‘তারকা হাসপাতাল’ স্কয়ারের ভবনেও এত অনিয়ম

‘তারকা হাসপাতাল’ স্কয়ারের ভবনেও এত অনিয়ম
গ্রাফিক্স: সিটিজেন জার্নাল

দেশের তারকা হাসপাতাল স্কয়ার। রাজধানীর পান্থপথে রাস্তার দুই পাশে তিনটি বহুতল ভবন নিয়ে চলছে কমবেশি ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালের কার্যক্রম। একটি ভবন ২০ তলা, অন্যটি ১৫। এছাড়া মূল ভবনের পাশেই কেএফসি ভবন হিসেবে পরিচিত আরেকটি ভবন হাসপাতালের কাজে ব্যবহার করছে স্কয়ার কর্তৃপক্ষ। অথচ হাসপাতাল হিসেবে ভবন তিনটির ব্যবহার অনুমোদন বা অকুপেন্সি সার্টিফিকেট নেই। সরকারি একটি সংস্থার তদন্তেও নকশা, ব্যবহার ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত একাধিক ব্যত্যয়ের চিত্র উঠে এসেছে।

বিস্ময়কর তথ্য হলো, হাসপাতালটির মূল স্থাপনার অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল হোটেল কাম বাণিজ্যিক ভবন হিসেবে। পরে তা আবেদনের মাধ্যমে সংশোধন করে আংশিক হাসপাতালের অনুমোদন নেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালিত হলেও ভবন ব্যবহারের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কেএফসি ভবনটি ইউনিয়ন ডেভেলপারের কাছ থেকে কিনে নেওয়ার পর সেখানে হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এই ভবনটিও হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহারের জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেয়নি। তবে স্কয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, সব বিধিমালা অনুসরণ করেই তারা হাসপাতালটির কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এদিকে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, স্বাস্থ্যসেবার জন্য নির্মিত ভবনের ক্ষেত্রে আলাদা বিল্ডিং কোড ও মানদণ্ড রয়েছে। বেসরকারি মেডিকেলগুলো তা না মেনেই বাণিজ্যিক ভবনে হাসপাতাল কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, হাসপাতালটির প্রধান দুটি ভবনের সেটব্যাক সংক্রান্ত বিধিবিধান অনুসরণে ব্যত্যয় রয়েছে। অর্থাৎ স্থাপনা নির্মাণের জন্য যে পরিমাণ ফাঁকা জায়গা রাখতে হয় তা রাখা হয়নি। হাসপাতালটির মূল ভবনের ভয়েড স্পেসের ক্ষেত্রেও নিয়ম মানা হয়নি। জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়ার জন্য নির্ধারিত ফায়ার ডোরেও রয়েছে প্রতিবন্ধকতা। ছাদে স্থাপন করা হয়েছে অতিরিক্ত ভারী যন্ত্রপাতি ও কাঠামো, যা ভবনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। রোগীদের ওঠানামার জন্য নির্মিত র্যাম্পের মান নিয়েও রয়েছে অসন্তোষ। একটি ভবনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নেই নির্ধারিত পার্কিংয়ের ব্যবস্থা।

সম্প্রতি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আট তলা থেকে ভয়েড দিয়ে পড়ে এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনার পর স্কয়ার হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানে এমন নিরাপত্তাজনিত ত্রুটির বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ বলছেন, রোগীদের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এমন অনিয়ম রেখে হাসপাতাল কার্যক্রম পরিচালনার কোনো সুযোগ নেই।

নথিপত্র পর্যালোচনায় জানা গেছে, পান্থপথের রাস্তার এক পাশে অবস্থিত ২০ তলা ভবনটি নির্মাণের জন্য ১৯৯৭ সালে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুমোদন নেওয়া হয়। ভবনটির অনুমোদন ছিল বাণিজ্যিক ও হোটেল ক্যাটাগরিতে। অন্যদিকে রাস্তার অপর পাশে অবস্থিত ১৫ তলা ভবনটি নির্মাণের অনুমোদন নেওয়া হয় ২০০৫ সালে। এটির অনুমোদন ছিল বাণিজ্যিক কাম আবাসিক ক্যাটাগরিতে। তবে ভবনগুলো ব্যবহারের আগে ইমারত বিধিমালা মতে প্রয়োজনীয় ‘ব্যবহার অনুমোদন’ নেওয়া হয়নি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দেশের বড় একটি হাসপাতাল হওয়া সত্ত্বেও নকশা ও ব্যবহারসংক্রান্ত বিধিবিধানের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে স্কয়ার। প্রায় ২০ বছর ধরে হাসপাতালটির কার্যক্রম পরিচালিত হলেও এখন পর্যন্ত ভবন ব্যবহারের অনুমোদন বা অকুপেন্সি সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন পর্যন্ত করেনি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮ অনুযায়ী, হাসপাতাল হিসেবে ভবন ব্যবহার করতে রাজউকের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। ২০২৫ সালে সংশোধিত বিধিমালায় অনুমোদন ছাড়া ভবন ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিধান রাখা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতাল কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক বা আবাসিক ভবন নয়। হাসপাতালের নকশা ও নির্মাণের ক্ষেত্রে রোগীর নিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন, অগ্নিনিরাপত্তা, বিশেষায়িত র্যাম্প এবং ভবনের কাঠামোগত সক্ষমতার মতো বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। কারণ, হাসপাতালের রোগীদের বড় একটি অংশ শারীরিকভাবে অসুস্থ এবং অনেকেরই স্বাভাবিকভাবে চলাচলের সক্ষমতা থাকে না। ফলে সাধারণ বাণিজ্যিক বা আবাসিক ভবনকে হাসপাতালে রূপান্তর করলেই সেটি হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবার জন্য নির্মিত ভবনের ক্ষেত্রে আলাদা বিল্ডিং কোড ও মানদণ্ড রয়েছে। এসব ভবনের জন্য বিশেষায়িত নকশা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলো এ বিষয়টি মানছে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাণিজ্যিক বা আবাসিক ভবনকে হাসপাতালে রূপান্তর করা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘স্বানামধন্য হাসপাতালগুলোর ক্রেডিবিলিটি বেশি। এই ধরনের হাসপাতালগুলোর বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ করা উচিত। এক্ষেত্রে রাজউকেরও কিছু দায় রয়েছে, তারা যথাযথভাবে পরিদর্শন করতে পারছে না।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে স্কয়ার হাসপাতালের ম্যানেজমেন্ট সাপোর্ট সার্ভিসের প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ নুরুল আলম বলেন, ‘এই বিষয়ে আমি কথা বলতে ইচ্ছুক না। আপনি আমাদের ইঞ্জিনিয়ার সেকশনের লোকজনের সঙ্গে কথা বলুন।’

পরে স্কয়ার হাসপাতালের ইঞ্জিনিয়ার বিভাগের ইনচার্জ শাফিন মাশফুকুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগটি অস্বীকার করে সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বাংলাদেশের সব বিধিমালায় যা আছে তা অনুসরণ করেই স্কয়ার হাসপাতাল পরিচালনা করা হচ্ছে। স্কয়ার কোনো অনৈতিক কাজ করে না।’

এই প্রতিবেদক নিয়ম ভঙ্গের বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রশ্ন করলে এ কর্মকর্তা তা আমলে না নিয়ে ফোন কেটে দেন।

/এসএ/