শিরোনাম

বিনিয়োগ বাড়াতে সমন্বিত শিল্প ডেটাবেজ তৈরির উদ্যোগ

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
বিনিয়োগ বাড়াতে সমন্বিত শিল্প ডেটাবেজ তৈরির উদ্যোগ
প্রতীকী ছবি

দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নয়ন, বিনিয়োগকারীদের সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই করার লক্ষ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত শিল্প ডেটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) খুলনার সিটি ইন লিমিটেডে আয়োজিত এক বিভাগীয় কর্মশালায় এসব তথ্য জানানো হয়।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা)-এর নেতৃত্বে ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে এবং সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর কারিগরি সহায়তায় দেশব্যাপী ‘বাংলাদেশের শিল্প জরিপ’ পরিচালিত হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে আজ খুলনায় এই বিভাগীয় কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালায় খুলনা বিভাগের সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, শিল্পোদ্যোক্তা এবং স্থানীয় অংশীজনরা অংশ নেন।

বক্তারা দেশের প্রবৃদ্ধির ধারা সচল রাখতে খণ্ডিত তথ্যের ওপর নির্ভর না করে বাস্তবভিত্তিক নীতি প্রণয়ন এবং জেলা পর্যায়ে শিল্পায়ন ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

অনুষ্ঠানে সানেমের নির্বাহী পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান জরিপের বিস্তারিত পটভূমি তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশের বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত সমস্যাগুলো খুঁজে বের করা এবং তা সমাধানের পথ তৈরি করাই এই প্রকল্পের অন্যতম মূল উদ্দেশ্য। বর্তমানে বাংলাদেশে বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্যগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, যার ফলে একই তথ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি দেখা দেয়। এই সমস্যা দূর করতে বিডার নেতৃত্বে একটি সুসংগঠিত ও সমন্বিত ডেটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে। এটি সরকারের কার্যকর নীতি প্রণয়নে সরাসরি সাহায্য করবে। এই লক্ষ্য পূরণে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও বিনিয়োগকারীসহ সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

অনলাইনে যুক্ত হয়ে এডিবির বাংলাদেশের পাবলিক সেক্টর ইকোনমিস্ট তাসনিম আলম কর্মশালার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ আগামী তিন বছরের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে সফলভাবে উত্তরণ ঘটাতে যাচ্ছে। এই রূপান্তরকালীন সময়ে দেশের অর্থনীতিকে টেনে নিতে বেসরকারি খাতকে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। সে লক্ষ্যে দেশে নতুন বিনিয়োগকারী তৈরি এবং তাদের ওপর থাকা বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক চাপ কমানো জরুরি।

বিনিয়োগকারীদের কাজ সহজ করতে বিডার ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’-এর ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি দেশের সার্বিক প্রবৃদ্ধি, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, টেকসই প্রতিষ্ঠান ও জলবায়ু সহনশীলতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

আচিয়া সি ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তরিকুল ইসলাম জহির খুলনা অঞ্চলের শিল্প সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি এই অঞ্চলে পাট, চিনি, জাহাজ নির্মাণ এবং হিমাগার শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সুবিধার কথা উল্লেখ করেন। তবে দেশের অনেক শিল্পেই এখনও আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, দেশে অনেক ভালো নীতি থাকলেও বাস্তবায়নে বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে, যা খতিয়ে দেখা দরকার। বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশে ভোগ ও চাহিদা বাড়লেও জোগান কম থাকায় আরও বেশি শিল্প স্থাপন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশের ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি এই জরিপ উদ্যোগকে স্বাগত জানান।

প্রধান অতিথি খুলনা বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার সিফাত মেহনাজ তার পূর্বের জেলা প্রশাসক হিসেবে মেহেরপুর ও কুড়িগ্রামের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর হলেও সেখানে শিল্পের বিকাশ খুবই সীমিত। তাই সরকারের শিল্প সহায়তা কেবল বিভাগীয় শহর কেন্দ্রিক না রেখে জেলা ও তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া উচিত।

দেশের সীমিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষির আমূল পরিবর্তন সম্ভব।

সভাপতির বক্তব্যে বিডার মহাপরিচালক গাজী এ কে এম ফজলুল হক বলেন, তথ্যভিত্তিক সঠিক নীতিমালার অভাবে সরকার অনেক সময় খণ্ডিত তথ্যের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেয়। এই জরিপটি সম্পন্ন হলে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতির একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যাবে, যা সরকারকে সঠিক নীতি তৈরিতে এবং প্রকৃত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা নির্ধারণে সাহায্য করবে।

কারিগরি অধিবেশনে ড. সেলিম রায়হান এবং সানেমের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জুবায়ের হোসেন একটি যৌথ উপস্থাপনা দেন।

ড. রায়হান জানান, বাংলাদেশ বর্তমানে জ্বালানি, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে একটি সমন্বিত বিনিয়োগ তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি, যা বিডার ওয়ান স্টপ সার্ভিস পোর্টালের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

জরিপটি মূলত পাঁচটি মূল ধারায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। সেগুলো হলো– বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ, সংগৃহীত তথ্যের সত্যতা যাচাই, একটি আন্তর্জাতিক মানসম্মত ডেটাবেজ তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন ও পলিসি ব্রিফ প্রস্তুতকরণ, একটি সমৃদ্ধ জাতীয় বিনিয়োগ সংকলন প্রকাশ।

জুবায়ের হোসেন জানান, দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগের সমস্ত প্রধান অর্থনৈতিক খাত, সব ধরনের প্রতিষ্ঠান ও মালিকানাকে এই জরিপের আওতায় আনা হয়েছে। অংশীজনদের মতামত নেওয়ার জন্য পর্যায়ক্রমে প্রতিটি বিভাগেই এই ধরনের কর্মশালা আয়োজন করা হবে।

উন্মুক্ত আলোচনায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও অংশীজনরা তাদের নানা সমস্যার কথা খোলামেলাভাবে তুলে ধরেন।

অংশগ্রহণকারীরা সরকারি লাইসেন্স প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ভোগান্তি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং অপর্যাপ্ত ব্যাংকঋণের কথা উল্লেখ করেন। বিশেষ করে, ব্যাংকের উচ্চ সুদের হারের কারণে নতুন শিল্প চালুর ক্ষেত্রে চলতি মূলধন বা ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে উদ্যোক্তারা জানান। এছাড়া জামানতের জটিলতা ও আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাব দূর করার দাবি জানানো হয়।

আলোচনায় খুলনা অঞ্চলে সামুদ্রিক শৈবাল, মুক্তা চাষ, নারকেলের বর্জ্য থেকে তৈরি পিট, টমেটো, আম, মাশরুম ও পানের মতো অপ্রচলিত কিন্তু বিপুল সম্ভাবনাময় কৃষি-শিল্পের বিকাশে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার আহ্বান জানানো হয়।

/এফআর/