শিরোনাম

জাপান টোবাক্যোর ১১২ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি


জাপান টোবাক্যোর ১১২ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি
প্রতীকী লোগো

বহুজাতিক সিগারেট উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান জেটি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ লিমিটেডের (জাপান টোব্যাকো) বিরুদ্ধে প্রায় ১১২ কোটি টাকার মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অনুসন্ধানে এই তথ্য উঠে এসেছে।

গত পাঁচ অর্থবছরে তামাকপাতা ক্রয় এবং বাজেটের আগে কৌশলে সিগারেট মজুত করে প্রতিষ্ঠানটির ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) নিরীক্ষা প্রতিবেদনে।

এনবিআরের তদন্ত অনুযায়ী, সিগারেট মজুত করে পরে বেশি দামে বাজারে সরবরাহের মাধ্যমে প্রায় ১৩ কোটি ২৬ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। এনবিআর কর্তৃপক্ষ মনে করে, এই অর্থের ওপর সুদ যুক্ত হলে মোট পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রায় ১১২ কোটি টাকার অপরিশোধিত শুল্ক-ভ্যাট আদায়ের চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করেছে এনবিআর। এর মধ্যে ৯৮ কোটি টাকার বেশি উৎসে ভ্যাট এবং ১৩ কোটি ২৬ লাখ টাকার শুল্ক ফাঁকি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এনবিআরের তদন্তে ক্যামেল কানেক্ট. ডার্ক ব্লু, নেভি, শেখ এসএফ, রিয়েল ও কেটুসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেট অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে জানা গেছে।

এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটর পর্যায়ে বিক্রয়মূল্য এবং শুল্ক-কর পরিশোধের পূর্ণাঙ্গ তথ্য চাওয়া হলেও তারা শুধু মূল্য তালিকা জমা দিয়েছে। তারা ভ্যাট পরিশোধের প্রমাণপত্র দিতে পারেনি।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপান টোব্যাকো গত পাঁচ অর্থবছরে মোট ১ হাজার ৩০৯ কোটি টাকার তামাকপাতা ক্রয় করেছে। এর বিপরীতে উৎসে মূসক বা ভ্যাট বাবদ ৯৮ কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করা হয়নি।

এনবিআর সূত্র আরও জানায়, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত তামাকপাতা ক্রয়ের ওপর কোনো উৎসে ভ্যাট পরিশোধ করা হয়নি। এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকির মামলা করা হয়। পরে ৩ নভেম্বর দাবিনামাসহ কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করে কর্তৃপক্ষ।

অভিযোগের বিষয়ে সিটিজেন জার্নালের পক্ষ থেকে এই প্রতিবেদক জেটি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ লিমিটেডের কর্পোরেট ও মিডিয়া রিলেশনস কর্মকর্তা কাজী রুবাইয়া ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তিনি এ ব্যাপারে হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে লিখিত প্রশ্ন দিতে বলেন। তবে লিখিত প্রশ্ন দেওয়ার পরেও ভ্যাট ফাঁকির বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বাজেটের ফাঁকফোকরে ১৩ কোটি টাকার কারসাজি

ভ্যাট ফাঁকির পাশাপাশি সিগারেটের মূল্যস্তর ও শুল্ক হার পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে রাজস্ব পরিহারের অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার ঠিক আগে (৫ জুন ২০২৪ পর্যন্ত) পুরোনো শুল্ক হারে সিগারেট মজুত করে কোম্পানিটি। পরে ৬ জুন থেকে বর্ধিত মূল্যে সেই পণ্য বাজারে সরবরাহ করা হয়। এতে সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট ও সারচার্জ বাবদ আরও ১৩ কোটি ২৬ লাখ টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হয়েছে রাষ্ট্র। তদন্তে ক্যামেল, নেভি, শেখ, রিয়েল ও কেটু-র মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলোর নাম উঠে এসেছে।

এনবিআরের ব্যাখ্যা ও আইনি পদক্ষেপ

এনবিআরের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইনের প্রথম তফসিলে তামাকপাতা স্থায়ী অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত নয়। এ ছাড়া প্রজ্ঞাপনেও উৎসে মূসক কর্তন থেকে পৃথক কোনো অব্যাহতির উল্লেখ নেই। ফলে তামাকপাতা ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরবরাহ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের উৎসে ভ্যাট কর্তন বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়জুড়ে তা করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এই অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানটির কাছে মোট ৯৫ কোটি ৬২ লাখ ৫৬ হাজার ৬ টাকার রাজস্ব দাবি করে চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করেছে এলটিইউ–মূসক।

জেটি ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, কৃষকের কাছ থেকে তামাক ক্রয় করায় তা ‘জোগানদার সেবা’ হিসেবে গণ্য হবে না। তবে এনবিআর এই যুক্তি নাকচ করে দিয়েছে। এনবিআরের মতে, জেটি ইন্টারন্যাশনাল একটি লিমিটেড কোম্পানি এবং তারা অপ্রক্রিয়াজাত তামাক ক্রয় করায় এক্ষেত্রে আইনত উৎসে ভ্যাট কর্তন বাধ্যতামূলক।

২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকির মামলা করা হয় এবং নভেম্বরে কারণ দর্শানোর নোটিশ ও চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করা হয়। বর্তমানে ১৩ কোটি টাকা ফাঁকির বিষয়টি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আপিল ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছে, যা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

এ বিষয়ে এলটিইউ–মূসক কমিশনার মো. আতিকুর রহমান বলেন, তামাকপাতা কেনার ক্ষেত্রে উৎসে মূসক কর্তন বাধ্যতামূলক হলেও তা অনুসরণ করা হয়নি। তিনি আরও জানান, একই ধরনের তথ্য আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, সব ভ্যাট কমিশনারেটকে নির্দেশনা দেওয়ার জন্য এনবিআরকে অনুরোধ করা হয়েছে, যাতে তামাক খাতের সব প্রতিষ্ঠান একই নিয়মের আওতায় আসে।

তামাকপাতা ক্রয়ে আরও আড়াই কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ

তামাকপাতা ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎসে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) না দেওয়ার অভিযোগে জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ লিমিটেডের কাছে আরও প্রায় ২ কোটি ৫৫ লাখ ৮৭ হাজার টাকার রাজস্ব দাবি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ–মূসক)।

নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে স্থানীয়ভাবে তামাকপাতা ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎসে মূসক কর্তনের আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা পরিশোধ করা হয়নি।

এ কারণে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ৭৩ অনুযায়ী ওই সময়ে অপরিশোধিত উৎসে ভ্যাট বাবদ ২ কোটি ৫৫ লাখ ৮৭ হাজার ৭৬৭ টাকা আদায়যোগ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। চূড়ান্ত দাবিনামা জারির পর নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ না হলে এর ওপর সুদ আরোপের বিধানও প্রযোজ্য হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এ বিষয়ে চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশের লিখিত জবাব দেওয়া হয়েছিল। শুনানিতে জেটি ইন্টারন্যাশনালের একজন ব্যবস্থাপক এবং একজন ভ্যাট কনসালটেন্ট উপস্থিত ছিলেন। তারা আগের লিখিত বক্তব্যই পুনরায় উপস্থাপন করেন। কোম্পানির পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়, কৃষককে জোগানদার হিসেবে ধরে মূসক দাবি করা সঠিক নয়।

তবে এনবিআর ও এলটিইউ–মূসকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, জেটি ইন্টারন্যাশনাল একটি লিমিটেড কোম্পানি হওয়ায় এবং অপ্রক্রিয়াজাত তামাক কৃষকের কাছ থেকে ক্রয় করায় এটি আইনগতভাবে ‘জোগানদার সেবা’ হিসেবে গণ্য হয়। ফলে এই ধরনের ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎসে মূসক কর্তনের বিধান প্রযোজ্য বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানটির ১৩টি পৃথক আপত্তির জবাবও বিশ্লেষণ করে এলটিইউ তা নাকচ করে দেয়। এর ভিত্তিতে দুটি আদেশে মোট ৯৮ কোটি ১৮ লাখ ৪৩ হাজার ৭৭২ টাকার কর চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয় বলে জানা গেছে।

/বিবি/