শিরোনাম

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য কমেছে ৮ শতাংশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য কমেছে ৮ শতাংশ
ভোমরা স্থলবন্দরে পণ্যবাহী ট্রাক

গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্কে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দেশের মোট পণ্যবাণিজ্য কমেছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। বাণিজ্য হ্রাসের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রধান কয়েকটি স্থলবন্দরেও রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি দেখা গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপড়েন, আমদানি-রপ্তানিতে বিভিন্ন বিধিনিষেধ এবং সীমান্তবাণিজ্যে বাধার প্রভাব পড়েছে দুই দেশের বাণিজ্যে।

ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ-ভারতের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৪৯ কোটি ৩ লাখ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৩৬ কোটি ৭৫ লাখ ৫০ হাজার ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার ১২১ কোটি টাকা।

বাণিজ্য কমার প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট দেশের স্থলবন্দরগুলোতে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে ভারত থেকে ১৪ লাখ ২ হাজার ১৪৪ টন পণ্য এসেছে। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০৯ টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি কমেছে প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার টন।

আমদানি কমার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমেছে রাজস্ব আদায়ও। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টম হাউজের সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। বিপরীতে বছর শেষে আদায় হয়েছে ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৭ হাজার ২৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

একই চিত্র দেখা গেছে সাতক্ষীরার ভোমরা ও দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরেও। ভোমরায় ২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা লক্ষ্যের বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ হাজার ১১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘাটতি ৯৫০ কোটি টাকার বেশি। আর হিলিতে ১ হাজার ৪৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা লক্ষ্যের বিপরীতে আদায় হয়েছে ৫৯৭ কোটি ৯ লাখ টাকা। সেখানে ঘাটতি হয়েছে ৪৪৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।

ভারতের পরিসংখ্যানেও বাণিজ্য কমার বিষয়টি স্পষ্ট। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশে পণ্য আমদানি হয়েছে ১ হাজার ১৪৮ কোটি ৫২ লাখ ৬০ হাজার ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ১ হাজার ৫৮ কোটি ৭৩ লাখ ৮০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি ২০০ কোটি ৫০ লাখ ৪০ হাজার ডলার থেকে কমে ১৭৮ কোটি ১ লাখ ৭০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে।

ভারত থেকে আমদানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে তুলায়। গত অর্থবছরে তুলা আমদানি কমে ২৩০ কোটি ৪১ লাখ ২০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে উল্লেখযোগ্যভাবে খাদ্যশস্য আমদানি বেড়েছে। এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ। খনিজ জ্বালানি ও তেল আমদানিও বেড়েছে ৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ থেকে ভারতের বাজারে রপ্তানি হওয়া তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, জুতা ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। পোশাক ও আনুষঙ্গিক পণ্যের রপ্তানি কমেছে ১৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ। জুতা ও সংশ্লিষ্ট পণ্যে পতন হয়েছে ১৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব বাণিজ্যেও পড়েছে। সীমান্তে উত্তেজনা, ভিসা ও কনস্যুলার সেবা সীমিত হওয়া, ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল এবং নির্দিষ্ট পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে বিধিনিষেধ সব মিলিয়ে ব্যবসায়িক পরিবেশ কঠিন হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, দুই পক্ষের বাণিজ্যসংক্রান্ত বিধিনিষেধ পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি তৈরি করেছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়েছে বাণিজ্যে ।

তবে ভারতীয় হাইকমিশনের মতে, সাম্প্রতিক বাণিজ্য পতনকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে দেখতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা এখনো শক্তিশালী বলেই মনে করে ভারত। যোগাযোগব্যবস্থা, ভৌগোলিক নৈকট্য এবং দুই দেশের অর্থনীতির পারস্পরিক পরিপূরকতার কারণে বাণিজ্য পুনরুদ্ধারের সুযোগ রয়েছে বলে দাবি করেছে তারা।

এদিকে, বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে আলোচনা জোরদার হয়েছে। গত ২৪ আগস্ট বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠকে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা দূর করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

এর আগে, ভারতীয় ব্যবসায়ী সংগঠন সিআইআইয়ের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে অবকাঠামো, অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়াতে বিটুবি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেয় তারা।

ব্যবসায়ীদের মতে, রাজনৈতিক সম্পর্কের জটিলতা কাটিয়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক যোগাযোগকে সামনে এগিয়ে নেওয়া গেলে বাণিজ্যে আবারও গতি ফিরবে। কারণ প্রতিবেশী দুই দেশের অর্থনীতির পরস্পরের ওপর নির্ভরশীলতা এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী।

/এসবি/