প্রকল্প পরিচালক ওয়াহিদুল ইসলাম ৬০০ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করেছেন। এটা তিনি কোন আইনের আওতায় করেছেন– এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি ওয়াহিদুল। ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ ব্যাপারে সিটিজেন জার্নালকে বলেছেন, ‘কাউকে অনুমোদনবিহীন কোনো টাকা দেওয়ার সুযোগ নেই।’
প্রকল্প পরিচালক ওয়াহিদুল ইসলাম প্রকল্পের সময় ও ব্যয়বৃদ্ধি নিয়ে বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণ করতে ৮ বছর সময় লেগে যায়। এ ছাড়া প্রকল্পের শুরুতে প্রতি ডলারের মূল্য ছিল ৭৮ থেকে ৮০ টাকা। বর্তমানে ডলারের মূল্য বেড়ে ১২২ টাকা হয়েছে। এ কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে বাস্তবে প্রকল্পের ব্যয় বাড়েনি।’ এরপর তিনি যোগ করেন, ‘সম্পূর্ণ বিদেশি ঋণে এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ডলারে পেমেন্ট করতে গিয়ে টাকার পরিমাণ আপাতদৃষ্টিতে বেশি মনে হচ্ছে।’
গন্ধর্বপুর প্রকল্পে ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব সিটিজেন জার্নালকে বলেছেন, ‘এটা মানুষের পানির চাহিদার বিপরীতে প্রতারণা করে টাকা বাড়ানোর অপচেষ্টা। দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানো দরকার। এটি না করে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর বিষয়টি নতুন ‘বোতলে পুরনো মদ’। ঘুরেফিরে একই কুমিরের ছানা দেখানোর মতো।’

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাবটি অন্তত দুইবার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ফিরিয়ে দিয়েছেন। এরপরও কেন প্রকল্প পরিচালক ব্যয়বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়ে যাচ্ছেন, এর কোনো সদুত্তর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে সিটিজেন জার্নালের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তার জনসংযোগ কর্মকর্তা হৃদয় মাহমুদ চয়ন জানান, মন্ত্রী এ বিষয়ে এখন সংবাদমাধ্যমে কথা বলবেন না। তিনি ৯ জুন গন্ধর্বপুর প্রকল্প পরিদর্শনে যাবেন, সেখানে হয়তো কথা বলতে পারেন।
প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বাড়ানোর এ প্রস্তাবকে অনেকেই বলছেন নানা বাহানায় অর্থ লোপাটের আয়োজন। ইকবাল হাবিব এমন কাজের জবাবদিহিতা দাবি করে বলেছেন, ‘এই প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর যথাযথ কারণ জনসমক্ষে প্রকাশ করা দরকার। প্রকল্পের ব্যয় সমীক্ষা করেই বাড়ানো হয়েছিল। কেন আবার ব্যয় বাড়ছে, তা বোধগম্য নয়। এটি জবাবদিহিতাহীন কার্যক্রম।’ এজন্য পরিকল্পনা কমিশন, আইএমইডি সমীক্ষা করেই পরবর্তী অনুমোদন দেবে বলে তিনি মনে করছেন।
ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী গন্ধর্বপুর পানি প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ৪৮ মাস। ১৩ মে ২০১৯ থেকে ১২ মে ২০২৩ পর্যন্ত। সেটি এখন আরও ৪১ মাস ১৮ দিন বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ মেয়াদের সময় বৃদ্ধি ৮৪ দশমিক ১০ শতাংশ। এই প্রস্তাব অনুযায়ী কাজ শেষ হওয়ার কথা এ বছরের অক্টোবরে। এই প্রকল্পের অর্থায়নে বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (ইআইবি) এবং ফ্রেঞ্চ ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (এএফডি) যুক্ত রয়েছে। অতিরিক্ত ব্যয়ের সংকুলান করতে ইআইবির সঙ্গে ইতোমধ্যে নতুন করে ৭০ মিলিয়ন ইউরো ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বর্ধিত প্রস্তাবের বিষয়ে এডিবি ইতোমধ্যে তাদের অনাপত্তি দিয়েছে।

সময়মতো প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়া এবং এখন সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিষয়ে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গন্ধর্বপুর প্রকল্পের কাজ ঠিকাদার তিন মাস আগে বন্ধ করে দিয়েছে। প্রকল্প নিয়ে অনেক ঝামেলা রয়েছে। ঢাকা-সিলেট রুটের পাইপলাইন কাজসহ বিভিন্ন কাজ এখনো বাকি রয়েছে। আমরা অনেক দূর কাজ এগিয়েছি। কীভাবে সেটি সম্পন্ন করা যায়, তা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। রীতিমতো এই কাজ নিয়ে যুদ্ধ করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ঠিকাদার থেকে শুরু করে স্বার্থসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করা হচ্ছে।’
ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর পানি দূষিত। এর জন্য প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের মেঘনা নদীর অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার পানি তুলে পরিশোধনের জন্যই হাতে নেওয়া হয় গন্ধর্বপুর পানি প্রকল্প। এর আওতায় বিষনন্দী থেকে গন্ধর্বপুর পর্যন্ত ২৩ কিলোমিটার কাঁচা পানির পাইপলাইন এবং ঢাকা শহরে ১৪ কিলোমিটার শোধিত পানির পাইপলাইন বসাচ্ছে ওয়াসা। ওয়াসা বলছে, প্রকল্পের কাজ শেষ হলে মাটির উপরিভাগ থেকে দৈনিক ৫০ কোটি লিটার পরিশোধিত পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে।




