শিরোনাম

ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তাদের ৪৫ কোটি টাকা ঋণ দেবে এসএমই ফাউন্ডেশন

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তাদের ৪৫ কোটি টাকা ঋণ দেবে এসএমই ফাউন্ডেশন
এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে কথা বলছেন শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির।

মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আরোও ৪৫ কোটি টাকার বেশি ঋণ দেবে এসএমই ফাউন্ডেশন। এসএমই ফাউন্ডেশনের রিভলভিং তহবিল থেকে ক্রেডিট হোলসেলিং কর্মসূচির আওতায় এই ঋণ বিতরণ করা হবে।

অর্থ বিভাগের নতুন পরামর্শ মোতাবেক এই ঋণের সুদের হার হবে মাত্র ৮%। পাশাপাশি বিদেশ থেকে ফেরত প্রবাসীদের উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরির লক্ষ্যে আন্তর্জতাকি শ্রম সংস্থা (আইএলও), বাংলাদেশের সহায়তায় কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করা হবে। এই ঋণের সুদের হার হবে মাত্র ৭ শতাংশ। একজন উদ্যোক্তা সর্বনিম্ন ১ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন। তবে কৃষিভিত্তিক শিল্প ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতের উদ্যোক্তাগণ শতকরা ৯ ভাগ সুদে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন। এ লক্ষ্যে ৩টি ব্যাংকের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এসএমই ফাউন্ডেশন।

মঙ্গলবার (১৬ জুন) রাতে রাজধানীর একটি হোটেলে এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেন অংশীদার ৩টি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীগণ।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক এবং কর্মসংস্থান ব্যাংক।

শিল্পসচিব আব্দুন নাসের খানের সভাপতিত্বে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ, আইএলও, বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টিউনন এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড-এর মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. আসাদুজ্জামান, বিসিক চেয়ারম্যন মো. সাইফুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নূরুন নাহার। স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে এসএমই ফাউন্ডেশনের ক্রেডিট হোলসেলিং কর্মসূচি সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন এসএমই ফাউন্ডেশনের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাজিম হাসান সাত্তার।

অনুষ্ঠানে শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, আজ আমরা এমন এক উদ্যোগের সূচনা করছি, যার মাধ্যমে রেমিট্যান্সকে উদ্যোক্তায়, উদ্যোক্তাকে বিনিয়োগে এবং বিনিয়োগকে কর্মসংস্থানে রূপান্তরের একটি টেকসই ভিত্তি নির্মাণ করা হবে। শিল্প মন্ত্রণালয় এসএমই ফাউন্ডেশনকে আরও শক্তিশালী, আধুনিক এবং গতিশীল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা চাই, দেশের প্রতিটি সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা, সে নারী হোক, যুবক হোক, প্রত্যাগত অভিবাসী হোক কিংবা জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের কোনো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হোক, সকলেই যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা ও অর্থায়নের সুযোগ পায়।

অনুষ্ঠানে এসএমই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অংশীদার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে জামানতবিহীন ঋণ বিতরণের বিষয়ে উৎসাহিত করা হবে। তবে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত কোন জামানত গ্রহণ করা হবেনা। গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা হবে সর্বোচ্চ ৪ বছর। গ্রাহক-ব্যাংক সম্পর্কের ভিত্তিতে ৬ মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ ৪৮টি মাসিক কিস্তিতে পরিশোধ করা যাবে। মোট ঋণের ২৫ শতাংশ নারী-উদ্যোক্তাদের মাঝে এবং ২০ শতাংশ এসএমই ক্লাস্টারের উদ্যোক্তাদের মাঝে বিতরণ করতে হবে। ন্যূনতম ৩০ শতাংশ তহবিল ১০ লক্ষ টাকা বা তদনিম্ন পরিমাণের ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে হবে। ন্যূনতম ৬০ শতাংশ উৎপাদনখাত সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের মাঝে বিতরণ করতে হবে, অবশিষ্ট তহবিল সেবা খাত ও ভ্যালু চেইন খাতে বিতরণ করতে হবে। তবে ভ্যালুচেইন খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ মোট ঋণের ২০ শতাংশের বেশি হবে না (ভ্যালুচেইন বলতে কোন খাত বা ক্লাস্টারের সঙ্গে জড়িত আনুষঙ্গিক ফরওয়ার্ড ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ব্যবসাকে বোঝাবে। উদাহরণস্বরুপ টেক্সটাইল খাতের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল যেমন; সুতা, রং, স্ক্রিন প্রিন্ট, প্যাকেজিং, খুচরা যন্ত্রাংশ বিক্রেতা, সরবরাহকারী এবং উৎপাদিত পণ্য পাইকারী ও খুচরা বিক্রেতা)।

ঋণ প্রাপ্তির খাতসমূহ হলো-

১. অগ্রাধিকারভুক্ত এসএমই সাব-সেক্টর, ক্লাস্টারের উদ্যোক্তা এবং ভ্যালু চেইনের আওতাভুক্ত উদ্যোক্তা;

২. রপ্তানিযোগ্য পণ্যসহ ‘আমদানি-বিকল্প পণ্যের’উৎপাদনে নিয়োজিত উদ্যোক্তা;

৩. আইসিটি ও প্রযুক্তিনির্ভর সৃজনশীল ব্যবসায়ে যুক্ত তরুণ/নতুন উদ্যোক্তা যারা এখনো ব্যাংক হতে ঋণ পাননি;

৪. সারা দেশের নারী-উদ্যোক্তা;

৫. পশ্চাদপদ অঞ্চল, উপজাতীয় অঞ্চল, শারীরিকভাবে অক্ষম এবং তৃতীয় লিঙ্গের উদ্যোক্তা;

৬. জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের উদ্যোক্তা, সবুজ প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগ এবং বিশেষ খাতভুক্ত উদ্যোক্তা;

৭. উৎপাদনশীল ও সেবা কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে আগ্রহী বিদেশ ফেরত অভিবাসী উদ্যোক্তা;

৮. দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত ট্রেডবডি, এসএমই অ্যাসোসিয়েশন, নারী-উদ্যোক্তা সংগঠন, নাসিব, উদ্যোক্তা উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সংস্থাসহ উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের সুপারিশকৃত উদ্যোক্তা।

ফাউন্ডেশন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিতরণ ও আদায় কার্যক্রম নিয়মিতভাবে মনিটরিং করবে। ঋণ বিতরণের পর এসএমই ফাউন্ডেশনের নিজস্ব পদ্ধতি ও লোকবল দ্বারা সরেজমিন পরিদর্শন করে চুক্তি অনুযায়ী এবং সঠিক উদ্যোক্তার অনুকূলে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে কিনা তা যাচাই ও নিশ্চিত করবে। তবে অনুৎপাদনশীল খাত যেমন, মুদি দোকান, ঔষধ বিক্রেতা, হার্ডওয়্যার বিক্রেতা এবং পরিবেশ দূষণ ঘটায় এমন ব্যবসার অনকূলে এ কর্মসূচির আওতায় ঋণ প্রদান করা যাবেনা।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে ক্রেডিট হোলসেলিং কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১৩ হাজার সিএমএসএমই উদ্যোক্তার মাঝে প্রায় ১২ শত ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করেছে এসএমই ফাউন্ডেশন।

উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা বলছে, দেশের প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৯৯ শতাংশ কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই)। শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে। এই খাতে প্রায় ৩ কোটিরও বেশি জনবল কর্মরত আছে। অধিক জনসংখ্যা এবং সীমিত সম্পদের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এসএমই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত সুরক্ষার মাধ্যমে এসএমই খাতের উন্নয়নের লক্ষ্যে এসএমই ফাউন্ডেশন সরকারের জাতীয় শিল্পনীতি, এসএমই নীতিমালা এবং এসডিজি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থা এসএমই ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন কর্মসূচির সুবিধাভোগী প্রায় ২২ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, যাদের ৬০ শতাংশ নারী-উদ্যোক্তা।

/এসবি/