শিরোনাম

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে খেলাপি ঋণের বোঝা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে খেলাপি ঋণের বোঝা
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক

প্রবাসীদের ভাগ্য পরিবর্তনে তাদের অর্থেই গড়ে তোলা প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক বেড়েছে। অতীতে রাজনৈতিক তদবির ও ঘুষের বিনিময়ে দেওয়া ঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকটির আর্থিক ক্ষতি ক্রমেই বাড়ছে।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের প্রায় ৬১ শতাংশ ঋণই খেলাপির খাতায় উঠেছে। ব্যাংকটির ১২২টি শাখার বেশির ভাগের খেলাপি ঋণের হার এখন ৭০ শতাংশের বেশি।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ বলছে, ২০১১ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রার শুরু থেকেই প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের নীতিনির্ধারকরা নানামুখী অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়েছিলেন। সেসময় কর্মকর্তা হিসেবে যাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছিল, তার বেশির ভাগ ছিলেন তৎকালীন ক্ষমতাসীন, বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিএম কয়েস সামি কোনো নিয়মনীতি না মেনেই এসব নিয়োগ দিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে মূল প্রভাবক ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম। প্রতিষ্ঠার দেড় দশক পরও এসবের প্রভাব থেকে বেরোতে পারেনি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক।

ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ব্যাংক পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকা ব্যক্তিরা পর্ষদের দায়িত্বে ছিলেন। ব্যাংকটির আইনে প্রথমে বলা ছিল, বিশেষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যাংকারদের চেয়ারম্যান বা গুরুত্বপূর্ণ পদে নেওয়া যাবে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে সেই নিয়ম বদলে ফেলা হলো।

ব্যাংকটির বিভিন্ন সেবা চালুর ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। যেমন অভিবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের জন্য ৪ ধরনের আমানত প্রকল্প চালু করে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে– ‘বঙ্গবন্ধু সঞ্চয়ী স্কিম’, ‘বঙ্গবন্ধু শিক্ষা সঞ্চয়ী স্কিম’ ও ‘বঙ্গবন্ধু ডাবল বেনিফিট সঞ্চয়ী স্কিম’। নামকরণে এমন রাজনৈতিক মনোভাবের প্রকাশ দেশের অন্য কোনো ব্যাংকে দেখা যায়নি।

প্রতিষ্ঠালগ্নে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত ছিলেন রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী। কিন্তু ব্যাংকটির কার্যক্রম শুরুর মাত্র ৬ মাসের মধ্যেই দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও নিয়োগ বাণিজ্য দেখে তিনি পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

ব্যাংকটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের আমলে তাদের প্রভাবশালী নেতাদের তদবির ও চাপের মুখে অনেক ঋণ বিতরণ করতে হয়েছে। সেসব ঋণ এখন আর আদায় হচ্ছে না। ঘুষের বিনিময়ে যেসব ঋণ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোরও হদিস নেই।

ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ব্যাংক পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকা ব্যক্তিরা পর্ষদের দায়িত্বে ছিলেন। ব্যাংকটির আইনে প্রথমে বলা ছিল, বিশেষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যাংকারদের চেয়ারম্যান বা গুরুত্বপূর্ণ পদে নেওয়া যাবে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে সেই নিয়ম বদলে ফেলা হলো। মন্ত্রণালয়ের সচিব পদাধিকারবলে এর চেয়ারম্যান হতে লাগলেন। ব্যাংকটির যে সম্ভাবনা ছিলো তা শুরুতেই শেষ হয়ে গেলো।

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক যাত্রা ২০১১ সালের ২০ এপ্রিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যাংকটির উদ্বোধন করেছিলেন। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মূলধনের ৯৫ শতাংশের জোগান এসেছে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে। বাকি ৫ শতাংশ মূলধন জোগান দিয়েছে সরকার। শুরুতে মাত্র ১০০ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে এর মূলধন ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

বিদেশগামী প্রত্যেক কর্মীকে বাধ্যতামূলকভাবে কল্যাণ ফি দিতে হয়। এই ফি সরাসরি ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তহবিলে জমা হয়। প্রবাসীদের জমা দেয়া এ অর্থ থেকেই প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মূলধন জোগান দেয়া হয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ জুলাই পর্যন্ত ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ৩ হাজার ২২৩ কোটি টাকা। মোট ১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৭২ গ্রাহকের মাঝে এ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা ছিল খেলাপি। সেই হিসাবে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়ায় ৬০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। বিতরণকৃত ঋণ আদায় না হওয়ায় বিশেষায়িত এ ব্যাংকটি লোকসানেও পড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংকটি নিট ৯৮ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে।

ব্যাংকটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের আমলে তাদের প্রভাবশালী নেতাদের তদবির ও চাপের মুখে অনেক ঋণ বিতরণ করতে হয়েছে। সেসব ঋণ এখন আর আদায় হচ্ছে না। ঘুষের বিনিময়ে যেসব ঋণ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোরও হদিস নেই। ঋণ নিয়ে বিদেশ গেলেও অনেক প্রবাসী কাজ না পেয়ে ফিরে এসেছেন। কেউ কেউ যথাসময়ে বিদেশে কাজ পাননি। এসব কারণে প্রবাসীদের দেওয়া ঋণ আদায় হচ্ছে না।

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওয়াহিদা বেগম বলেন, খেলাপি ঋণের মেয়াদ গণনার ক্ষেত্রে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের জন্য কিছু নীতি ছাড় ছিল। তফসিলি ব্যাংক হওয়ার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া নীতি ছাড়ের মেয়াদ গত ৩০ জুন শেষ হয়ে গেছে। এ কারণে জুলাইয়ে এসে খেলাপি ঋণ এতটা বেড়েছে। ৬১ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়ার তথ্যটি আগামী সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে দেখানো হবে। এ সময়ে আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নীতি ছাড়ের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করবো। গত ৩০ জুন খেলাপি ঋণের হার ছিল ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

জানা গেছে, বিশেষায়িত হিসেবে কার্যক্রম শুরু করলেও ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের তফসিলভুক্ত হয় প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে লেনদেন শুরু করার লাইসেন্স নেওয়া হলেও গত ৮ বছরে সেটি সম্ভব হয়নি। নিজস্ব কোর ব্যাংকিং সলিউশন না থাকায় ব্যাংকটির কার্যক্রম চলছে অন্য ব্যাংকের সহায়তায়। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের আন্তঃব্যাংক লেনদেন প্লাটফর্মেও যুক্ত হতে পারেনি ব্যাংকটি।

/এফসি/