শিরোনাম

দুর্নীতির ‘প্রমাণ’ পেয়েও জনস্বাস্থ্যের প্রকৌশলীকে পুনর্বহাল, পেলেন ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের দায়িত্বও

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
দুর্নীতির ‘প্রমাণ’ পেয়েও জনস্বাস্থ্যের প্রকৌশলীকে পুনর্বহাল, 
পেলেন ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের দায়িত্বও
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তবিবুর রহমান তালুকদার। ফাইল ছবি

অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। গত ৯ এপ্রিলে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। কিন্তু ১২ দিন পর অপর একটি প্রজ্ঞাপনে তাকে সব ধরনের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে পুনর্বহাল করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। শুধু তাই নয়, তাকে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার দুটি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।

মাত্র ১২ দিন পর একই সচিবের স্বাক্ষরিত দুই প্রজ্ঞাপনে একই কর্মকর্তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে তদন্ত ও বিভাগীয় মামলা পরিচালনার প্রক্রিয়া নিয়েও উঠেছে অনেক প্রশ্ন।

দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা ও সামরিক বরখাস্ত

স্থানীয় সরকার বিভাগের নথি সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান স্বাক্ষরিত ৯ এপ্রিলের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকার বিভাগের গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্তে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। ওই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৩(খ) এবং ৩(ঘ) অনুসারে অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা সমীচীন হবে।

সে অনুযায়ী সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ এর ধারা-৩৯(১) ও সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি-১২ অনুযায়ী তবিবুর রহমানকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলো। বরখাস্তকালীন তাকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে সংযুক্ত রাখার কথাও বলা হয়।

১২ দিন পর ‘অভিযোগ প্রমাণিত নয়’ বলে নতুন প্রজ্ঞাপন

সাময়িক বরখাস্ত করার এই আদেশের মাত্র ১২ দিন পর ২২ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগ আরেকটি প্রজ্ঞাপন জারি করে তাকে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান সাক্ষরিত এই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, তবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভাগীয় মামলা নং ০১/২০২৬-এ সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) ও ৩(ঘ) অনুযায়ী আনা অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ ‘প্রমাণিত হয়নি’। ফলে তাকে পুনরায় দায়িত্বে বহাল করা হয় এবং বরখাস্তকালীন সময়কে কর্মকাল হিসেবে গণ্য করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তবে দ্বিতীয় প্রজ্ঞাপনে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ার কারণ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি। প্রথম তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে কী পাওয়া গিয়েছিল, পরবর্তী পর্যায়ে কী ধরনের তদন্ত বা শুনানি হয়েছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য কী ছিল কিংবা কোন নথি-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে-সেসব বিষয়ও প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট নয়। অল্প দিনের ব্যবধানে এক প্রজ্ঞাপন দুর্নীতির দায়ে এক কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার পর অপর এক প্রজ্ঞাপনে তাকে ভালো কর্মকর্তা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টার বিষয়টি অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক মনে হয়েছে।

চাকরির সঙ্গে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে দুই প্রকল্পের দায়িত্ব

দ্বিতীয় প্রজ্ঞাপনে তবিবুর রহমানকে পুনর্বহালের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যে দুটি প্রকল্পের দায়িত্বে তিনি ছিলেন, সেগুলোর পিডি হিসেবেও তাকে পুনর্বহাল করা হয়েছে।

প্রকল্প দুটির মধ্যে একটি ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি (১ম সংশোধিত)’ প্রকল্প। প্রকল্পটির প্রাথমিক অনুমোদিত ব্যয় ছিল প্রায় ১ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকা। প্রকল্পটি দেশের বিভিন্ন জেলার গ্রামীণ এলাকায় পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি উন্নয়নের জন্য নেওয়া হয়।

অন্যদিকে ‘গ্রামীণ স্যানিটেশন’ প্রকল্পটিও বড় আকারের। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, নতুন গ্রামীণ স্যানিটেশন প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকার বৈদেশিক অর্থায়নের ব্যবস্থা রয়েছে।

প্রকল্পের বাস্তবায়নের অনিয়ম নিয়ে অতীতেও বিতর্ক

তবিবুর রহমানের দায়িত্বে থাকা গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়েও এর আগে প্রশ্ন উঠেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) মূল্যায়নের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রকল্পের আওতায় নির্মিত বিভিন্ন অবকাঠামোর নিম্নমান, ব্যবহার অনুপযোগিতা, নকশা অনুসরণ না করা এবং নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের মতো অভিযোগের কথা ওঠে আসে। বিভিন্ন এলাকায় নির্মিত গণশৌচাগার ও পানি সরবরাহ অবকাঠামোর মান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।

এ ছাড়া মৌলভীবাজারে প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১০ কোটি টাকার পানি সরবরাহের কাজ দীর্ঘ সময়েও শেষ করা হয়নি। ওই কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ অসম্পূর্ণ রেখে চলে যাওয়ার অভিযোগও ওঠে। পরে নতুন করে দরপত্র দিয়ে কাজ শেষ করার কথা জানান প্রকল্প পরিচালক তবিবুর রহমান।

মাত্র ১২ দিন পর দুই ভিন্ন সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানার জন্য সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের মুঠোফোনে শনিবার রাতে একাধিকবার কল করা হলেও তারা ধরেননি। এ বিষয়ে জানতে তাদের মুঠোফোনে খুদেবার্তা পাঠালেও তারা সাড়া দেননি।

/বিবি/