শিরোনাম

ভ্যাট জাল বিস্তারে মেগা প্ল্যান, টার্গেট ২০ লাখ প্রতিষ্ঠান

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
ভ্যাট জাল বিস্তারে মেগা প্ল্যান, টার্গেট ২০ লাখ প্রতিষ্ঠান
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এর রাজস্ব ভবন। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে সরকার। নির্বাচনি ইশতেহারের বাস্তবায়ন, উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা বলয় সম্প্রসারণের কারণে বিগত বছরের তুলনায় বাজেটের আকার বাড়ছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। তবে এ বিপুল অর্থের জোগান নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশজুড়ে ছোট-বড় সব ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আনতে এবং করজাল সম্প্রসারণে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে এই নতুন বাজেট উপস্থাপন করা হতে পারে।

এনবিআরের নতুন পরিকল্পনা:

১.এক বছরের মধ্যে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা পৌনে ৮ লাখ থেকে বাড়িয়ে ২০ লাখে উন্নীত করা।

২.ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ন্যূনতম ১,০০০ টাকার ভ্যাট চালুর চিন্তা।

৩.মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে শুধু ভ্যাট থেকেই আসবে ৩ লাখ কোটি টাকা।

৪.৩,৫০০ সিসির বেশি গাড়ির অগ্রিম আয়কর ২ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করার পরিকল্পনা।

বণিক সমিতিগুলোর কাছে তালিকা তলব

রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়াতে দেশের ৪৬৫টি ব্যবসায়ী ও বাণিজ্য সংগঠনের কাছে সদস্য প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ তালিকা চেয়ে ইতোমধ্যে চিঠি পাঠিয়েছে এনবিআর। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা এ তালিকা ধরে যাচাই-বাছাই করবেন এবং যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে, তাদের বাধ্যতামূলকভাবে ভ্যাটের আওতায় আনা হবে। তবে এ উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, দেশে দোকানের সংখ্যা কোটির ওপরে হলেও সংগঠনের সদস্য সংখ্যা খুবই কম। তাই শুধুমাত্র সংগঠনের তালিকা ধরে কর আরোপ যৌক্তিক নয়। ব্যবসায়ীরা যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

ফিরছে ‘সুনির্দিষ্ট ভ্যাট’ ও সহজীকরণ ব্যবস্থা

এনবিআরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বাজেটে নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও সহজ করা হবে যাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে সহজেই ভ্যাট পরিশোধ করতে পারেন। সিটি করপোরেশন, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ বিবেচনা করে ভ্যাট নির্ধারণ করা হবে। যাদের বার্ষিক টার্নওভার ৫০ লাখ টাকার নিচে, তাদের জন্য থাকবে আলাদা কাঠামো। তবে অতীতে ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ কাঠামো পুরোপুরি সফল না হওয়ায়, এবারের ‘সুনির্দিষ্ট ভ্যাট’ ব্যবস্থা নিয়ে কিছু মহলে সংশয় রয়েছে। এ দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে এনবিআর ইতোমধ্যে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। সম্প্রতি এক বাজেট সংলাপে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে ভ্যাটের আওতায় আনাই সরকারের লক্ষ্য। কেউ ভ্যাট ফাঁকির তথ্য দিলে তাকে পুরস্কৃত করার ব্যবস্থাও রাখা হবে।

বিলাসবহুল গাড়ি ও ব্যাংক লেনদেনে কঠোর নজরদারি

রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলায় শুধু ভ্যাট নয়, কর ফাঁকি রোধে অন্য খাতের ওপরও কঠোর হচ্ছে এনবিআর। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) সম্প্রতি ৫ হাজারের বেশি বিলাসবহুল গাড়ির নথি যাচাই করে দেখেছে, ১ হাজারের বেশি গাড়ির মালিক তথ্য গোপন করেছেন। এর মধ্যে টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার, বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ বেঞ্জ, পোরশে ও রোলস রয়েসের মতো গাড়িও রয়েছে। আগামী বাজেটে ৩,৫০০ সিসির বেশি গাড়ির অগ্রিম আয়কর বাড়ানোসহ একাধিক গাড়ি থাকলে করের পরিমাণ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি, বড় কোম্পানির ডিলার ও পরিবেশকদের ব্যাংক লেনদেনের ওপর নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে এনবিআরের তথ্য ব্যবস্থা একীভূত (ইনটিগ্রেশন) করা হচ্ছে, যার ফলে করদাতাদের ব্যাংক লেনদেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর রিটার্নে যুক্ত হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এ নজরদারি সাধারণ সঞ্চয়কারী বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর যেন নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে।

ব্যবসায়ীদের দাবি ও কর রেয়াত ব্যবস্থা

ব্যবসায়িক পরিবেশ স্থিতিশীল রাখতে ৫ বছরের জন্য একটি পূর্বাভাসযোগ্য কর কাঠামো ঘোষণার চিন্তাভাবনা করছে সরকার। ভালো খবরও থাকছে করদাতাদের জন্য। আগামী বাজেটে আয়কর ফেরত ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী ১২০ দিনের মধ্যে ফেরত আবেদন নিষ্পত্তি এবং অনুমোদনের ৬০ দিনের মধ্যে অর্থ ফেরত দিতে হবে। এছাড়া নির্ধারিত সময়ের আগে রিটার্ন জমা দিলে কর ছাড় বা প্রণোদনার ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে। ডিজিটাল কর ব্যবস্থা, বিলাসী কর বৃদ্ধি এবং মাঠপর্যায়ে করজাল বিস্তারের এ ত্রিমুখী নীতি শেষ পর্যন্ত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কতটা সফল হয়, তা দেখার জন্য এখন চোখ রাখতে হবে আগামী ১১ জুনের বাজেট অধিবেশনের দিকে।

/এমএকে/