শহরের ঘুম ভাঙার আগেই যাদের হাতে বদলে যায় নগরের চেহারা

শহরের ঘুম ভাঙার আগেই যাদের হাতে বদলে যায় নগরের চেহারা
শহরের রাস্তা পরিষ্কার করছেন খোরশেদা বেগম ও শাহেরা বেগম

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফুটেনি। নগরের বেশিরভাগ মানুষ যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখনই শুরু হয়ে যায় তাদের কর্মযজ্ঞ। হাতে ঝাড়ু নিয়ে সারাদিনের জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা সরিয়ে ধীরে ধীরে পরিচ্ছন্ন করে তোলেন সড়ক, অলিগলি ও আশপাশের এলাকা। শহর যখন নতুন দিনের ব্যস্ততায় জেগে ওঠে, ততক্ষণে নীরবে নিজেদের কাজ শেষ করে ফেলেন এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। নগরবাসীর পরিচ্ছন্ন ও স্বস্তির দিনের পেছনে প্রতিদিন ভোরে এমনই নিরলস শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন তারা।

এমনই এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী হচ্ছেন খোরশেদা বেগম। বয়স ৪০ ছুঁইছুঁই। থাকেন মিরপুর-১ নম্বরের বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এলাকার সিটি কলোনিতে। প্রতিদিন ভোর সাড়ে ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে যখন নগরবাসী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখনই হাতে ঝাড়ু নিয়ে নেমে পড়েন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের রাস্তায়। প্রায় ১৭ বছর ধরে এ কাজ করে আসছেন তিনি।

তবে এটি শুধু তার জীবিকার মাধ্যম নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবারের এক দীর্ঘ ইতিহাস। খোরশেদার বাবাও ছিলেন সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী। বাবা অসুস্থ হয়ে প্যারালাইজড হওয়ার পর পরিবারের জীবিকার প্রয়োজনে তার পথেই পা বাড়ান তিনি। সেই থেকে ঝাড়ুই হয়ে ওঠে তার নিত্যদিনের সঙ্গী।

চা-দোকান, কাঁচাবাজার কিংবা পথচারীদের ফেলে যাওয়া পলিথিন ও নানা ধরনের ময়লা-আবর্জনা সরিয়ে সড়ক পরিষ্কার করেন খোরশেদা। রাতের অন্ধকারে শুরু হওয়া কাজ শেষ হয় ভোরের আলো ফোটার আগেই। ময়লার দুর্গন্ধ, নোংরা-আবর্জনা আর দীর্ঘ সময় ঝাড়ু দেওয়ার ক্লান্ত— সবকিছুর সঙ্গেই প্রতিদিন লড়তে হয় তাকে। খোরশেদা বলেন, ‘কাজ শেষে পরিচ্ছন্ন রাস্তা দিয়ে মানুষ যখন হেঁটে যায়, তখন খুব ভালো লাগে। তখন মনে হয় আমার পরিশ্রমটা স্বার্থক হয়েছে।’

খোরশেদা বেগমের জীবনসংগ্রাম অবশ্য শুরু হয়েছে অনেক আগেই। অল্প বয়সেই পরিবারের প্রয়োজনের তাগিদে তাকে কাজের সন্ধানে নামতে হয়েছিল। শৈশবের সেই কঠিন বাস্তবতা পেরিয়ে আজও থামেনি তার লড়াই। সময়ের সঙ্গে বেড়েছে দায়িত্ব এবং সংসারের চাহিদা। নিজের জীবনের পাশাপাশি এখন তাকে ভাবতে হয় অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা, স্বামীর আয়-রোজগার এবং ১২ বছর বয়সী ছেলে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েও।

তিনি বলেন, ‘আমার মা কিডনি ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তার চিকিৎসার পেছনে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা খরচ হয়। মাত্র ২৪ হাজার টাকা আয়ের সংসারে এই ব্যয় সামলানো আমার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এজন্য আমি বাসাবাড়িতেও কাজ করি।’

খোরশেদা বেগমের মতো পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেন ২২ বছর বয়সী শাহেরা বেগম। তিনিও মিরপুর-১ নম্বরের বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এলাকার সিটি কলোনিতে থাকেন। প্রায় ৭ থেকে ৮ বছর ধরে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করছেন এই তরুণী। কাজের শুরুতে ১৮ হাজার টাকা বেতন পেলেও, বর্তমানে ২৪ হাজার টাকা পান। স্বামী, সন্তান এবং বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়েই তার সংসার।

এই বেতনে ঠিকমতো পরিবার চলে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী ফার্নিচারের দোকানে কাজ করেন। তার এবং আমার ইনকাম দিয়ে টেনেটুনে সংসার চলে যায়। সরকারের পক্ষ থেকে থাকার জন্য টিনের বাসা দেওয়ার কারণে চাপ কিছুটা কম পড়ে। এখন শুধু কারেন্ট বিল আর পানির বিল দিতে হয়।’

নগরীর রাস্তা-ঘাট পরিষ্কার করতে পেরে খোরশেদার মতো শাহেরা বেগমও প্রায় একই মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘রাস্তা পরিষ্কার করে একটা তৃপ্তি পাই। কারণ, এই রাস্তা দিয়ে হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন যাতায়াত করে। রাস্তায় ময়লা থাকলে দেখতেও খারাপ লাগে। পরিষ্কারের পর আমারও মনটা ভালো হয়ে যায়।’

তাদের ভাষ্যমতে, বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এলাকার সিটি কলোনিতে টিনের ঘরগুলোতে বসবাস করেন প্রায় তিন শতাধিক পরিচ্ছন্নতাকর্মী পরিবার। দিনের পর দিন নগরবাসীর জন্য পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করলেও নিজেদের জীবনে স্থায়ী আবাসনের নিশ্চয়তা নেই তাদের। নিজস্ব জমি এবং পাকা ঘর নেই। টিনের ছোট ঘরেই কাটছে বছরের পর বছর।

তাদের প্রত্যাশা, সিটি কর্পোরেশন যদি গাবতলীর মতো তাদের জন্যও স্থায়ী ফ্ল্যাট বা আবাসনের ব্যবস্থা করত, তাহলে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কিছুটা হলেও কমত। পরিবার নিয়ে একটু নিরাপদে থাকার সুযোগ পেতেন বলে জানান তারা।

খোরশেদা এবং শাহেরা বেগমদের মতো পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা প্রতিদিন ভোরে শহরকে পরিচ্ছন্ন করে তোলেন। তাদের হাতে শুধু ঝাড়ু থাকে না, থাকে একটি পরিবারের দায়িত্ব, বেঁচে থাকার লড়াই আর সুন্দর জীবনের স্বপ্ন। শহরের পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে মিশে থাকে তাদের ঘাম, ক্লান্তি আর নিরলস পরিশ্রম।

/জেএইচ/