রক্ষণাবেক্ষণের নামে জিম্মি করছে লিফট কোম্পানিগুলো

রক্ষণাবেক্ষণের নামে জিম্মি করছে লিফট কোম্পানিগুলো
গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

রাজধানীর আজিমপুর সরকারি অফিসার্স কোয়ার্টারের ২০ তলা ভবনগুলোতে স্থাপন করা হয়েছে দেড় শতাধিক লিফট। বাসিন্দাদের ভবনে ওঠানামার একমাত্র ভরসা এসব লিফট। কিন্তু লিফটে হঠাৎ কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের করার তেমন কিছু থাকে না। কারণ লিফটের এক্সেস কন্ট্রোল সিস্টেমের পাসওয়ার্ড থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সবই থাকে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের হাতে। ফলে কোম্পানির লোকজন না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় থাকে না। এর বাইরে প্রতি মাসে রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ গুনতে হয় অস্বাভাবিক অর্থ। আবার নির্দিষ্ট সময় পরপর যন্ত্রাংশ পরিবর্তনের নামে দিতে হয় অতিরিক্ত টাকা; সেই যন্ত্রাংশও কিনতে হয় একই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরসহ একাধিক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, লিফট বিক্রির পর কন্ট্রোল সিস্টেম ও যন্ত্রাংশ সরবরাহের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রেখে রক্ষণাবেক্ষণের নামে গ্রাহকদের জিম্মি করে রাখছে এসব কোম্পানি।

আজিমপুর সরকারি অফিসার্স কোয়ার্টারের মতো রাজধানীর সরকারি আবাসন প্রকল্প, ইস্কাটনে সচিব কোয়ার্টার, বিভিন্ন বাণিজ্যিক ভবন এবং বেসরকারি আবাসনেও একই কায়দায় লিফট কোম্পানিগুলো একচেটিয়া ব্যবসায় করে যাচ্ছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, লিফট স্থাপনের পর বিক্রয়োত্তর সেবা, যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এক ধরনের নির্ভরতার বাজার। ফলে রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ পরিবর্তন কিংবা জরুরি কারিগরি সহায়তার ক্ষেত্রে ভবন মালিক ও ব্যবহারকারীরা কার্যত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর ওপর।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, লিফট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারের নির্ধারিত রেট অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করা হলেও মূল আপত্তি কন্ট্রোলার পাসওয়ার্ড নিয়ে। অনেক কোম্পানি লিফটের কন্ট্রোলার, সফটওয়্যার ও কনফিগারেশন সংক্রান্ত তথ্য নিজেদের কাছেই সংরক্ষণ করে। ফলে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে চাইলে সেটি প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

একজন প্রকৌশলী বলেন, ‘লিফটের কোনো ত্রুটি দেখা দিলে কোম্পানির কারিগরি সহায়তা ছাড়া অনেক সময় কিছুই করার থাকে না। কন্ট্রোল সিস্টেমের পাসওয়ার্ড তাদের কাছে থাকায় আমরা পুরোপুরি তাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ি।’

তাদের ভাষ্য, করোনাকালেও এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, যে দেশ থেকে লিফট আমদানি করা হয়েছে, সেখানকার পরামর্শক ছাড়া সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। ফলে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও সীমিত ছিল।

গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, মিরপুর ৬ নম্বরের সরকারি কর্মকর্তাদের কলোনিতে ১০০টির বেশি লিফট স্থাপন করা হয়েছে, যার আমদানিকারক রওশান এলিভেটরস লিমিটেড। অন্যদিকে রাজধানীর ইস্কাটনে সচিব কোয়ার্টারে স্থাপন করা হয়েছে শিন্ডলার ব্র্যান্ডের ছয়টি লিফট।

খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, লিফট স্থাপনের সময় গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিপত্রে এমন কিছু শর্ত রাখা হয়, যা ভবিষ্যতে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণ বা যন্ত্রাংশ সংগ্রহের সুযোগ সংকুচিত করে দেয়। অনেক ভবন মালিক শুরুতে এসব শর্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বুঝতে পারেন না। কিন্তু কয়েক বছর পর যখন সফটওয়্যার আপডেট, বড় ধরনের মেরামত বা যন্ত্রাংশ পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়, তখন তারা উপলব্ধি করেন যে কার্যত একটি প্রতিষ্ঠানের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাজারে কার্যত কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে জনপ্রিয় টেলিভিশন উপস্থাপক হানিফ সংকেত ও তার ভাই হাবিবুর রহমানের মালিকানাধীন মান বাংলাদেশ লিমিটেড, সিগমা লিফট কোম্পানি লিমিটেড, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রোপার্টি লিফট, ওয়ালটন লিফট, রওশান এলিভেটরস লিমিটেড, শিন্ডলার লিফটের অফিশিয়াল ডিলার ক্রিয়েটিভ ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

পরিচয় গোপন রেখে মান বাংলাদেশের সেলস ও মার্কেটিং ম্যানেজার মো. শামিনুর ইসলামের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। শামিনুর ইসলাম বলেন, ‘আমাদের থেকে লিফট নিলে আমরাই সার্ভিসিং করি। কোনো পার্টস নষ্ট হলে সেটা আমাদের থেকে নেওয়াই ভালো। বাজারে কোনো পার্টস ৩ বা ৪ হাজার টাকা। কিন্তু আমাদের থেকে ভালোটা পাবেন সেটা ৭ হাজার টাকায়। একটা নিশ্চয়তা থাকবে। এরপরও যদি আপনারা মাসিক সার্ভিসিং না নিতে চান তাহলে আমাদের আগে চিঠি দিতে হবে।’

এ বিষয়ে আমরা কথা বলি রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউকের আবাসিক প্রকল্পের ভবন ব্যবস্থাপক খাইরুল আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দুটি লিফটের মেইনটেন্যান্স বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ৮ হাজার টাকা দিতে হয়। কোনো পার্টস নষ্ট হলে সেটাও তাদের কাছ থেকেই কিনতে হয়।’

মতিঝিলের দিলকুশা এলাকায় একটি বাণিজ্যিক ভবনের ব্যবস্থাপক আমিরুল ইসলাম স্বপন বলেন, ‘কোনো পার্টস নষ্ট হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছ থেকেই কিনতে হয়। বাইরে থেকে পার্টস আনতে গেলে নানা ধরনের আপত্তি করা হয়। অনেক সময় মাদারবোর্ড বা কন্ট্রোল সিস্টেমের পাসওয়ার্ডও দিতে চায় না।’

একাধিক ভবন মালিক ও ব্যবস্থাপক অভিযোগ করেন, অনেক ক্ষেত্রে শুধু ‘পার্টস নষ্ট হয়েছে’ বলে জানানো হয়। কিন্তু কোন পার্টস নষ্ট হয়েছে, কেন পরিবর্তন প্রয়োজন কিংবা পুরোনো পার্টস ফেরত দেওয়া হবে কি না এসব বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয় না। ফলে যন্ত্রাংশের প্রকৃত মূল্য বা প্রয়োজনীয়তা যাচাইয়ের সুযোগও সীমিত থাকে।

ক্রিয়েটিভ ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড এর সিনিয়র এক্সিকিউটিভ মো. সাবেতুল ইসলাম ভুঁইয়া বলেন, ‘আমাদের থেকে লিফট ক্রয় করা হলে এক বছরে ফ্রি সার্ভিসিং করি। এরপর বাৎসরিক একটা চুক্তি করতে হয় সার্ভিসিং এর জন্য। সেটা দুই থেকে তিন বছরের জন্য হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের থেকে সার্ভিসিং নিলে লিফটের গড় আয়ু ভালো থাকে। কিন্তু আপনি যদি অন্য কোথাও থেকে সার্ভিসিং নেন তাহলে লিফট বেশিদিন টিকবে না।’

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চূড়ান্ত বিল পরিশোধের আগে কন্ট্রোলার পাসওয়ার্ড, সফটওয়্যার অ্যাকসেস, কারিগরি ম্যানুয়াল, ক্যাটালগ এবং প্রয়োজনীয় কনফিগারেশন তথ্য বুঝে নেওয়া উচিত। এতে ভবিষ্যতে একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি কমবে। এছাড়া লিফট বিক্রির পর যন্ত্রাংশ ও পাসওয়ার্ড উন্মুক্ত করে দিলে অবাধ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে গ্রাহক সেবা নিতে পারবে।

তাদের মতে, বহুতল ভবনে লিফট এখন অপরিহার্য অবকাঠামো। কিন্তু সেই অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ যদি ব্যবহারকারীর বদলে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে, তাহলে রক্ষণাবেক্ষণের নামে জিম্মি হওয়ার অভিযোগ থেকেই যাবে।

/এসএ/