শিরোনাম

ঐতিহাসিক রূপলাল হাউজ এখন মসলার আড়ত

শেখ শাহরিয়ার হোসেন
ঐতিহাসিক রূপলাল হাউজ এখন মসলার আড়ত
ঐতিহাসিক রূপলাল হাউজ তার পুরোনো জৌলুস হারিয়ে এখন বিলুপ্তির পথে। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জ রোডে বুড়িগঙ্গা তীর ঘেঁষে জীর্ণশীর্ণভাবে দাঁড়িয়ে আছে এক সময়ের অভিজাত ও রাজকীয় ঐতিহ্যের সাক্ষী রূপলাল হাউজ। ঢাকার অন্যতম বৃহৎ এই ঐতিহাসিক ভবনটি আজ তার পুরোনো জৌলুস হারিয়ে প্রায় বিলুপ্তির পথে। বর্তমানে স্থানীয়ভাবে এটি ‘জামাল হাউজ’ নামে পরিচিত।

সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটির নিচতলায় গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও মসলার আড়ত। ভবনের চারদিকে পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ নানা ধরনের মসলার বস্তা স্তূপ করে রাখা হয়েছে। চারপাশে ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাক ও শ্রমিকদের কোলাহলে চাপা পড়ে গেছে ঐতিহাসিক এই স্থাপনার পরিবেশ।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ভবনটির একটি অংশ জামাল পরিবারের বংশধরদের মালিকানায় রয়েছে। অন্য অংশ গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে, যা বর্তমানে সেনাবাহিনী ব্যবহার করছে। ভবনের ভেতরে বহু ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন, ফলে হঠাৎ করে তাদের উচ্ছেদ করা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই সংরক্ষণ ও ব্যবহার– এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

ভবনটির সামনে ছোট একটি বিলবোর্ডে লেখা রয়েছে ‘জামাল হাউজ’। ভবনের বিভিন্ন অংশে ভাঙনের চিহ্ন স্পষ্ট। ছাদ, কার্নিশ ও দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে বটগাছ গজিয়েছে। স্থাপত্য নকশায় এখনও বৈচিত্র্য ও কারুকাজের ছাপ দেখা গেলেও ইতিহাসের গৌরবের সঙ্গে বর্তমান অবস্থার যেন আকাশ-পাতাল পার্থক্য।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী জানান, স্বাধীনতার আগেই জামাল নামে এক ব্যক্তি বাড়িটি কিনেছিলেন বলে শুনেছি। মাসিক ভাড়া দিয়ে এখানে ব্যবসা পরিচালনা করছেন অনেকে। ভবনের বিভিন্ন কোঠা স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ঐতিহাসিক রূপলাল হাউজ প্রাঙ্গণে পণ্য বিক্রি করছেন ব্যবসায়ী ও হকাররা। ছবি: সিটিজেন জার্নাল
ঐতিহাসিক রূপলাল হাউজ প্রাঙ্গণে পণ্য বিক্রি করছেন ব্যবসায়ী ও হকাররা। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে ব্যবসায়ী ভ্রাতৃদ্বয় রূপলাল দাস ও রঘুনাথ দাস ভবনটি নির্মাণ করেন। গ্রিক স্থাপত্যের অনুকরণে নির্মিত এই ভবনের বিশাল ডরিক কলাম ঢাকার স্থাপত্যে অনন্য বৈশিষ্ট্য বহন করে। পরবর্তী সময়ে উত্তরাধিকারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী ভবনটির সম্প্রসারণ করা হয়।

ঐতিহাসিকভাবে এই ভবনটি নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী। ১৮৮৮ সালে ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডাফরিন ঢাকা সফরকালে এখানে অবস্থান করেন। একসময় এই বাড়িতে নিয়মিত গানের আসর বসতো। সেখানে সঙ্গীত পরিবেশন করতেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ ওয়ালীউল্লাহ খাঁ ও লক্ষ্মী দেবী। এছাড়া জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও এই ভবনে একাধিকবার এসেছেন।

পরবর্তীতে ১৯৪৭-এ ভারত বিভাগের সময় রূপলাল পরিবারের উত্তরাধিকারীরা বাড়িটি বিক্রি করে পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। এরপর মালিকানা নিয়ে শুরু হয় বিরোধ। ১৯৫৮ সালে মোহাম্মদ সিদ্দিক জামাল ভবনটি কিনে এর নাম দেন ‘জামাল হাউজ’।

এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী ও নান্দনিক এই স্থাপনাটি যথাযথ সংরক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে আজ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের পাতা থেকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সংরক্ষণ উদ্যোগ না নেওয়া হলে ঢাকার ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই নিদর্শনটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আর টিকে থাকবে না।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ভবনটি সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে, তবে এতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। এ ধরনের ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের জন্য ইউনেস্কো অর্থায়ন করে থাকে। সম্প্রতি ইউনেস্কোর একটি প্রতিনিধিদল স্থানটি পরিদর্শন করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী অর্থ পাওয়া গেলে ভবনের পশ্চিম পাশের তিনতলা পর্যন্ত এক্সিবিশন স্পেস হিসেবে গড়ে তোলা হতে পারে। বাকি অংশ ব্যবসায়ীরা ভবনের ক্ষতি না করার শর্তে ব্যবহার করতে পারবেন।

/এফসি/