শিরোনাম

রাজস্ব ঘাটতি ছাড়ালো এক লাখ কোটি টাকা

সিটিজেন ডেস্ক
রাজস্ব ঘাটতি ছাড়ালো এক লাখ কোটি টাকা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এর রাজস্ব ভবন। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

দেশের অর্থনৈতিক শ্লথগতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতার প্রভাবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক-কর আদায়ে এবার সবচেয়ে বড় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রম করেছে। এ পরিস্থিতি রাষ্ট্রীয় ব্যয় নির্বাহ ও নতুন সরকারের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম দশ মাসের (জুলাই-এপ্রিল) হালনাগাদ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এনবিআরের শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। এ সময়ে রাজস্ব আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা, যার বিপরীতে আদায় সম্ভব হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা। খাতভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও আয়কর এর কোনোটিতেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে আয়কর খাতে, যেখানে ঘাটতি প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া ভ্যাট ও আমদানি শুল্ক খাতে ঘাটতি যথাক্রমে ৩৫ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা এবং ২৫ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সদ্য সমাপ্ত নির্বাচন কেন্দ্রিক রাজনৈতিক উত্তরণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য আশানুরূপ গতি না পাওয়ায় এ বিশাল রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতির স্থবিরতা কাটাতে সরকার ইতোমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বড় প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে। এ তহবিলের আওতায় উদ্যোক্তারা ৭ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা পাবেন এবং বাকি ৬ শতাংশ সুদ সরকার ভর্তুকি হিসেবে বহন করবে। তবে এ প্রণোদনার পাশাপাশি এনবিআরকে চলতি মে ও জুন মাসের মধ্যে সংশোধিত বাজেটের ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা আদায় করতে হবে। যার অর্থ, প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা আদায়ের কঠিন এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সংস্থাটি। রাজস্ব আদায়ে এমন বিশাল ঘাটতির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সরকারের ব্যয়ে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং দেশি-বিদেশি ঋণের সুদের মতো অপরিহার্য ব্যয় কমানোর সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অর্থায়নে কাটছাঁট করতে হচ্ছে। এর ফলে চলতি অর্থবছরের ২ লাখ কোটি টাকার এডিপি বাস্তবায়ন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এমনিতেই বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে নেমে এসেছে, যা দীর্ঘমেয়াদী সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য যথেষ্ট উদ্বেগজনক।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই পুরনো কাঠামোর রাজস্ব প্রশাসন দিয়ে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব বলে সতর্ক করে আসছেন। অতীতে রাজস্ব খাত সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করলেও তৎকালীন বিএনপি সরকার তা সংসদে বিল আকারে পাস না করায় সেটি কার্যকারিতা হারায়। তবে বর্তমান সরকার নতুন করে সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং এরই অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজস্ব প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়ানো, দুর্নীতি ও কর ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং করজালের বাইরে থাকা নাগরিকদের করের আওতায় আনার মতো কাঠামোগত সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন ছাড়া এ বিশাল ঘাটতি মোকাবিলা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

/এমএকে/