শিরোনাম

বিদেশি বিনিয়োগে বাংলাদেশ ঘানা-উগান্ডার চেয়ে পিছিয়ে

সিজেডএন  ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
বিদেশি বিনিয়োগে বাংলাদেশ ঘানা-উগান্ডার চেয়ে পিছিয়ে
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থার (আঙ্কটাড) লোগো

বাংলাদেশে ২০২৫ সালে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের তুলনায় এটি প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি। তবে এই প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশ এখনো ঘানা, উগান্ডা ও গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর মতো তুলনামূলক ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর চেয়েও পিছিয়ে রয়েছে।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা (আঙ্কটাড) প্রকাশিত বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রতিবেদন ২০২৬-এ এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বে মোট ১ হাজার ৬২৪ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৫০১ বিলিয়ন (১ বিলিয়ন সমান ১০০ কোটি) ডলার। বাংলাদেশের তুলনায় উগান্ডার অর্থনীতির আকার ৭ ভাগের ১ ভাগ। দেশটি গত বছর ৩ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই পেয়েছে। একইভাবে ঘানা ও কঙ্গো অর্থনীতির আকারে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক পিছিয়ে থেকেও বেশি বিনিয়োগ পাচ্ছে।

  • ভারত ৩৮.৮৯
  • ইন্দোনেশিয়া ২১.৪৪
  • ভিয়েতনাম ২০.৩৫
  • ইথিওপিয়া ৩.৭৯
  • উগান্ডা ৩.৩৬
  • ঘানা ১.৯১
  • ডিআর কঙ্গো ১.৮৭
  • বাংলাদেশ ১.৭৮

আঙ্কটাড বলছে, আফ্রিকার এসব দেশে জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদভিত্তিক বড় প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনো বিনিয়োগ টানতে হিমশিম খাচ্ছে। একই সময়ে ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এফডিআই পাওয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষ ৫ দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, হংকং, চীন ও ব্রাজিল। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র পেয়েছে ২৭৭ বিলিয়ন ডলার, সিঙ্গাপুর ১৫১ বিলিয়ন, হংকং ১১৬ বিলিয়ন, চীন ১০৫ বিলিয়ন এবং ব্রাজিল ৭৭ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশে ২০১৫ সালে সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল। এরপর তা আর সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। গত ৬ বছরের মধ্যে ২০২৪ সালে সবচেয়ে কম, ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই আসে। বিশ্লেষকদের মতে, ওই বছরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী অপেক্ষার অবস্থানে ছিলেন। ফলে বিনিয়োগ কমে যায়। সেই তুলনায় ২০২৫ সালে প্রবৃদ্ধি বেশি দেখা গেলেও বিনিয়োগের মোট পরিমাণ এখনো কম।

এই তিন দেশ ছাড়াও আফ্রিকার মোজাম্বিকে গত বছর ৫ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন, নাইজেরিয়ায় ৪, ইথিওপিয়ায় ৩ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন এবং কেনিয়ায় ৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই এসেছে।

বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে গত বছর ভারত ৩৯ বিলিয়ন, ইন্দোনেশিয়া ২১ বিলিয়ন, ভিয়েতনাম ২০ বিলিয়ন, কম্বোডিয়া ৫ বিলিয়ন এবং পাকিস্তান ১ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছে।

শুধু এফডিআই নয়, বাংলাদেশে নতুন বা গ্রিনফিল্ড বিনিয়োগও কমেছে। ২০২৪ সালে নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ ছিল ১৭৩ কোটি ডলার, যা ২০২৫ সালে প্রায় ২৩ শতাংশ কমে ১৩৩ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের বিদেশে বিনিয়োগ কিছুটা বেড়েছে। ২০২৪ সালে বিদেশে বিনিয়োগ ছিল ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার, ২০২৫ সালে তা বেড়ে আড়াই কোটি ডলারে পৌঁছেছে।

উগান্ডা, ঘানা ও কঙ্গোর সাফল্য

বাংলাদেশের চেয়ে এফডিআই প্রাপ্তিতে উগান্ডা, ঘানা ও ডি আর কঙ্গোর সাফল্যের পেছনে দেশগুলোর নীতি সংস্কার ভূমিকা রেখেছে।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘানার প্রেসিডেন্ট জন মাহামা গত বছরের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসার খরচ হ্রাস ও অভ্যন্তরীণ বাজার চাঙা করতে বেশ কিছু খাতে কর বাতিল করেন। উগান্ডা তাদের বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষকে ওয়ান স্টপ সেন্টারে (এক দরজায় সব সেবা) রূপান্তর করেছে। পাশাপাশি শিল্প পার্কগুলোতে বিশেষ সুবিধা দেয়। অন্যদিকে কঙ্গো অবকাঠামো, বিদ্যুৎ খাতের উদারীকরণ ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার মাধ্যমে বড় বিনিয়োগ টানছে।

এই তিন দেশ ছাড়াও আফ্রিকার মোজাম্বিকে গত বছর ৫ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন, নাইজেরিয়ায় ৪, ইথিওপিয়ায় ৩ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন এবং কেনিয়ায় ৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই এসেছে।


বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে উদ্যোগ নেয়। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেপ্টেম্বর মাসেই বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান হিসেবে আশিক চৌধুরীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। একইসঙ্গে তাকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যানও করা হয়। এর আগে তিনি সিঙ্গাপুরে বহুজাতিক দ্য হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশনের (এইচএসবিসি) রিয়েল অ্যাসেট ফাইন্যান্স বিভাগের সহযোগী পরিচালক পদে কর্মরত ছিলেন।

অনেক প্রত্যাশা নিয়ে আশিক চৌধুরীকে নিয়োগ দেওয়া হলেও কাজের কাজ খুব একটা হয়নি। গত অক্টোবরে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ব্যবসা পরিবেশ সূচক বা ক্লাইমেট ইনডেক্সে (বিবিএক্স) প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, আইনকানুনের তথ্য প্রাপ্তি, অবকাঠামোসুবিধা, শ্রম নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য সহজীকরণ, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ ও মান– এই ছয় সূচকে পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদহার, প্রায় ৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। যদিও চলতি অর্থবছরের বাজেটে বিভিন্ন খাতে কর ও শুল্ক ছাড়, ব্যবসা সহজীকরণ এবং বন্ধ কারখানা চালুর জন্য প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে সরকার। এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

/এফসি/