ওয়াসার ১০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের প্রতিবেদন উধাও

ওয়াসার ১০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের প্রতিবেদন উধাও
গ্রাফিক্স: সিটিজেন জার্নাল

ঢাকা ওয়াসার ‘ঢাকা পরিবেশবান্ধব টেকসই পানি সরবরাহ প্রকল্প (তৃতীয়বার সংশোধিত)’ বাস্তবায়নে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতি হয়েছে। দরপত্র আহ্বান থেকে কার্যাদেশ ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, প্যাকেজের মূল্য বৃদ্ধি, ঠিকাদারকে চুক্তিমূল্যের অতিরিক্ত বিল দেওয়াসহ বিভিন্ন ধাপে অনিয়ম হয়েছে। যথাসময়ে শেষ করা হয়নি কাজ। নানা অজুহাতে বারবার বাড়ানো হয়েছে মেয়াদ। এতে সরকারের কয়েক শ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অনিয়ম-দুর্নীতির এই চিত্র উঠে এসেছে।

আইএমইডি গত বছরের ২০ অক্টোবর এসব অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে বেশকিছু সুপারিশসহ স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে এই প্রতিবেদন পাঠায়। কিন্তু স্থানীয় সরকার বিভাগ আজও এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উপরন্তু তারা এই প্রতিবেদন খুঁজে পাচ্ছে না বলে জানিয়েছে।

আইএমইডির অনুসন্ধান কমিটি সরেজমিন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনসহ নানাভাবে তদন্ত করে ওয়াসার এই প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, অসঙ্গতি ও দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই কমিটি তাদের প্রতিবেদনে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধের জন্য বেশকিছু সুপারিশ করেছে।

এই অনিয়মের সঙ্গে ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্পটির পরিচালক (পিডি) মো. ওয়াহিদুল ইসলাম মুরাদ জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই বিষয়ে বারবার চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আইএমইডির অনুসন্ধান প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য

ঢাকা মহানগরে ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব ভূ-উপরিস্থ নদীর পানি সরবরাহ নিশ্চিতে ঢাকা ওয়াসা এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তবে প্রকল্পটিতে নানা পর্যায়ে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম, বিধি লঙ্ঘন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। আইএমইডি চার সদস্যের অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। আইএমইডি এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

ঢাকা ওয়াসার গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্পের নির্মাণাধীন অবকাঠামো।ছবি: সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোর
ঢাকা ওয়াসার গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্পের নির্মাণাধীন অবকাঠামো।ছবি: সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোর

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১৭ আগস্ট জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে ঢাকা ওয়াসার এই প্রকল্পের আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি খুঁজে বের করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই নির্দেশনা অনুযায়ী আইএমইডিকে অভিযোগটি তদন্ত করে প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সে অনুযায়ী আইএমইডির নেতৃত্বে গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়। পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন সেক্টর–৭-এর মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব), আইএমইডি আল আমিন সরকারকে ওই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়। প্রতিবেদনে তুলে ধরা অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা মুঠোফোনে সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আইএমইডি থেকে তাদের ‘ঢাকা পরিবেশবান্ধব টেকসই পানি সরবরাহ প্রকল্পের’ অনিয়মের বিষয়টি অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মূল্যায়ন শেষে তারা একটি প্রতিবেদন আইএমইডির সচিবের কাছে পাঠান।

বারবার আলোচনায় আসা এই প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) ওয়াহিদুল ইসলাম মুরাদকে বাঁচাতেই আইএমইডির অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদনের চিঠি গায়েব করে দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।

আইএমইডির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে প্রকিউরমেন্ট গাইডলাইন, পিপিআর এবং আর্থিক বিধি লঙ্ঘন করা হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বারবার প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পরিবর্তন করায় প্রকল্পের গতিশীলতা নষ্ট হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আইএমইডি থেকে গত বছরের অক্টোবর মাসে অনিয়ম চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রতিবেদন ও দাপ্তরিক চিঠি দেওয়া হলেও স্থানীয় সরকার বিভাগ বলছে তারা এ সংক্রান্ত কোনো প্রতিবেদন খুঁজে পাচ্ছে না।

অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মূল অনুমোদিত আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ২৪৮ কোটি ৬ লাখ টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। পরে নানা সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৯৭৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় তৃতীয় সংশোধনীতে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১০৯ শতাংশ ও মেয়াদ বৃদ্ধির হার ১২৬.৭৬ শতাংশ। গত ১১ বছর ৯ মাসে প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৬৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি ৯০ দশমিক ২০ শতাংশ, যা মোটেই প্রত্যাশিত না। এক্ষেত্রে কাজের ধীরগতি ও অব্যবস্থাপনা স্পষ্ট।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্প এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণসহ চলছে নানা কাজ। ছবি: সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোর
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্প এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণসহ চলছে নানা কাজ। ছবি: সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোর

সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিজিপি) অনুমোদন ছাড়াই ৩ হাজার ৯২৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা ঠিকাদারকে পরিশোধ করা হয়েছে। অর্থাৎ ঠিকাদারকে এ প্যাকেজের চুক্তি মূল্যের চেয়ে ৯২৩.২৬ কোটি টাকা (৩০.৭১ শতাংশ) অতিরিক্ত বিল দেওয়া হয়েছে। এই বাড়তি ব্যয়ের জন্য সিসিজিপির কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি, যা আর্থিক শৃঙ্খলা ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিআর) পরিপন্থি।

প্রকল্পের প্রতিটি প্যাকেজে চুক্তিমূল্য পরিবর্তিত হলেও তৃতীয় সংশোধনীতে ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) সংশোধনের সময় প্রকৃত চুক্তিমূল্য অন্তর্ভুক্ত না করে অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে। যা উন্নয়ন পরিকল্পনা পরিপত্রের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ২০২১-২২ অর্থবছরে এডিপি বা সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) বরাদ্দের বিপরীতে অব্যয়িত ৫৯ লাখ ২৪ হাজার ৯০২ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। যা প্রকল্প বাস্তবায়নে যুক্ত দপ্তরের অদক্ষতা ও আর্থিক শৃঙ্খলার পরিপন্থি। জাতীয় বেতন স্কেল- ২০১৫ বাস্তবায়নের পর প্রকল্পের বিশেষ সংশোধন না করে ডিপিপির সংস্থানের বাইরে গ্যাস, জ্বালানি, স্টেশনারি ও জরিপসহ বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়েছে। এছাড়া এডিবির আরপিএ অংশে নিয়োজিত ২৪ কর্মীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে অস্বাভাবিক বেতন ও ভাতা দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে প্রকিউরমেন্ট গাইডলাইন, পিপিআর এবং আর্থিক বিধি লঙ্ঘন করা হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি), ডিএমপি (ট্রাফিক), ডিএমটিসিএল (এমআরটি-১) এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার কারণে প্যাকেজের আওতায় পাইপলাইন স্থাপনের কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে আন্তর্জাতিক ঠিকাদারদের পক্ষ থেকে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবির আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া গত ১০ অর্থবছরে এই প্রকল্পে মোট ৮৩টি অডিট আপত্তি উত্থাপন করা হয়েছে। যার মধ্যে ৫৪টি আপত্তি এখনও ১ হাজার ৫৪৪ কোটি ২২ লাখ টাকার আর্থিক সংশ্লেষ নিয়ে অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে আছে।

ওয়াসার প্রকল্পে দুর্নীতি বন্ধে আইএমইডির সুপারিশ

আইএমইডির অনুসন্ধান কমিটি সরেজমিন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনসহ নানাভাবে তদন্ত করে ওয়াসার এই প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, অসঙ্গতি ও দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই কমিটি তাদের প্রতিবেদনে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে বেশকিছু সুপারিশ করেছে। এগুলো হচ্ছে;

ব্যয় কমাতে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষের তাগিদ

বহুমাত্রিক প্রতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই অবস্থায় স্থানীয় সরকার বিভাগকে অনুমোদিত মেয়াদের মধ্যে অবশিষ্ট কাজ নিশ্চিতভাবে শেষ করার উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি করে কর্মপরিকল্পনা অনুসারে বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতি দুই মাস পরপর তদারকি ও পর্যালোচনা করবে।

স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা

প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান থেকে কার্যাদেশ দেওয়া পর্যন্ত সময় লেগেছে প্রায় ১ বছর ৯ মাস থেকে ৩ বছর ৮ মাস পর্যন্ত। উপরন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে এ দীর্ঘসূত্রিতার কারণে প্যাকেজ-১ এর মূল চুক্তিমূল্যের তুলনায় সর্বশেষ অনুমোদিত তৃতীয় সংশোধিত ডিপিপিতে ১০০.২৩ শতাংশ, প্যাকেজ-২ এ ৫০.৩২ শতাংশ, প্যাকেজ-৩.১ এ ৭৪.৭০ শতাংশ এবং প্যাকেজ-৩.২ এ ৯৭.৫ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা রাখা রয়েছে। প্রতিটি প্যাকেজে এরূপ ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভেরিয়েশন ও নতুন আইটেম অন্তর্ভুক্ত আছে। পিপিএ ও পিপিআর এ ভেরিয়েশনের লিমিট নির্ধারিত আছে। এক্ষেত্রে ভেরিয়েশন ও নতুন আইটেম পৃথক করা প্রয়োজন। তাই প্রতিটি প্যাকেজের ক্ষেত্রে ভেরিয়েশনের সীমা অতিক্রম করেছে কি না তা তদন্ত করা প্রয়োজন। একাধিকবার ডিপিপি সংশোধন করে প্রতিটি প্যাকেজের মূল্য বৃদ্ধি করা হলেও প্রতিটি সংশোধনের পর এসব ভেরিয়েশন/নতুন আইটেম অন্তর্ভুক্ত করতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের (সিসিজিপি) অনুমোদন না নেওয়া এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে যুক্ত দপ্তর ও ঠিকাদারের মূল চুক্তিমূল্য সংশোধন না করে অতিরিক্ত বিল দেওয়া হয়েছে। তাই সার্বিক বিষয়ে স্বচ্ছতা ও একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য বড় বড় পাইপ স্তূপ করে রাখা হয়েছে। ছবি: সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোর
গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য বড় বড় পাইপ স্তূপ করে রাখা হয়েছে। ছবি: সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোর

চুক্তিমূল্যে সংশোধনে ব্যাখ্যা প্রয়োজন

প্রকল্পের চুক্তিমূল্যই সংশোধিত ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রয়েছে। কিন্তু এ প্রকল্পের প্রতিটি সংশোধনে চুক্তিমূল্যের অধিক মূল্য ডিপিপিতে রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা পরিপত্রের ব্যত্যয় করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী দপ্তরের ব্যাখ্যা নেওয়া প্রয়োজন।

অব্যয়িত অর্থ কোষাগারে জমা দিতে হবে

২০২১-২২ অর্থবছরে আরএডিপিপিতে বরাদ্দের বিপরীতে অব্যয়িত ও অডিট আপত্তিকৃত ৫৯ লাখ ২৪ হাজার ৯০২ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি, যা প্রকল্প দপ্তরের অদক্ষতা ও আর্থিক শৃঙ্খলা পরিপন্থি। তাই এ অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।

অনিয়মের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা

কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিজিপি) অনুমোদন ছাড়াই মূল চুক্তি মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত ৯২৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের অনিয়ম পিপিআর ও আর্থিক শৃঙ্খলার গুরুতর লঙ্ঘন। প্রতিটি প্যাকেজে ভেরিয়েশনের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করা হয়েছে কি না এবং পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো অপচয় বা দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে হবে।

জনবল নিয়োগের বিষয়েও তদন্ত

প্রকল্পের এডিবির আরপিএ অংশে সাকুল্যে বেতনে ২৪ কর্মী নিয়োগ, তাদের বর্ধিত বেতন ও ভাতা দেওয়ার বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ তদন্ত করে দেখতে পারে।

কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে

বকেয়া বিল না পাওয়ার কারণে নারায়ণগঞ্জ আড়াইহাজারের বিশনন্দীতে নির্মিত দৈনিক ১০৫ কোটি লিটার ক্ষমতাসম্পন্ন ইনটেক পাম্পিং স্টেশনের নির্মাণকাজ বন্ধ রেখেছে ঠিকাদার। তৃতীয় সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদনের পর ঠিকাদারের পাওনা পরিশোধ করে এই কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে।

এই বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিকল্পনা, পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন ও পরিদর্শন অনুবিভাগের মহাপরিচালক শিবির বিচিত্র বড়ুয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি উন্নয়ন বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর সঙ্গে কথা বলতে বলেন। পরে আবু নছর মোহাম্মদ আবদুল্লাহর কাছে গেলে এই বিষয়ে তার কিছু জানা নেই বলে জানান।

এরপর স্থানীয় সরকার বিভাগের পানি সরবরাহ (পাস–২) শাখার কর্মকর্তা, সিনিয়র সহকারী সচিব তাছলিমা শিরিনের কাছে ওয়াসার প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ‘এই বিষয়ে সচিব স্যার বলতে পারবেন।’ পরে স্থানীয় সরকার সচিব মো. শহীদুল হাসানের কাছে জানতে চাইলে তিনি ঢাকা ওয়াসা ও পানি সরবরাহ শাখায় যোগাযোগ করতে বলেন। পানি সরবরাহ অনুবিভাগের যুগ্মসচিব মো. সামছুল ইসলামের কাছে গেলে তিনি কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

পরে গত ৪ নভেম্বর যুগ্মসচিব সামছুল ইসলামের কার্যালয়ে পুনরায় গেলে তিনি শাখা কর্মকর্তার কাছে সর্বশেষ অবস্থা জানতে চান। কিছুক্ষণ পর শাখা কর্মকর্তা (সিনিয়র সহকারী সচিব) তাছলিমা শিরিন ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা জীবন কৃষ্ণ ভৌমিক যুগ্মসচিবের কক্ষে আসেন। তখন তারা বলেন, ‘ঢাকা ওয়াসার প্রকল্পের বিষয়ে আইএমইডির কোনো প্রতিবেদন তাদের কাছে আসেনি। এলেও তারা সেটি খুঁজে পাচ্ছেন না।’

গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্প এলাকায় পাইপ স্থাপনের কাজ চলছে। ছবি: সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোর
গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্প এলাকায় পাইপ স্থাপনের কাজ চলছে। ছবি: সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোর

পরে যুগ্মসচিব মো. সামছুল ইসলাম বলেন, “ঢাকা পরিবেশবান্ধব টেকসই পানি সরবরাহ প্রকল্পে’ অনিয়মের বিষয়ে আইএমইডির সুপারিশ সংক্রান্ত কোনো প্রতিবেদন তাদের কাছে আসেনি। এই বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। আইএমইডির প্রতিবেদনে যে সুপারিশ করা হয়েছে তা বাস্তবায়ন করা হবে।”

আইএমইডির অনুসন্ধানে ওয়াসার প্রকল্প বাস্তবায়নে আর্থিক অনিয়মসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতির বিষয়ে জানতে সিটিজেন জার্নালের পক্ষ থেকে প্রকল্প পরিচালক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম মুরাদের মুঠোফোনে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বেশ কয়েকবার কল করা হয়। এর মধ্যে শুধু একবার তিনি ফোন ধরে বলেন, ‘আমি একটি জানাজায় ছিলাম। এজন্য আপনার ফোনটি রিসিভ করতে পারিনি। আপনার সঙ্গে একটু পরে কথা বলব।’ এরপর কয়েক দফা কল দিলেও তিনি আর ধরেননি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোন নম্বরে খুদেবার্তা পাঠালেও সাড়া দেননি।

এ বিষয়ে জানতে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ড. মুহা. মনিরুজ্জামানের মুঠোফোনে কয়েকবার কল দিলেও তিনি ধরেননি। পরে তার মুঠোফোন নম্বরে খুদেবার্তা পাঠালেও সাড়া দেননি।

/বিবি/