৯ কোটি টাকার ফুটওভার ব্রিজ রেখে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার

মাহফুজুর রহমান
মাহফুজুর রহমান
৯ কোটি টাকার ফুটওভার ব্রিজ রেখে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার
ফুটওভার ব্রিজ পাশে রেখেই বিভাজকের ভাঙা অংশ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পথচারীরা সড়ক পার হচ্ছে। বুধবার নিউ মার্কেট এলাকায়। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

সড়ক বিভাজকের ভাঙা অংশ দিয়ে মাথা নিচু করে পার হচ্ছেন পথচারী। কেউ যানবাহনের সামনে হাত তুলে থামিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন। পাশেই প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক ফুটওভার ব্রিজ। নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা থাকলেও তা ব্যবহার না করে ঝুঁকি নিয়ে সড়ক পার হচ্ছেন অনেকে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় সরেজমিনে এমন চিত্র দেখা গেছে।

রাজধানীর ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকাগুলোর একটি নিউ মার্কেট। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ কেনাকাটা ও নানা প্রয়োজনে এ এলাকায় আসেন। নিউ মার্কেট, গাউছিয়া মার্কেট, চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটসহ আশপাশের বিপণিবিতানে যাতায়াতের কারণে সড়কের দুই পাশেই থাকে মানুষের চাপ। পথচারীদের নিরাপদে সড়ক পারাপারের জন্য আধুনিক ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হলেও এর পূর্ণাঙ্গ সুবিধা পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ।

ভাঙা ডিভাইডার টপকে সড়ক পার হচ্ছেন এক পথচারী। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
ভাঙা ডিভাইডার টপকে সড়ক পার হচ্ছেন এক পথচারী। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

ঝুঁকিপূর্ণ পারাপারেই ভরসা

নিউ মার্কেটের ব্যস্ত সড়কে যানবাহনের চাপ সব সময়ই থাকে। এর মধ্যেই পথচারীরা রাস্তার মাঝখানে গিয়ে পারাপারের সুযোগ খুঁজছেন। কোনো গাড়ি কাছে চলে এলে অনেকে আবার থেমে যাচ্ছেন। গাড়ি কিছুটা দূরে থাকলে দ্রুত সেটির সামনে দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন।

বিশেষ করে সড়ক ডিভাইডারের ভাঙা অংশগুলো যেন পথচারীদের পারাপারের স্থানে পরিণত হয়েছে। এসব জায়গায় কোনো নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ বা নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় পথচারীদের প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে সড়কে নামতে হচ্ছে।

এভাবে পথচারীরা রাস্তার মাঝখানে উঠে আসায় যানবাহনের চালকদেরও হঠাৎ গতি কমাতে হচ্ছে। অনেক সময় চালককে ব্রেক করে গাড়ি থামাতে হচ্ছে। ফলে পথচারীদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি ব্যস্ত সড়কে যানবাহনের স্বাভাবিক গতিও ব্যাহত হচ্ছে।

ফুটপাত দখলে ওভারব্রিজের সিঁড়িতে ওঠা কষ্টকর

পথচারীরা কেন ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করছেন না, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে আসে ফুটপাত দখলের বিষয়টি। ফুটওভার ব্রিজে ওঠার প্রবেশপথের আশপাশের ফুটপাতের বড় অংশজুড়ে বিভিন্ন পণ্যের দোকান বসানো হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, দুই পাশের দোকানের মাঝখানে খুবই অল্প জায়গা রেখে পথচারীদের চলাচলের সুযোগ রয়েছে। দোকানে ঝোলানো কাপড়, বিভিন্ন পণ্য ও অন্যান্য সামগ্রীর কারণে প্রবেশপথটি অনেকটাই সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে হাঁটতে ফুটওভার ব্রিজের সিঁড়িতে ওঠার সুযোগ নেই বললেই চলে।

দুই পাশের দোকানের মাঝের সরু জায়গা দিয়ে এগিয়ে তবেই ফুটওভার ব্রিজের সিঁড়িতে পৌঁছাতে হচ্ছে পথচারীদের। অনেকের কাছে প্রবেশপথটি সহজে দৃশ্যমানও নয়। ফলে পাশে ফুটওভার ব্রিজ থাকা সত্ত্বেও অনেকেই সেটিতে না উঠে সরাসরি সড়ক পারাপারের পথ বেছে নিচ্ছেন।

ফুটওভার ব্রিজের চলন্ত সিঁড়ির সামনে পণ্য রেখে দখল করে রাখা হয়েছে জায়গা। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
ফুটওভার ব্রিজের চলন্ত সিঁড়ির সামনে পণ্য রেখে দখল করে রাখা হয়েছে জায়গা। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

চলন্ত সিঁড়ির সামনে দোকান, ওঠার পথও সংকুচিত

ফুটওভার ব্রিজটিতে পথচারীদের সুবিধার জন্য চলন্ত সিঁড়ির ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সেই চলন্ত সিঁড়ির প্রবেশপথের সামনের জায়গাটিও দখল হয়ে আছে। দোকান ও পণ্যসামগ্রীর কারণে সিঁড়ির কাছে যাওয়ার পথ অনেকটাই সংকুচিত।

ফলে ফুটওভার ব্রিজে ওঠার জন্য পথচারীদের দোকানের মাঝখান দিয়ে সরু জায়গা ধরে এগোতে হয়। বিশেষ করে ভিড়ের সময় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। একজনের সঙ্গে আরেকজনের ধাক্কা লেগে যাওয়ার মতো অবস্থাও তৈরি হয়। এ অবস্থায় অনেক পথচারী সিঁড়িতে ওঠার ঝামেলা এড়িয়ে সরাসরি রাস্তা পার হওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন।

তিন দিন চালু হয়েছিল চলন্ত সিঁড়ি

ফুটওভার ব্রিজের চলন্ত সিঁড়িটি নিয়মিত সচল থাকে কি না জানতে চাইলে এর পাশেই দায়িত্ব পালন করা নিউ মার্কেটের একজন নিরাপত্তাকর্মী জানান, নির্মাণের পর চলন্ত সিঁড়িটি মাত্র তিন দিন অল্প সময়ের জন্য চালু করা হয়েছিল। এরপর থেকে সেটি নিয়মিত চালু থাকতে দেখা যায়নি।

চলন্ত সিঁড়ি সচল না থাকায় বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু কিংবা যাঁদের সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামায় সমস্যা হয়, তাঁদের জন্য ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার আরও কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ পথচারীদের সহজে ও নিরাপদে ওপরে ওঠানোর জন্যই আধুনিক এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

ফুটওভার ব্রিজে ওঠার প্রবেশপথের দুই পাশে বসানো হয়েছে দোকান। এতে সংকুচিত হয়ে গেছে পথচারীদের চলাচলের জায়গা। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
ফুটওভার ব্রিজে ওঠার প্রবেশপথের দুই পাশে বসানো হয়েছে দোকান। এতে সংকুচিত হয়ে গেছে পথচারীদের চলাচলের জায়গা। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

ব্রিজের নিচেই পারাপারের সুযোগ, কমছে যানবাহনের গতি

পথচারীদের সড়কের ওপর দিয়ে নিরাপদে পারাপারের ব্যবস্থা করাই ছিল ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের উদ্দেশ্য। কিন্তু ব্রিজের পাশেই সড়ক বিভাজকের একাধিক ভাঙা অংশ দিয়ে পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছে।

ফলে কেউ কেউ কয়েক ধাপ সিঁড়ি দিয়ে ফুটওভার ব্রিজে ওঠার পরিবর্তে সড়ক বিভাজকের ভাঙা অংশ দিয়ে সরাসরি সড়ক পার হচ্ছেন। এতে ফুটওভার ব্রিজের ব্যবহার যেমন কমছে, তেমনি পথচারীদের ঝুঁকিও বাড়ছে।

পথচারীদের এমন অনিয়ন্ত্রিত পারাপারের প্রভাব পড়ছে যানবাহন চলাচলেও। রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ পথচারী চলে আসায় চালকদের গতি কমিয়ে দিতে হচ্ছে। কেউ কেউ পথচারী পার না হওয়া পর্যন্ত গাড়ি থামিয়ে রাখছেন।

ব্যস্ত সময়ে একের পর এক পথচারী রাস্তা পার হওয়ার কারণে যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে যখন কোনো পথচারী গাড়ির সামনে হাত তুলে থামিয়ে দেন, তখন পেছনে থাকা অন্য যানবাহনগুলোকেও গতি কমাতে হয়।

বিপুল ব্যয়ে নির্মাণ, ব্যবহার কতটা

প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক ফুটওভার ব্রিজটি যদি পথচারীরাই ব্যবহার না করেন, তাহলে এর উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হচ্ছে, এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

শুধু ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করলেই পথচারীদের সেটি ব্যবহারে আগ্রহী করা সম্ভব নয়। ব্রিজের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ দখলমুক্ত রাখা, আশপাশের ফুটপাত পথচারীবান্ধব রাখা, চলন্ত সিঁড়ি সচল রাখা এবং সড়কের মাঝের ভাঙা ব্যারিয়ার মেরামত করাও জরুরি।

দখলমুক্ত প্রবেশপথ চান পথচারীরা

পথচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করতে তাঁদের আপত্তি নেই। তবে ব্রিজে ওঠার পথ সহজ ও নির্বিঘ্ন হওয়া দরকার। ফুটপাতের দোকানপাট ও পণ্যসামগ্রীর কারণে যখন প্রবেশপথ সংকুচিত হয়ে যায়, তখন দ্রুত রাস্তা পার হওয়াকেই অনেকে সহজ মনে করেন।

পথচারী বেসরকারি চাকরিজীবী মাহমুদ জুবায়ের বলেন, ফুটওভার ব্রিজটি কাছেই থাকলেও সেখানে যেতে হলে দোকানের ফাঁক দিয়ে যেতে হয়। দুই পাশে এত দোকান যে কোথা দিয়ে সিঁড়িতে উঠতে হবে, সেটাও অনেক সময় বোঝা যায় না। চলন্ত সিঁড়ি নিয়মিত চালু থাকলে এবং প্রবেশপথ পরিষ্কার থাকলে মানুষ আরও বেশি ব্যবহার করবে।

আরেক পথচারী সামন্ত বিশ্বাস বলেন, রাস্তার মাঝ দিয়ে পার হওয়া যে ঝুঁকিপূর্ণ, তা সবাই জানেন। কিন্তু ফুটওভার ব্রিজে ওঠার পথ সহজ না হলে মানুষ সময় বাঁচাতে রাস্তা দিয়েই পার হওয়ার চেষ্টা করেন।

নিরাপদ পারাপারে সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন

নগর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পথচারীদের জন্য শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, সেটির ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। নিউ মার্কেটের ফুটওভার ব্রিজের ক্ষেত্রে প্রবেশপথের দখল, চলন্ত সিঁড়ি সচল না থাকা এবং সড়কের মাঝের ব্যারিয়ার ভাঙা, তিনটি বিষয়ই একসঙ্গে পথচারীদের ঝুঁকিপূর্ণ পারাপারে উৎসাহিত করছে।

এ অবস্থায় ফুটওভার ব্রিজের প্রবেশপথ ও আশপাশের ফুটপাত দখলমুক্ত করা, চলন্ত সিঁড়ি নিয়মিত সচল রাখা এবং সড়কের মাঝের ভাঙা ব্যারিয়ার দ্রুত মেরামত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান দিয়ে পথচারীদের পারাপার বন্ধে নিয়মিত নজরদারিও দরকার।

নিউ মার্কেটের সড়কে তাই একদিকে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক ফুটওভার ব্রিজ, অন্যদিকে তার পাশেই ডিভাইডারের ভাঙা অংশ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলছে মানুষের পারাপার। নিরাপদ চলাচলের জন্য নির্মিত অবকাঠামো আর বাস্তব ব্যবহারের এই বৈপরীত্যই এখন নিউ মার্কেট এলাকার অন্যতম দৃশ্যমান সমস্যা।

সেতু থাকার পরও ঝুঁকি নিয়ে সড়ক পারাপারের বিষয়ে জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ঢাকার অধিকাংশ চলন্ত সিঁড়িই কার্যকর থাকে না, এ কথা বারবার বলা হলেও নিউ মার্কেটের মতো জায়গায় কেন এমন ব্যবস্থা রাখা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। উদ্বোধনের পর দীর্ঘ সময় ধরে সিঁড়িটি অচল থাকলে এর পেছনে প্রকল্প ব্যয় ও অর্থের অপচয়ের দায় সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে। একই সঙ্গে ব্যস্ত এলাকায় ফুটপাত সংকুচিত করে দখলদারিত্বের সুযোগ কীভাবে তৈরি হচ্ছে, কারা এর পেছনে রয়েছে এবং এর সঙ্গে অর্থের লেনদেন আছে কি না, তা চিহ্নিত করা প্রয়োজন। নাগরিকের হাঁটার অধিকার নিশ্চিত করতে দখলদারির পেছনের চক্রকে জবাবদিহির আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, শুধু নিউ মার্কেট নয়, পুরো ঢাকা শহরেই ট্রাফিক আচরণ উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অবকাঠামোগত ব্যবস্থা, সামাজিক সচেতনতা, প্রয়োজন হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং কমিউনিটির অংশগ্রহণ, সবকিছুর সমন্বয় করতে হবে। দোকানদার, স্থানীয় কমিউনিটি, শিক্ষার্থী ও কমিউনিটি পুলিশিংকে যুক্ত করে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু একটি এলাকায় ব্যারিয়ার বা অবকাঠামো তৈরি করে এ ধরনের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়; এর জন্য সামগ্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

/এমআর/