শিরোনাম

‘আমাদের ঘরে কোরবানির ঈদের কোনো আয়োজন নাই’

কিশোরগঞ্জ সংবাদদাতা
 ‘আমাদের ঘরে কোরবানির ঈদের কোনো আয়োজন নাই’
অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলায় হাওরের অনেক জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

পবিত্র ঈদুল আজহায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। অনেকে গরু অথবা ছাগল কোরবানি দিয়ে পরিবারের সঙ্গে আনন্দে ঈদ উদযাপন করছেন। কিন্তু দেশের হাওরাঞ্চলের সাত জেলার অধিকাংশ কৃষকদের বাড়িতে সেই উৎসবের আমেজ নেই। অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ফলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় তারা এখন অনেক কষ্টে আছেন। ঈদ উপলক্ষে গরু বা ছাগলের মাংসতো দূরে থাক, দুই বেলা খাবারের ব্যবস্থা করাই তাদের জন্য কঠিন হয়ে গেছে। প্রচণ্ড অভাব আর দুশ্চিন্তায় দুর্বিষহ তাদের জীবন।

কিশোরগঞ্জের মিঠামইনের ঘাগড়া গ্ৰামের রুবেল ও তোফাজ্জল মিয়া হাওরের সাত একর জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে পাহাড়ি ঢলে ছয় একর জমির ধানই নষ্ট হয়ে গেছে। ধান বিক্রি করে কোরবানির গরু কেনার আশা ছিল তাদের। তাই এবার আর তাদের কোরবানি দেওয়া হবে না। তাদের অবস্থা এখন এতটাই খারাপ যে বাড়িতে এখন শুধু দুই মাসের চাল আছে। বাকি ১০ মাসের চাল কোথায় পাবেন তা নিয়ে চিন্তিত তারা।

রুবেল ও তোফাজ্জল মিয়া বলেন, ‘আজ পবিত্র ঈদুল আজহা। তবে মনের মধ্যে কোন শান্তি নাই। ইচ্ছা ছিল ধান কাটার পর কিছু ধান খোরাক হিসাবে রেখে বাকি ধান বিক্রি করে দিব। ধান বিক্রির টাকা দিয়ে কোরবানি দিব, হেই ইচ্ছা আর পূরণ করতাম পারলাম না। পুলাপাইনরে ঈদের কাপড় কিইন্না দিতে পারলাম না। এবার ৭ কানি (একর) জমিতে ধান আবাদ করেছিলাম। ১ কানির ধান কাটছিলাম। বাকি ছয় কানির ধান অহন পানির তলে। তাই এইবার আমাদের ঘরে কোরবানির ঈদের কোনো আয়োজন নাই। আত্মীয়স্বজনের বাড়ি থেকে কোরবানির মাংস দিয়ে গেছে। সন্তানদের নিয়ে সেগুলোই খাবেো।’

Untitled design (13)
পানিতে পচে যাওয়া ধান গাছ কেটে বাড়ির আঙিনায় স্তূপ করে রাখা হয়েছে। সেগুলো থেকে ভালো ধান বাছাই করছেন একজন কৃষক। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

ফসলহানির কারণে রুবেল ও তোফাজ্জল মিয়ার মতো কিশোরগঞ্জ জেলার হাজার হাজার কৃষকের ঘরে ঈদুল আজহার খুশি নেই। তারা সরকারের কাছে দ্রুত আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা বলছেন, দ্রুত সরকারি সহায়তা ও কৃষি প্রণোদনা না পেলে তাদের ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।

মিঠামইন উপজেলার কৃষক ইসলাম উদ্দিন ৮ একর জমিতে বোরো ধান চাষ করে ছিলেন। তার অধিকাংশ জমি এখনো পানির নিচে। এর মধ্যে কিছু জমিতে থেকে ধান আনতে পারলেও তা দিয়ে এক মাসের খোরাকও (খাবারের জন্য বাড়িতে রাখা চাল) হবে না। তিনি বলেন, ‘একমাত্র এই বছর ওই কোরবানি দিতে পারলাম না। আল্লা আমারে তৌফিক দেননি । আমি মেম্বার ছিলাম। আজ ঈদের দিন আমার পরিবারে কোন আনন্দ নেই।’

জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মার্চের শেষ দিকে পাহাড়ি ঢল ও অতি বৃষ্টি শুরু হয়। এতে কিশোরগঞ্জের ইটনা, নিকলি মিঠামইন ও অষ্টগ্ৰামে ৫৫ টি জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। তখন মাত্র ধান পাকা শুরু হয়েছিল । কোনো কোনো জমির ধান কাটার উপযোগী হলেও বৃষ্টির কারণে সঠিকভাবে কাটা যায়নি । এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে টান বৃষ্টিতে পুরো হাওরের নিচু জায়গার জমিও তলিয়ে যায়। এতে কৃষকের ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে হাওরের প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। তবে স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রকৃত ক্ষতির পরিমান আরও বেশি।

কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এবার জেলায় মোট এক লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছিল। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলেই ছিল এক লাখ চার হাজার হেক্টর জমি। উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল প্রায় ১১ লাখ মেট্রিক টন ধান, কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ইতোমধ্যে ৫২ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাদের জন্য সরকারি সহায়তা হিসেবে নগদ অর্থ ও খাদ্য দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর বলেন, হাওরে ঈদের আনন্দ থাকার কথা। কোরবানির ঈদ একটি বড় ঈদ। কিন্তু এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে হাওরের কৃষকদের ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে।

সব মিলিয়ে হাওরের কৃষকেরা এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। ঈদের আনন্দ নয়, তাদের মনে এখন বেশকিছু প্রশ্ন বারবার আসছে-সেগুলো হচ্ছে, তাদের পরিবার এখন কীভাবে চলবে, ঋণ কীভাবে শোধ করবেস, আর পরের মৌসুমে তারা আবার চাষে ফিরতে পারবেন কি না।

কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক ড.সাদিকুর রহমান বলেন,প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করতে ইউএনও, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের (পিআইও) দিয়ে কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়। ওই কমিটি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা জেলায় জমা দেন। জেলা থেকে সেগুলো মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে, যাতে প্রকৃত কৃষকরা সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন।

কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাদিকুর রহমান আরও বলেন, ঈদের পরে পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোতে সরকারি সহায়তা পৌঁছে যাবে। চলতি মৌসুমে জেলায় ১৮ হাজার ৩ শত ৩০ টন ধান এবং ২৩ হাজার ৩২৪ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ।

/বিবি/