এ যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা

এ যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা
মরিয়ম সেঁজুতি

রাজধানীর মালিবাগ কাঁচাবাজার। মাছের দোকানির সঙ্গে উচ্চস্বরে দরদাম করছেন সোনালীবাগ এলাকার মো. মাহবুবুর রহমান। সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। কিন্তু বাজার খরচ নির্ধারিত বাজেটের মধ্যেই রাখতে হবে। তাইতো কেনাকাটা করতে গিয়ে মাহবুবুরের বিক্রেতার সঙ্গে বাড়তি দর-কষাকষি। এক পর্যায়ে দাম ঠিক হওয়ার পর মাছ কিনে চলে আসেন মাহবুবুর।
মাস খরচের নির্ধারিত বাজেটের বিষয়টি মাথায় রেখেই মাছ কিনতে পেরে মাহবুবুর যখন একটা স্বস্তির শ্বাস ফেললেন, সিটিজেন জার্নালের এই প্রতিবেদক তখন তার মুখোমুখি। প্রশ্ন করা হলো নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে। মুহূর্তেই মাহবুবুরের মুখটা আবার কঠিন হয়ে গেল। মাছ কেনার যে স্বস্তির ভাবটা ফুটে উঠেছিল, সেটা উধাও। সেখানে ভর করেছে অন্যরকম এক হতাশা। মুখটা অন্ধকার করে ছোট্ট করে উত্তর দিলেন, ‘সবকিছুর দাম বাড়ছে। কোনো কিছুর দাম একবার বাড়লে আর কমে না।’ তিনি বলে চলেন, ‘বাজারে এলে আয়ের সঙ্গে ব্যয় মেলাতে কষ্ট হয়। আগে এক হাজার টাকা নিয়ে এলে ব্যাগভর্তি বাজার করা যেতো। এখন সেটা সম্ভব নয়। একই বাজারের জন্য অনেক টাকা লাগছে। কিন্তু আয় বাড়েনি।’
বাংলাদেশে যখন আরেকটি জাতীয় বাজেট ঘোষণা দেওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে, তখন আয়-ব্যয়ের সমীকরণ মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। জীবনধারণে স্বস্তি ফেরানোর উপায় খুঁজছেন তারা। অবস্থা যখন এমন নাজুক তখন আসন্ন বাজেটে ধান, চাল, গম, ডাল, আলু. পেঁয়াজসহ প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের ওপর বাড়তি কর বসানোর প্রস্তাব দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী সিটিজেন জার্নালকে বলেছেন, জনগণের প্রত্যাশা বেশি। তাই বাজেটে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা না বাড়িয়ে বড় ব্যয় কাঠামো ধরে রাখা হলে ভবিষ্যতে ঋণনির্ভরতা বাড়বে।
জানা যায়, আসছে বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলেও ঠিকই সাধারণ মানুষের ঘাড়ে করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার আয়োজন করেছে এনবিআর। আর তা করতে গিয়ে নিত্যপণ্যেই বসানো হচ্ছে বাড়তি কর। বাজেটে নিত্যপণ্যের স্থানীয় ঋণপত্রের কমিশনের ওপর উৎসে কর বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হচ্ছে।
রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি ও কর ফাঁকি রোধের নানামুখী উদ্যোগের অংশ হিসেবে চাল, ডাল, ফলসহ ২৮টি নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষি ও খাদ্যপণ্যের স্থানীয় সরবরাহের ওপর উৎসে কর ০.৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার পরিকল্পনা করছে এনবিআর।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এই প্রস্তাবে বহুল ব্যবহৃত বেশ কিছু পণ্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ তালিকায় চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মটরশুঁটি, ছোলা, মসুর ডাল, আদা, হলুদ, শুকনা মরিচ, ডাল, ভুট্টা, আটা, ময়দা, লবণ, ভোজ্য তেল, চিনি, গোলমরিচ, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, খেজুর, তেজপাতা ও সব ধরনের ফল আছে।

এ ছাড়া ভোগ্যপণ্যের বিভিন্ন খাতেও শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাস্তা, ফলের রস, আইসক্রিম, কার্বনেটেড পানীয়, প্রসাধনী, সিগারেট-বিড়ি এবং জর্দা-গুলের মতো পণ্যে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হতে পারে। পাশাপাশি এমএস প্রোডাক্ট, রেড সিড অয়েল, কোলজা সিডস অয়েল ও কেনোলা অয়েলের ওপরও ভ্যাট বৃদ্ধির আলোচনা চলছে।
অন্যদিকে উপজেলা পর্যায়ের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ভ্যাট কাঠামোর আওতায় আনতে নতুনভাবে ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ চালুর চিন্তা করছে সরকার। বিশেষ করে মুদি দোকানদারসহ যেসব ব্যবসায়ী টার্নওভার (এক বছরের মোট আয়) সীমার কারণে এখনো ভ্যাট নিবন্ধনের বাইরে আছেন, তাদের মাসে এক হাজার টাকা বা বছরে ১২ হাজার টাকা হারে ভ্যাট দিতে হতে পারে। তবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
উৎসে কর বৃদ্ধির এই প্রস্তাব আসন্ন বাজেট বিষয়ক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে উপস্থাপন করা হবে। প্রস্তাব অনুমোদিত হলে জাতীয় বাজেটে তা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
এদিকে বাজেটে বাড়তি করের বোঝা সাধারণ মানুষের ঘাড়ে না চাপানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বাজেট প্রণয়নে যুক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে দিনভর বৈঠকে এসব নির্দেশনা দিয়েছেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সহায়ক বাজেট করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
দ্রব্যমূল্যে স্বস্তি চায় মানুষ
সারা দেশে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। সবজি, ডিম, ব্রয়লার মুরগি, পেঁয়াজ, চিনি, ডাল ও সয়াবিন তেলের দামে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের ওপর।
অসময়ের ভারী বৃষ্টি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়াকে দাম বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন ব্যবসায়ীরা। টানা মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ। বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
নতুন করে কর আরোপের প্রস্তাবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে জীবনযাত্রায় কী প্রভাব পড়তে পারে-সে বিষয়ে মতিঝিল এজিবি কলোনি বাজার, খিলগাও কাঁচা বাজারে আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। তাদের সবার একই ভাষ্য, নিত্যপণ্যে কর বসালে সংসার চালাতে ভীষণ কষ্ট হবে।
বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আগে ৫০০ টাকায় যে বাজার হতো, এখন একই বাজার ৭০০ টাকাও হয় না। প্রতিদিনই কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়ছে। এতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে নতুন করে জিনিসপত্রের ওপর কর বসালে তা আগুনে ঘি ঢালার মতো অবস্থা হবে।’
বাজারের একজন সবজি বিক্রেতা বললেন, ‘দাম বৃদ্ধির কারণে বিক্রি কম হচ্ছে। এতে তাদের লাভও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। ঋণ করে দোকানে মাল ওঠাতে হচ্ছে। কিন্তু সেই ঋণ শোধ করতে পারছি না।’

রাজধানীর মালিবাগ কাঁচাবাজার। মাছের দোকানির সঙ্গে উচ্চস্বরে দরদাম করছেন সোনালীবাগ এলাকার মো. মাহবুবুর রহমান। সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। কিন্তু বাজার খরচ নির্ধারিত বাজেটের মধ্যেই রাখতে হবে। তাইতো কেনাকাটা করতে গিয়ে মাহবুবুরের বিক্রেতার সঙ্গে বাড়তি দর-কষাকষি। এক পর্যায়ে দাম ঠিক হওয়ার পর মাছ কিনে চলে আসেন মাহবুবুর।
মাস খরচের নির্ধারিত বাজেটের বিষয়টি মাথায় রেখেই মাছ কিনতে পেরে মাহবুবুর যখন একটা স্বস্তির শ্বাস ফেললেন, সিটিজেন জার্নালের এই প্রতিবেদক তখন তার মুখোমুখি। প্রশ্ন করা হলো নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে। মুহূর্তেই মাহবুবুরের মুখটা আবার কঠিন হয়ে গেল। মাছ কেনার যে স্বস্তির ভাবটা ফুটে উঠেছিল, সেটা উধাও। সেখানে ভর করেছে অন্যরকম এক হতাশা। মুখটা অন্ধকার করে ছোট্ট করে উত্তর দিলেন, ‘সবকিছুর দাম বাড়ছে। কোনো কিছুর দাম একবার বাড়লে আর কমে না।’ তিনি বলে চলেন, ‘বাজারে এলে আয়ের সঙ্গে ব্যয় মেলাতে কষ্ট হয়। আগে এক হাজার টাকা নিয়ে এলে ব্যাগভর্তি বাজার করা যেতো। এখন সেটা সম্ভব নয়। একই বাজারের জন্য অনেক টাকা লাগছে। কিন্তু আয় বাড়েনি।’
বাংলাদেশে যখন আরেকটি জাতীয় বাজেট ঘোষণা দেওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে, তখন আয়-ব্যয়ের সমীকরণ মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। জীবনধারণে স্বস্তি ফেরানোর উপায় খুঁজছেন তারা। অবস্থা যখন এমন নাজুক তখন আসন্ন বাজেটে ধান, চাল, গম, ডাল, আলু. পেঁয়াজসহ প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের ওপর বাড়তি কর বসানোর প্রস্তাব দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী সিটিজেন জার্নালকে বলেছেন, জনগণের প্রত্যাশা বেশি। তাই বাজেটে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা না বাড়িয়ে বড় ব্যয় কাঠামো ধরে রাখা হলে ভবিষ্যতে ঋণনির্ভরতা বাড়বে।
জানা যায়, আসছে বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলেও ঠিকই সাধারণ মানুষের ঘাড়ে করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার আয়োজন করেছে এনবিআর। আর তা করতে গিয়ে নিত্যপণ্যেই বসানো হচ্ছে বাড়তি কর। বাজেটে নিত্যপণ্যের স্থানীয় ঋণপত্রের কমিশনের ওপর উৎসে কর বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হচ্ছে।
রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি ও কর ফাঁকি রোধের নানামুখী উদ্যোগের অংশ হিসেবে চাল, ডাল, ফলসহ ২৮টি নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষি ও খাদ্যপণ্যের স্থানীয় সরবরাহের ওপর উৎসে কর ০.৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার পরিকল্পনা করছে এনবিআর।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এই প্রস্তাবে বহুল ব্যবহৃত বেশ কিছু পণ্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ তালিকায় চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মটরশুঁটি, ছোলা, মসুর ডাল, আদা, হলুদ, শুকনা মরিচ, ডাল, ভুট্টা, আটা, ময়দা, লবণ, ভোজ্য তেল, চিনি, গোলমরিচ, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, খেজুর, তেজপাতা ও সব ধরনের ফল আছে।

এ ছাড়া ভোগ্যপণ্যের বিভিন্ন খাতেও শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাস্তা, ফলের রস, আইসক্রিম, কার্বনেটেড পানীয়, প্রসাধনী, সিগারেট-বিড়ি এবং জর্দা-গুলের মতো পণ্যে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হতে পারে। পাশাপাশি এমএস প্রোডাক্ট, রেড সিড অয়েল, কোলজা সিডস অয়েল ও কেনোলা অয়েলের ওপরও ভ্যাট বৃদ্ধির আলোচনা চলছে।
অন্যদিকে উপজেলা পর্যায়ের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ভ্যাট কাঠামোর আওতায় আনতে নতুনভাবে ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ চালুর চিন্তা করছে সরকার। বিশেষ করে মুদি দোকানদারসহ যেসব ব্যবসায়ী টার্নওভার (এক বছরের মোট আয়) সীমার কারণে এখনো ভ্যাট নিবন্ধনের বাইরে আছেন, তাদের মাসে এক হাজার টাকা বা বছরে ১২ হাজার টাকা হারে ভ্যাট দিতে হতে পারে। তবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
উৎসে কর বৃদ্ধির এই প্রস্তাব আসন্ন বাজেট বিষয়ক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে উপস্থাপন করা হবে। প্রস্তাব অনুমোদিত হলে জাতীয় বাজেটে তা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
এদিকে বাজেটে বাড়তি করের বোঝা সাধারণ মানুষের ঘাড়ে না চাপানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বাজেট প্রণয়নে যুক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে দিনভর বৈঠকে এসব নির্দেশনা দিয়েছেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সহায়ক বাজেট করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
দ্রব্যমূল্যে স্বস্তি চায় মানুষ
সারা দেশে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। সবজি, ডিম, ব্রয়লার মুরগি, পেঁয়াজ, চিনি, ডাল ও সয়াবিন তেলের দামে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের ওপর।
অসময়ের ভারী বৃষ্টি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়াকে দাম বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন ব্যবসায়ীরা। টানা মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ। বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
নতুন করে কর আরোপের প্রস্তাবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে জীবনযাত্রায় কী প্রভাব পড়তে পারে-সে বিষয়ে মতিঝিল এজিবি কলোনি বাজার, খিলগাও কাঁচা বাজারে আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। তাদের সবার একই ভাষ্য, নিত্যপণ্যে কর বসালে সংসার চালাতে ভীষণ কষ্ট হবে।
বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আগে ৫০০ টাকায় যে বাজার হতো, এখন একই বাজার ৭০০ টাকাও হয় না। প্রতিদিনই কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়ছে। এতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে নতুন করে জিনিসপত্রের ওপর কর বসালে তা আগুনে ঘি ঢালার মতো অবস্থা হবে।’
বাজারের একজন সবজি বিক্রেতা বললেন, ‘দাম বৃদ্ধির কারণে বিক্রি কম হচ্ছে। এতে তাদের লাভও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। ঋণ করে দোকানে মাল ওঠাতে হচ্ছে। কিন্তু সেই ঋণ শোধ করতে পারছি না।’

এ যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা
মরিয়ম সেঁজুতি

রাজধানীর মালিবাগ কাঁচাবাজার। মাছের দোকানির সঙ্গে উচ্চস্বরে দরদাম করছেন সোনালীবাগ এলাকার মো. মাহবুবুর রহমান। সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। কিন্তু বাজার খরচ নির্ধারিত বাজেটের মধ্যেই রাখতে হবে। তাইতো কেনাকাটা করতে গিয়ে মাহবুবুরের বিক্রেতার সঙ্গে বাড়তি দর-কষাকষি। এক পর্যায়ে দাম ঠিক হওয়ার পর মাছ কিনে চলে আসেন মাহবুবুর।
মাস খরচের নির্ধারিত বাজেটের বিষয়টি মাথায় রেখেই মাছ কিনতে পেরে মাহবুবুর যখন একটা স্বস্তির শ্বাস ফেললেন, সিটিজেন জার্নালের এই প্রতিবেদক তখন তার মুখোমুখি। প্রশ্ন করা হলো নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে। মুহূর্তেই মাহবুবুরের মুখটা আবার কঠিন হয়ে গেল। মাছ কেনার যে স্বস্তির ভাবটা ফুটে উঠেছিল, সেটা উধাও। সেখানে ভর করেছে অন্যরকম এক হতাশা। মুখটা অন্ধকার করে ছোট্ট করে উত্তর দিলেন, ‘সবকিছুর দাম বাড়ছে। কোনো কিছুর দাম একবার বাড়লে আর কমে না।’ তিনি বলে চলেন, ‘বাজারে এলে আয়ের সঙ্গে ব্যয় মেলাতে কষ্ট হয়। আগে এক হাজার টাকা নিয়ে এলে ব্যাগভর্তি বাজার করা যেতো। এখন সেটা সম্ভব নয়। একই বাজারের জন্য অনেক টাকা লাগছে। কিন্তু আয় বাড়েনি।’
বাংলাদেশে যখন আরেকটি জাতীয় বাজেট ঘোষণা দেওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে, তখন আয়-ব্যয়ের সমীকরণ মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। জীবনধারণে স্বস্তি ফেরানোর উপায় খুঁজছেন তারা। অবস্থা যখন এমন নাজুক তখন আসন্ন বাজেটে ধান, চাল, গম, ডাল, আলু. পেঁয়াজসহ প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের ওপর বাড়তি কর বসানোর প্রস্তাব দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী সিটিজেন জার্নালকে বলেছেন, জনগণের প্রত্যাশা বেশি। তাই বাজেটে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা না বাড়িয়ে বড় ব্যয় কাঠামো ধরে রাখা হলে ভবিষ্যতে ঋণনির্ভরতা বাড়বে।
জানা যায়, আসছে বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলেও ঠিকই সাধারণ মানুষের ঘাড়ে করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার আয়োজন করেছে এনবিআর। আর তা করতে গিয়ে নিত্যপণ্যেই বসানো হচ্ছে বাড়তি কর। বাজেটে নিত্যপণ্যের স্থানীয় ঋণপত্রের কমিশনের ওপর উৎসে কর বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হচ্ছে।
রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি ও কর ফাঁকি রোধের নানামুখী উদ্যোগের অংশ হিসেবে চাল, ডাল, ফলসহ ২৮টি নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষি ও খাদ্যপণ্যের স্থানীয় সরবরাহের ওপর উৎসে কর ০.৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার পরিকল্পনা করছে এনবিআর।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এই প্রস্তাবে বহুল ব্যবহৃত বেশ কিছু পণ্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ তালিকায় চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মটরশুঁটি, ছোলা, মসুর ডাল, আদা, হলুদ, শুকনা মরিচ, ডাল, ভুট্টা, আটা, ময়দা, লবণ, ভোজ্য তেল, চিনি, গোলমরিচ, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, খেজুর, তেজপাতা ও সব ধরনের ফল আছে।

এ ছাড়া ভোগ্যপণ্যের বিভিন্ন খাতেও শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাস্তা, ফলের রস, আইসক্রিম, কার্বনেটেড পানীয়, প্রসাধনী, সিগারেট-বিড়ি এবং জর্দা-গুলের মতো পণ্যে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হতে পারে। পাশাপাশি এমএস প্রোডাক্ট, রেড সিড অয়েল, কোলজা সিডস অয়েল ও কেনোলা অয়েলের ওপরও ভ্যাট বৃদ্ধির আলোচনা চলছে।
অন্যদিকে উপজেলা পর্যায়ের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ভ্যাট কাঠামোর আওতায় আনতে নতুনভাবে ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ চালুর চিন্তা করছে সরকার। বিশেষ করে মুদি দোকানদারসহ যেসব ব্যবসায়ী টার্নওভার (এক বছরের মোট আয়) সীমার কারণে এখনো ভ্যাট নিবন্ধনের বাইরে আছেন, তাদের মাসে এক হাজার টাকা বা বছরে ১২ হাজার টাকা হারে ভ্যাট দিতে হতে পারে। তবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
উৎসে কর বৃদ্ধির এই প্রস্তাব আসন্ন বাজেট বিষয়ক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে উপস্থাপন করা হবে। প্রস্তাব অনুমোদিত হলে জাতীয় বাজেটে তা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
এদিকে বাজেটে বাড়তি করের বোঝা সাধারণ মানুষের ঘাড়ে না চাপানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বাজেট প্রণয়নে যুক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে দিনভর বৈঠকে এসব নির্দেশনা দিয়েছেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সহায়ক বাজেট করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
দ্রব্যমূল্যে স্বস্তি চায় মানুষ
সারা দেশে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। সবজি, ডিম, ব্রয়লার মুরগি, পেঁয়াজ, চিনি, ডাল ও সয়াবিন তেলের দামে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের ওপর।
অসময়ের ভারী বৃষ্টি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়াকে দাম বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন ব্যবসায়ীরা। টানা মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ। বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
নতুন করে কর আরোপের প্রস্তাবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে জীবনযাত্রায় কী প্রভাব পড়তে পারে-সে বিষয়ে মতিঝিল এজিবি কলোনি বাজার, খিলগাও কাঁচা বাজারে আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। তাদের সবার একই ভাষ্য, নিত্যপণ্যে কর বসালে সংসার চালাতে ভীষণ কষ্ট হবে।
বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আগে ৫০০ টাকায় যে বাজার হতো, এখন একই বাজার ৭০০ টাকাও হয় না। প্রতিদিনই কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়ছে। এতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে নতুন করে জিনিসপত্রের ওপর কর বসালে তা আগুনে ঘি ঢালার মতো অবস্থা হবে।’
বাজারের একজন সবজি বিক্রেতা বললেন, ‘দাম বৃদ্ধির কারণে বিক্রি কম হচ্ছে। এতে তাদের লাভও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। ঋণ করে দোকানে মাল ওঠাতে হচ্ছে। কিন্তু সেই ঋণ শোধ করতে পারছি না।’




