জমি বিক্রি করে চলে আসার পর রাজউক বলছে ‘নাভানা-শেলটেক অনুমোদনহীন’

জমি বিক্রি করে চলে আসার পর রাজউক বলছে ‘নাভানা-শেলটেক অনুমোদনহীন’
শেলটেক ও নাভানা রিয়েল এস্টেটের লোগো। গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

প্রকল্প শুরু করা হয়েছিল প্রায় ১৫ বছর আগে। এরইমধ্যে ক্রেতাদের কাছে প্রকল্পের সব জমি প্লট আকারে বিক্রির পর হস্তান্তরও হয়ে গেছে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো– জমি বিক্রি শেষ করে কোম্পানিগুলো সরে আসার পর নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নগর পরিকল্পনা বিভাগ বলছে, এসব আবাসন প্রকল্প অনুমোদনহীন। সম্প্রতি রাজউকের পক্ষ থেকে বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত তালিকা তৈরি করা হয়।

রাজউকের জোন-১-এর আওতাধীন সাভার-আশুলিয়া এলাকায় শেলটেকের ‘মাধবী-মালভী’ ও ‘বাতায়ন’ এবং নাভানা রিয়েল এস্টেটের ‘গার্ডেনিয়া’ ও ‘নাভানা ভিলেজ’ প্রকল্পের ক্ষেত্রে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। রাজউকের অনুমোদন না থাকলেও থেমে নেই এসব প্রকল্পে ভবন নির্মাণ ও ভূমি উন্নয়নকাজ।

স্থানীয়রা বলছেন, কৃষি, শিল্প এবং বন বিভাগের মিশ্র শ্রেণির জমিতে গড়ে ওঠা এসব বেসরকারি আবাসন মূলত রাজউকের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে ম্যানেজ করেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। আর রাজউক কৌশলে তাদের নথিপত্রে শুধু অবৈধ তালিকা করে রাখে, যেন কোনো কর্তৃপক্ষ এসব অবৈধ বা অনুমোদনহীন আবাসন প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে প্রশ্ন তুললে দায়সারা একটি তালিকা সামনে এনে নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে পারে।

১০ বছর পরও ঝোপঝাড় শেলটেকের ‘বাতায়ন’

সাভার-আশুলিয়ার বঙ্গবন্ধু রোডের গৌরীপুর এলাকায় প্রায় ৫০ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে শেলটেকের ‘বাতায়ন’ প্রকল্প। রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) নকশা অনুযায়ী এলাকাটি প্রধানত শিল্পাঞ্চল হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু সরেজমিন দেখা যায়, বাতায়ন প্রকল্পের সামনে সরকারি রাস্তা প্রায় ২৫ ফুট প্রশস্ত। মূল সড়ক থেকে প্রকল্প এলাকায় প্রবেশের অংশও বেশ নিচু। প্রকল্প উত্তর ও পশ্চিম সীমানা ঘেঁষে বন বিভাগের জমি রয়েছে বলেও জানান নিরাপত্তাকর্মীরা।

জানা যায়, শেলটেকের এ প্রকল্পটিতে তিন থেকে পাঁচ কাঠা আয়তনের কমবেশি ১৫০টি প্লট রয়েছে। প্রায় ১০ বছর আগেই এসব প্লটের জমি বেচা-বিক্রি শেষ হয়েছে। কয়েকটি প্লটে সীমানাপ্রাচীর উঠলেও প্রকল্পের বড় অংশ এখনও ঝোপঝাড় হয়ে আছে। প্লট বিক্রি শেষ হওয়ায় প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রকল্পটি এখন আর দেখভাল করছে না শেলটেক।

সাভার-আশুলিয়ার বঙ্গবন্ধু রোডের গৌরীপুর এলাকায় শেলটেকের ‘বাতায়ন’ প্রকল্প। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
সাভার-আশুলিয়ার বঙ্গবন্ধু রোডের গৌরীপুর এলাকায় শেলটেকের ‘বাতায়ন’ প্রকল্প। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

বাতায়ন প্রকল্পের একটি প্লট কিনেছেন দানিয়াল চৌধুরী নামের এক ব্যক্তি। তিনি সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘২০১৪ সালে আমরা প্লটটি কিনেছি, এরপর থেকে বসে আছি। স্থাপনা নির্মাণ বা অন্য কোনো কাজ করা হয়নি। অন্য যারা জমি মালিক আছেন, তারাও এই মুহূর্তে ভবন নির্মাণে আগ্রহী নন। তবে পরিকল্পনা আছে, আমরা ভূমি উঁচু করে কাজ ধরবো। শেলটেক আমাদের শুধু প্লটগুলো বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেছে।’

আশুলিয়ার জিরাবো এলাকায় প্রায় ২০ একর জমির ওপর শেলটেকের ‘মাধবী’ ও ‘মালভী’ নামে আরও দুইটি প্রকল্প রয়েছে। সেখানেও একই চিত্র দেখা যায়। রাজউকের অনুমোদনহীন প্রকল্পের তালিকায় থাকা এ প্রকল্পগুলোর সব জমি বিক্রি হয়ে গেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। সেখানে দুই-তিনটি ভবন নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে। তবে সেগুলোর নকশায় রাজউকের অনুমোদন আছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এ প্রসঙ্গে জানতে রাজউকের দায়িত্বপ্রাপ্ত জোনাল পরিচালক রাজিয়া সুলতানার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। পরে এ প্রতিবেদনের বিষয়ে কথা বলতে চেয়ে বিস্তারিত ম্যাসেজ করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।

সাভার ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন এলাকায় ৩৫ একর জমি নিয়ে গড়ে ওঠা নাভানার আরেকটি প্রকল্প ‘গার্ডেনিয়া’। সেখানে গিয়েও দেখা গেছে প্রায় একই ধরনের অবস্থা। নাভানার এ প্রকল্পে প্লট কেনা-বেচার পর বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের কার্যক্রম চলছে।

রাজউকের অনুমোদনের বিষয়ে জানতে ঢাকার পান্থপথে শেলটেক গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার রাশেদা খাতুন বলেন, ‘শেলটেক কোনো আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলেনি, আমরা শুধু প্লট আকারে বিক্রি করেছি। যথাযথ নিয়ম মেনেই সব কাজ করা হয়েছে।’ এর বেশি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

পরে বিষয়টি নিয়ে কথা হয় শেলটেক গ্রুপের সিনিয়র সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (সেলস) মো. নাসিফুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা জমি হস্তান্তর করেছি প্রায় ১৫ বছর আগে। কিছু জমি হয়তো পরে হস্তান্তর করা হয়েছে। আমরা জানিও না প্রকল্পগুলোর বর্তমান অবস্থা কী। জমি রেজিস্ট্রেশন করে বুঝিয়ে দিয়েছি, এখন সব দায়িত্ব জমির মালিকদের। তবে প্রকল্প অনুমোদন বিষয়ে আমাদের কাছে খুব বেশি তথ্য নেই।’

নাভানা ভিলেজে প্লট বিক্রি শেষ, চলছে ভবন নির্মাণও

রাজউকের আওতাধীন সাভারের জামগড়া এলাকায় প্রায় ২৮ একর জমির ওপর নাভানা রিয়েল এস্টেটের ‘নাভানা ভিলেজ’ প্রকল্প। এলাকাটি প্রধানত শিল্প-কলকারখানা ও গার্মেন্টস-কেন্দ্রিক। বেসরকারি এ আবাসন প্রকল্পের মধ্যে প্রায় ৭০টির মতো টিনশেড ঘর থেকে শুরু করে ছয়তলা পর্যন্ত ভবন গড়ে উঠেছে।

সাভারের জামগড়া এলাকায় ‘নাভানা ভিলেজ’ প্রকল্প। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
সাভারের জামগড়া এলাকায় ‘নাভানা ভিলেজ’ প্রকল্প। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রকল্পটির সব জমিই বিক্রি হয়ে গেছে। পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকলেও ভবন নির্মাণ থেমে নেই।

নাভানা ভিলেজ থেকে প্লট কিনেছেন আতিকুর রহমান। আলাপকালে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ইদানিং ভবন নির্মাণের সংখ্যা বেড়েছে। বেশ কয়েকটি ছয়তলা ভবনও হয়েছে। তবে এখানে ভবন করতে রাউজকের অনুমতি লাগে কি না আমার জানা নাই। কোনো ঝামেলা হলে নাভানা থেকে এসব বিষয় দেখবে বলে আমাদের জানানো হয়েছে।’

সাভার ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন এলাকায় ৩৫ একর জমি নিয়ে গড়ে ওঠা নাভানার আরেকটি প্রকল্প ‘গার্ডেনিয়া’। সেখানে গিয়েও দেখা গেছে প্রায় একই ধরনের অবস্থা। নাভানার এ প্রকল্পে প্লট কেনা-বেচার পর বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের কার্যক্রম চলছে।

তালিকা করেই দায় সেরেছে রাজউক

অনুমোদনহীন আবাসন প্রকল্পগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা রাজউকের নগর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন শাখার। কিন্তু তারা এক্ষেত্রে বেসরকারি আবাসন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। ভূমি ব্যবসায়ীদের সব ধরনের কাজ করার সুযোগ দিয়ে তারা শুধু কৌশলে তালিকা করে ফাইলে জমা রাখে। বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিজেদের পকেটে যাচ্ছে বলে জানান খোদ রাজউকের অন্য শাখার এক কর্মকর্তা।

এই তালিকা তৈরির দায়িত্বে ছিল জোন-১ এর দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী নগর পরিকল্পনাবিদ, নকশাকার, কানুনগো ও সার্ভেয়াররা। এ ছাড়াও এর তদারকিতে ছিল জোন-১ এর পরিচালক, অথরাইজড অফিসার, উপনগর পরিকল্পনাবিদ, প্রধান ইমারত পরিদর্শক, নথিরক্ষণ কর্মকর্তা প্রমুখ। তালিকা তৈরির বিষয়টি রাজউকের প্রধান কার্যালয় থেকেও যাচাই করা হয়। প্রধান শাখার কর্মকর্তারাও এই তালিকা চূড়ান্ত করেন।

সাভার-আশুলিয়ার বঙ্গবন্ধু রোডের গৌরীপুর এলাকায় শেলটেকের ‘বাতায়ন’ প্রকল্প। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
সাভার-আশুলিয়ার বঙ্গবন্ধু রোডের গৌরীপুর এলাকায় শেলটেকের ‘বাতায়ন’ প্রকল্প। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

অনুমোদনহীন থাকার পরও বছরের পর বছর কীভাবে এসব প্রকল্পের জমি বিক্রি করা হলো– এ বিষয়ে জানতে আমরা মুখোমুখি হই রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলামের। তিনি সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘প্রকল্পগুলো কবে শুরু হয়েছে তা দেখতে হবে। ২০০৪ সালের আগে শুরু হওয়া প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে রাজউকের অনুমোদন নেওয়া হয়নি, কারণ তখন ভূমি উন্নয়ন নীতিমালা করা হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে সাভার পৌরসভা বা স্থানীয় পর্যায়ের অনুমতি নিয়ে প্রকল্প চালু করা হয়েছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসব এলাকা যেহেতু এখন রাজউকের আওতাধীন, তাই রাজউক থেকেও প্রকল্পের অনুমোদন নেওয়া লাগবে। তবে এ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এখন থেকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে৷ আর ভবন নির্মাণের জন্য তো অবশ্যই আমাদের (রাজউক) অনুমোদন নিতে হবে।’

আবাসন প্রকল্পগুলোতে ভবন নির্মাণে রাজউকের অনুমোদন আছে কি না জানতে চাইলে পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) মো. মনিরুল হক বলেন, ‘এসব প্রকল্পে যেসব স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে বা হচ্ছে, এগুলোর কোনটিরই নকশার অনুমোদন রাজউক থেকে দেওয়া হয়নি এবং এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই।’

জমি বিক্রি শেষ, দায় নেবে কে?

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, আবাসন প্রকল্পের অর্থ শুধু জমি ভাগ করে প্লট বিক্রি করা নয়। একটি প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো বসবাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করেই আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা। তবে এর ব্যত্যয় ঘটলে তার দায় কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি তদারকির এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোরও।

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, কোম্পানিগুলো যখন জমি রেজিস্ট্রেশন করে দিয়েছে, তখন স্থানীয় সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদেরও দেখতে হতো কী ধরনের জমি বিক্রি হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজউক কেবল তালিকা তৈরি করেই দায়মুক্তি নিয়েছে। অথচ মানুষের সঙ্গে সব ধরনের লেনদেন হয়েছে দেখেও না দেখার ভান করেছে। সাধারণ মানুষ তো আর আইন বোঝে না, তারা কোম্পানির দেওয়া আশ্বাসের ওপরই নির্ভর করে। রাজউক এখানে কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না।’

/এফসি/