শিরোনাম

মিরপুরে তীব্র পানির সংকট, ক্ষুব্ধ বাসিন্দাদের সড়ক অবরোধ

নিজস্ব  প্রতিবেদক
নিজস্ব  প্রতিবেদক
মিরপুরে তীব্র পানির সংকট, ক্ষুব্ধ বাসিন্দাদের সড়ক অবরোধ
পানির সংকটে বালতি ও বোতল নিয়ে মূল সড়ক অবরোধ করেন ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা। কোলাজ: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

তীব্র পানির সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়া, মনিপুর ও ১১ নম্বর এলাকার জনজীবন। নিত্যদিনের গৃহস্থালি কাজ চালানোই এখন এসব এলাকার বাসিন্দাদের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য পানি মিললেও, বেশির ভাগ বাড়িতেই পানির ট্যাপ চব্বিশ ঘণ্টাই শুকিয়ে থাকছে। ফলে বাধ্য হয়েই রান্নাবান্না, গোসল ও শৌচাগার ব্যবহারের মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে বাইরে থেকে পানি কিনতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। আবার কেউ কেউ ছুটছেন দূরবর্তী এলাকায় আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে।

ঢাকা ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, ভাকুর্তা শোধনাগার থেকে স্বাভাবিক সময়ে মিরপুর এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ১২ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হতো। তবে ২০ জুন শোধনাগারের ট্রান্সফরমার ও জেনারেটরে ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর ওই দিন সরবরাহ নেমে আসে মাত্র ৭ কোটি লিটারে। পরবর্তী দুই দিন ১০ কোটি লিটার করে পানি দেওয়া সম্ভব হলেও, তিন দিনের ব্যবধানে স্বাভাবিক সরবরাহের চেয়ে মোট ৯ কোটি লিটার পানি কম পেয়েছে মিরপুরবাসী। ওয়াসার কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ভাকুর্তা শোধনাগারের পানি মূলত বৃহত্তর মিরপুর এলাকার পানির মূল উৎস। তাই সেখানে উৎপাদনে সামান্যতম ঘাটতি তৈরি হলেও তার সরাসরি ও বড় ধরনের প্রভাব পড়ে শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মনিপুর ও এর সংলগ্ন এলাকাগুলোতে। যেসব এলাকায় আগে থেকেই চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম ছিল, সেখানে এই যান্ত্রিক ত্রুটি পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তুলেছে।

ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের ক্ষোভ ও ভোগান্তি এখন চরমে। শেওড়াপাড়ার ইকবাল রোডের এক বাসিন্দা জানান, তাদের এলাকায় গত এক সপ্তাহ ধরে চব্বিশ ঘণ্টাই পানি থাকছে না। বিকল্প উপায়ে পানি সংগ্রহ করে কোনোমতে টিকে থাকতে হচ্ছে এবং গোসলের মতো প্রাত্যহিক কাজের জন্যও আত্মীয়দের বাসায় যেতে হচ্ছে। মনিপুর এলাকার বাসিন্দা এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও নাম প্রকাশ না করার শর্তে আক্ষেপ করে বলেন, পানি মানুষের জীবনে কতটা অপরিহার্য, তা এই চরম সংকটে না পড়লে অনুধাবন করা যায় না। একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে মিরপুর ১১ নম্বরের কিছু এলাকাতেও। চার দিন ধরে সেখানে তীব্র পানির সংকট চলছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পানি কখন আসবে, কতক্ষণ থাকবে কিংবা এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান কবে হবে ওয়াসার পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হচ্ছে না। ফলে প্রাত্যহিক কাজের কোনো পূর্বপরিকল্পনা বা পানি জমিয়ে রাখার প্রস্তুতিও নেওয়া যাচ্ছে না।

পানির তীব্র সংকটে ক্ষুব্ধ হয়ে রবিবার (২৮ জুন) দুপুরে শেওড়াপাড়ার শতাধিক বাসিন্দা বালতি ও খালি বোতল হাতে নিয়ে মূল সড়ক অবরোধ করেন। প্রায় ২০ মিনিট ধরে চলা বিক্ষোভে সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাতের মধ্যেই পানি সরবরাহের আশ্বাস দেওয়া হলে বিক্ষোভকারীরা সড়ক ছেড়ে দেন। মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, দুপুর ২টার দিকে স্থানীয় বাসিন্দারা পানির দাবিতে সড়ক অবরোধ করেছিলেন। পরবর্তীতে ঢাকা ওয়াসার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত পানি দেওয়ার আশ্বাস পাওয়ার পর তাঁরা অবরোধ প্রত্যাহার করে নেন।

এদিকে ঢাকা ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীজুড়ে প্রতিদিন পানির মোট চাহিদা প্রায় ৩০০ কোটি লিটার। এ বিশাল চাহিদা মেটাতে ওয়াসা ঢাকার বিভিন্ন জোনে প্রায় ১ হাজার ৩৫০টি গভীর নলকূপ স্থাপন করেছে। এর পাশাপাশি নদীর পানি শোধন করেও সরবরাহ করা হচ্ছে। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, প্রতি বছরের এপ্রিল, মে ও জুন মাসকে পানির জন্য সংকটকাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক নিচে নেমে যায়। ফলে মিরপুরের বিভিন্ন পাম্প থেকে এখন চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ পানিও তোলা যাচ্ছে না। এমনকি কোনো কোনো পাম্পের সক্ষমতা নেমে এসেছে মাত্র পাঁচ ভাগের এক ভাগে।

তিনি আরও জানান, ভাকুর্তা শোধনাগার থেকে একসময় দৈনিক ১৫ কোটি লিটার পানি পাওয়া গেলেও সম্প্রতি তা ১২ থেকে ১৩ কোটি লিটারে নেমে এসেছিল, যার ওপর জেনারেটর অকেজো হওয়ার ঘটনাটি সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। এর বাইরেও বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে মূল পাইপ কেটে পানির সংযোগ নেওয়া এবং মেট্রোরেলের নির্মাণকাজের সময় পানির লাইনে সৃষ্টি হওয়া চাপও এ সংকটের অন্যতম কারণ। বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে ওয়াসা এখন এলাকাভিত্তিক রেশনিং বা নির্দিষ্ট সময়ে পানি দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি নতুন গভীর নলকূপ স্থাপন ও পুরোনো নলকূপগুলো প্রতিস্থাপনের কাজ দ্রুত গতিতে চলছে। আগামী পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে মিরপুরের পানি সরবরাহ পরিস্থিতি সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে আশা প্রকাশ করেন ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

/এমএকে/