ফর্টিজ ডাউনটাউন রিসোর্ট চলছে অনুমোদন ছাড়া

ফর্টিজ ডাউনটাউন রিসোর্ট চলছে অনুমোদন ছাড়া
ফর্টিজ ডাউনটাউন রিসোর্ট

সুইমিং পুল, বিলাসবহুল সুইট, ব্যাংকুয়েট হল থেকে শুরু করে রেস্টুরেন্ট, কফি শপ ও শিশুদের খেলার মাঠ– আয়োজনের কোনো কমতি নেই রাজধানীর বাড্ডার ‘ফর্টিজ ডাউনটাউন’ রিসোর্টে। প্রতিদিন সেখানে বসছে করপোরেট মিটিং, আয়োজিত হচ্ছে একের পর এক সামাজিক অনুষ্ঠান আর চলছে দিনব্যাপী প্যাকেজের জমজমাট ব্যবসা। তবে চাকচিক্যের আড়ালে রয়েছে নির্মাণ-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ। প্রায় সাড়ে ৩০০ কাঠা জমির ওপর গড়ে ওঠা এই রিসোর্ট ব্যবসা বা নির্মিত বহুতল অবকাঠামোর কোনোটির জন্য নেয়নি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুমোদন। রাজউকের নগর পরিকল্পনা শাখা বলছে, সংস্থাটির এখতিয়ারভুক্ত এলাকা হওয়া সত্ত্বে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ কোনো অনুমোদন না নিয়েই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সম্প্রতি তাদের কাছে নথিপত্র চাওয়া হয়েছে।

রাজউক সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সাল থেকে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) বাস্তবায়ন হওয়ার পর সংস্থাটির আওতাভুক্ত এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার আগে নকশা অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু ফর্টিজ ডাউনটাউন কর্তৃপক্ষ বছরের পর বছর ধরে রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

রিসোর্টের মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে একাধিক ভবন
রিসোর্টের মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে একাধিক ভবন

অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট জোনের পরিচালক থেকে শুরু করে অথরাইজড অফিসার ও মাঠপর্যায়ের ইমারত পরিদর্শকদের ‘ম্যানেজ’ করেই অনুমোদনহীন এই কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। আর নজরদারির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয়তায় সরকার ও রাজউক রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তবে রাজউকের মাঠপর্যায়ের ইমারত তদারকির দায়িত্বে থাকা লোকজনের ভাষ্য, এ ধরনের বিষয় মূলত সংস্থাটির নগর পরিকল্পনা শাখা দেখভাল করে থাকে। মূল দায়িত্ব তাদের।

জানা যায়, বাড্ডা থানার বড় বেরাইদের এ কে এম রহমতুল্লাহ ইউনিভার্সিটি কলেজের পেছনে ফকিরখালী রোডে গড়ে উঠেছে ফর্টিজ ডাউনটাউন রিসোর্ট। সরকারি হোল্ডিং নম্বর ৫৭০২-৫৭০৯ এর আওতায় প্রায় ৫৬৪ দশমিক ১ শতাংশ বা ৩৪১ দশমিক ৬৫ কাঠা জায়গাজুড়ে রিসোর্টটি বিস্তৃত। কাগজপত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২২ সালে এর যাত্রা শুরুর কথা বলা হলেও বাস্তবে এরও আগে থেকে সেখানে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়। এ প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন গাজীপুরে সারা রিসোর্ট নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, অনুমোদনহীন এই বিশাল চত্বরে এরই মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে একাধিক স্থায়ী ভবন। রিসোর্টের ভেতরে রয়েছে চারতলা দুটি এবং তিনতলা একটি ভবন। এসব ভবনে রয়েছে সুইমিং পুল, লাক্সারি রুম, কনফারেন্স রুম, ব্যাংকুয়েট হল, রেস্টুরেন্ট ও কফিশপ।

রিসোর্টের মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে একাধিক ভবন
রিসোর্টের মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে একাধিক ভবন

এ ছাড়া শিশুদের বিনোদনের জন্য রয়েছে বড় প্লে-গ্রাউন্ড ও বিভিন্ন রাইড। ফর্টিজ গ্রুপের নিজস্ব ব্র্যান্ডের পোশাকের একটি শোরুমও স্থাপন করা হয়েছে সেখানে। শুধু রিসোর্ট নয়, এর সংলগ্ন এলাকায় ফর্টিজ গ্রুপের ছয়তলা বিশিষ্ট প্রধান কার্যালয়ও নির্মাণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানার জন্য রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ড্যাপ অনুযায়ী ২০১০ সাল থেকেই ফর্টিজ ডাউনটাউন যে এলাকায় অবস্থিত, সেটি রাজউকের আইনি আওতাভুক্ত। আইন অনুযায়ী, সেখানে রাজউকের অনুমোদন নিয়েই অবকাঠামো নির্মাণ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

তবে তিনি নিশ্চিত করেন, ফর্টিজ ডাউনটাউনের কোনো ভবন বা বাণিজ্যিক কার্যক্রমের অনুমোদন এখন পর্যন্ত রাজউক দেয়নি। ফর্টিজ ডাউনটাউন কর্তৃপক্ষ অনুমোদনের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দিয়েছে বলেও জানান তিনি।

রাজউক সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২৬ অক্টোবর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র নেয় রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ। এরপর রাজউকের অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হলে তা পরিকল্পনা কমিটিতে পাঠানোর জন্য প্ল্যানিং রিপোর্ট, কনসেপ্ট প্ল্যান এবং ট্রাফিক ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্টের (টিআইএ) সফট ও হার্ড কপি জমা দিতে বলা হয়। কিন্তু এরপর আর কোনো অগ্রগতির তথ্য এই দপ্তরের নথি বা কর্মকর্তাদের কাছে নেই।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের জোন ৪/২-এর অথরাইজড অফিসার হাসানুর রেজা বলেন, ‘ফর্টিজ ডাউনটাউন কর্তৃপক্ষকে আমরা ডেকে পাঠিয়েছি। ঠিক কিসের ভিত্তিতে তারা সেখানে রিসোর্ট ও ইভেন্ট পরিচালনা করছে, তার প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ ও নথি চাওয়া হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ইমারত পরিদর্শক ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। এ বিষয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হচ্ছে।’

রাজউকের পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) মো. মনিরুল হক সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘এ রিসোর্টে যেসব স্থাপনা নির্মাণ হয়েছে এর জন্য অবশ্যই রাজউকের অনুমোদন লাগবে। ইউনিয়ন পরিষদের অনুমোদন নিয়ে তা কোনোভাবে পরিচালনার সুযোগ নেই। আমরা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবো।’

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে দেওয়া মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করে জাবেদ নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তার কাছে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। তবে তিনি জানান, কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা থাকায় এসব বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।

এদিকে রিসোর্টের রিজার্ভেশন এক্সিকিউটিভ রেজাউল নাবিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘এতো বড় রিসোর্ট তো আর অনুমোদন ছাড়া চলতে পারে না। রিসোর্ট পরিচালনা করার জন্য যা যা অনুমোদন প্রয়োজন সব নেওয়া হয়েছে।’

/এসএ/