চাকরির বাজারে ফ্রেশারদের বড় ৫ দুর্বলতা, কাটিয়ে উঠবেন কীভাবে

চাকরি ডেস্ক
চাকরি ডেস্ক
চাকরির বাজারে ফ্রেশারদের বড় ৫ দুর্বলতা, কাটিয়ে উঠবেন কীভাবে
চাকরির বাজারে ফ্রেশারদের করণীয়। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী প্রতি বছর দেশের চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু একাডেমিক সনদ অর্জনের পর কাঙ্ক্ষিত চাকরি পেতে গিয়ে বড় ধাক্কা খাচ্ছেন সিংহভাগ সদ্য স্নাতক বা ফ্রেশার। দেশের কর্পোরেট খাত ও রিক্রুটমেন্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি থাকলেও ব্যবহারিক জ্ঞান ও দক্ষতার ঘাটতির কারণে সিংহভাগ ফ্রেশার চাকরির বাজার থেকে ছিটকে পড়ছেন।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ এবং এইচআর কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে ফ্রেশারদের প্রধান দুর্বলতাগুলো তুলে ধরা হলো-

ব্যবহারিক দক্ষতা ও ইন্ডাস্ট্রি জ্ঞানের অভাব

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা মূলত তত্ত্বনির্ভর হওয়ায় বাস্তব কর্মক্ষেত্রের চাহিদা ও ব্যবহৃত সফটওয়্যার/টুলস সম্পর্কে ফ্রেশারদের ধারণা খুব কম থাকে। ক্লাসরুমে বই পড়ে বা মেমোরাইজ করে পরীক্ষায় ভালো নম্বর তোলা গেলেও, অফিসে কাজের ক্ষেত্রে সেই জ্ঞান সরাসরি প্রয়োগ করার উপায় ফ্রেশারদের জানা থাকে না। যেমন—মার্কেটিংয়ের থিওরি জানা থাকলেও বাস্তবে কীভাবে মেটা/গুগল এড রান করতে হয় বা বাজেট অপটিমাইজ করতে হয়, তা ক্লাসে শেখানো হয় না।

নির্দিষ্ট একটি শিল্প বা খাত (যেমন—আইটি, আরএমজি, ব্যাংকিং, বা মিডিয়া) কীভাবে পরিচালিত হয়, সেই খাতের রিয়েল-টাইম চ্যালেঞ্জগুলো কী এবং একটি কাজ কীভাবে টিম মেম্বারদের মাঝে ধাপে ধাপে হস্তান্তরিত হয়—এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা না থাকা।

যোগাযোগের দুর্বলতা

স্পষ্টভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করা, প্রাতিষ্ঠানিক ইমেইল লেখা এবং প্রফেশনাল যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেকেই পিছিয়ে থাকেন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানের প্রফেশনাল ইংরেজিতে দুর্বলতা অন্যতম বাধা।

প্রাতিষ্ঠানিক বার্তা বা ইমেইল কীভাবে লিখতে হয়—যেমন একটি স্পষ্ট ‘সাবজেক্ট লাইন’ ব্যবহার করা, যথোপযুক্ত ‘গ্রীটিং’ দেওয়া এবং মূল কথা গুছিয়ে লেখা—এসব জায়গায় অধিকাংশ ফ্রেশার ভুল করেন।

ভাইভা বোর্ড বা কাজের জায়গায় কোনো প্রশ্নের উত্তর টু-দ্য-পয়েন্টে না দিয়ে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলা। ইন্টারভিউয়ে নিজের শক্তি ও কাজের অভিজ্ঞতার গল্প সংক্ষেপে আকর্ষণীয়ভাবে ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতার অভাবও এর অংশ।

আন্তর্জাতিক বা বড় দেশীয় প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে ক্লায়েন্ট ও টিমের সাথে ফ্লুয়েন্ট প্রফেশনাল ইংরেজিতে কথা বলতে হয়। কিন্তু অনেক ফ্রেশারের মধ্যেই প্রয়োজনীয় ভোকাবুলারি এবং সাবলীলভাবে কথা বলার আত্মবিশ্বাসের অভাব থাকে।

বাস্তবসম্মত পোর্টফোলিও বা প্রজেক্ট না থাকা

শুধু ভালো সিজিপিএ দেখলেই এখন কোম্পানিগুলো নিয়োগ দেয় না। একাডেমিক জীবনের বাইরে কোনো ইন্টার্নশিপ, ভলান্টিয়ারিং বা নিজস্ব কাজের পোর্টফোলিও বা প্রজেক্ট উপস্থাপন করতে না পারা বড় দুর্বলতা।

ইন্ডাস্ট্রি বা ব্যবসার যেসব বাস্তব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো সমাধান করে তৈরি করা কোনো প্রজেক্ট না থাকা। ক্লাইন্ট বা কোম্পানির চাহিদা অনুযায়ী কোনো কাজ করার সরাসরি কোনো উদাহরণ তাদের সিভিতে থাকে না।

নিজের তৈরি কাজগুলো সঠিকভাবে সাজিয়ে রাখতে না পারা। যেমন—কোডারদের ক্ষেত্রে গুছানো গিটহাব রিপোজিটরি বা প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টেশন না থাকা, কিংবা ডিজাইনার ও কন্টেন্ট রাইটারদের ক্ষেত্রে বিহ্যান্স, গুগল ড্রাইভ বা নিজস্ব পোর্টফোলিও সাইট লিঙ্ক আপডেট না থাকা।

সমস্যা সমাধানের ক্ষমতার ঘাটতি

কাজ কীভাবে স্বাধীনভাবে পরিচালনা করতে হয় বা হুট করে আসা সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান বের করার দক্ষতায় অধিকাংশ ফ্রেশারের অভিজ্ঞতা থাকে কম।

কাজের ক্ষেত্রে কোনো ছোটখাটো চ্যালেঞ্জ বা টেকনিক্যাল সমস্যা সামনে আসলেই নিজে গুগলিং বা প্রয়োজনীয় রিসোর্স ঘেঁটে সমাধানের চেষ্টা না করে দ্রুত সিনিয়র বা সহকর্মীদের কাছে সাহায্য চাওয়া।

অতিরিক্ত প্রত্যাশা ও পেশাদার মানসিকতার অভাব

কর্মক্ষেত্রের চাপ সহ্য করার মানসিকতা, খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং শুরুর দিকে বেতনের চেয়ে শেখার দিকে মনোনিবেশ করার দৃষ্টিভঙ্গির অভাব দেখা যায়। "আমি ডিগ্রি অর্জন করেছি তাই সব জানি"—এই ধরনের ভুল আত্মবিশ্বাস অনেক সময় নতুন কিছু শেখার পথ বন্ধ করে দেয়।

কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও শুরুর দিকেই আকাশচুম্বী বেতন, বড় পদবী, অথবা অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধাজাতীয় ফ্লেক্সিবিলিটি দাবি করা। কোম্পানি যে মূল্য বা ভ্যালু প্রত্যাশা করে, তার সাথে নিজের দক্ষতার মিল না থাকা।

কীভাবে ফ্রেশাররা নিজেদের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠবেন?

ফ্রেশারদের জন্য কয়েকটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হতে পারে—

১. নিজের পছন্দের চাকরির ক্ষেত্র নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় দক্ষতার তালিকা তৈরি করা।

২. একাডেমিক জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক প্রকল্প ও ইন্টার্নশিপে অংশ নেওয়া।

৩. নিয়মিত সিভি তৈরি, সাক্ষাৎকারের অনুশীলন ও নিজের পরিচয় উপস্থাপনের চর্চা করা।

৪. যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধান ও দলগত কাজের অভ্যাস গড়ে তোলা।

৫. নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করা।

ফ্রেশারদের দুর্বলতা সবার ক্ষেত্রে এক নয়। কারও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকতে পারে, কারও যোগাযোগ দক্ষতায় উন্নতির প্রয়োজন হতে পারে, আবার কারও প্রযুক্তিগত জ্ঞান আরও বাড়ানো জরুরি হতে পারে। তাই চাকরির বাজারে প্রবেশের আগে নিজের ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করে পরিকল্পিতভাবে দক্ষতা উন্নয়ন করাই গুরুত্বপূর্ণ।

/এবি/