শিরোনাম

রাজধানীতে বাড়ছে অজ্ঞাত লাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীতে বাড়ছে অজ্ঞাত লাশ
ছবি: সিজেডএন গ্রাফিক্স

রাজধানীর জনবহুল নগরীর সড়কের পাশে, ফুটপাত, হাসপাতাল গেটে কিংবা খাল ও নির্জন স্থান থেকে উদ্ধার হচ্ছে লাশ। কোথা থেকে, কীভাবে এলো, তাদের নাম-পরিচয়ই বা কী- জানে না কেউ। পুলিশ অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠিয়ে, ছবি তুলে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করেও মিলছে না স্বজনের দেখা। এজন্য সেগুলো বেওয়ারিশ হিসেবেই থেকে যাচ্ছে।

ডিএমপির নথি ও বিভিন্ন থানার তথ্য বলছে, চলতি বছরে রাজধানীর একাধিক এলাকায় এমন মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। আট মাসের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুধু গতকাল সোমবার (১৫ আগস্ট) রাজধানীর পৃথক স্থান থেকে এক নারীসহ ৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের কারও পরিচয় পাওয়া যায়নি।

এর মধ্যে যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়া ইউটার্ন এলাকায় আরাফ কার ওয়াশের পাশের সড়ক থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির (৪৫) লাশ উদ্ধার করা হয়। যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আসাদুজ্জামান জুয়েল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। একই দিন মতিঝিলের নটর ডেম কলেজের বিপরীত পাশের সড়ক থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তিকে (৫০) অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে নাসির নামের একজন তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা ১১টার দিকে তার মৃত্যু হয়। ওই ব্যক্তির পরিচয় পাওয়া যায়নি।

এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশে অসুস্থ অবস্থায় এক নারীকে (৩০) পড়ে থাকতে দেখে হাসপাতালের কর্মীরা তাকে উদ্ধার করে। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা সোয়া ১১টার দিকে তার মৃত্যু হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেন হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত ওয়ার্ড মাস্টার আইয়ুব আলী।

এছাড়া শাহবাগ থানার আওতাধীন জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের মোড়ের ফুটপাত থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির (৩০) লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। শাহবাগ থানার এসআই বিজয় মণ্ডল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। অন্যদিকে কামরাঙ্গীরচর থানার জাউলাহাটি এলাকা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক বৃদ্ধের (৬৫) লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। থানার এসআই প্রাণেশ্বর দাস বলেন, স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে খবর পেয়ে সকালে লাশটি উদ্ধার করা হয়।

লাশের পরিণতি শেষ পর্যন্ত কী হয়?

অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ প্রথমে সুরতহাল করে এবং পরে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। পরিচয় শনাক্তের জন্য ছবি, পোশাক, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, ডিএনএ নমুনা ও অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করে পরিচয় শনাক্তের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে স্বজনের সন্ধান না মিললে আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনের দায়িত্ব নেয় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। সংস্থাটি কাফন, জানাজা ও দাফনের ব্যবস্থা করে। রাজধানীতে বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনের ক্ষেত্রে জুরাইন কবরস্থান গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ একজন অজ্ঞাত মানুষের যাত্রা শেষ হয় এমন এক জায়গায়, যেখানে হয়তো তার নামও লেখা থাকে না।

দাফনের পরও থেকে যায় প্রশ্ন

দাফনের পর যদি কোনো পরিবার নিখোঁজ স্বজনের সন্ধান পায়, তবে সমস্যা দেখা দেয় পরিচয় শনাক্ত করার ক্ষেত্রে। যদিও অতীতে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা মরদেহের পরিচয় পরে শনাক্ত করার ঘটনা ঘটেছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বড় জটিলতা দেখা দেয়।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয় শনাক্তে থানাগুলো নিয়মিত ছবি ও বর্ণনা প্রকাশ করে। পাশাপাশি স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষার সহায়তাও নেয়। অনেক ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তি ভবঘুরে, অসুস্থ কিংবা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় পরিচয় শনাক্তে সময় লাগে। তবে একজন মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার তাকে খুঁজছে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। এছাড়া তাদের বক্তব্যের সঙ্গে অজ্ঞাত মরদেহের তথ্য কতটা সমন্বিত সেটা নিয়েও তৈরি হয় জটিলতা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি নিখোঁজ ব্যক্তির তালিকা, হাসপাতালের মর্গ, থানা ও ডিএনএ তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় যুক্ত করা যায়, তাহলে পরিচয় শনাক্তের গতি বাড়তে পারে। কারণ আমাদের কাছে যেটি অজ্ঞাত লাশ, বাবা, মা, স্ত্রী, সন্তান, কিংবা ভাই-বোনের কাছে সেটি হতে পারে দীর্ঘ অপেক্ষার। মর্গ থেকে মরদেহ কবরস্থানে পৌঁছালেও হয়তো কোথাও একজন মানুষ অপেক্ষা করেন- ‘আমার মানুষটি কি ফিরবে?’

/জেএইচ/