সায়েন্সল্যাবে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ, দ্বন্দ্বের নেপথ্যে কী

সায়েন্সল্যাবে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ, দ্বন্দ্বের নেপথ্যে কী
সায়েন্স ল্যাব এলাকায় সংঘর্ষের সময় পুলিশ একশন নিলে দৌড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা

রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা সায়েন্স ল্যাবরেটরি। প্রতিদিন হাজারো মানুষের যাতায়াতের এই এলাকায় সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা নতুন নয়। গত রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুর সোয়া ১২টার দিকে সায়েন্স ল্যাব-সংলগ্ন গ্রিন রোডের মুখে ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে দুই পক্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হওয়ার পাশাপাশি সায়েন্স ল্যাব মোড় ও আশপাশের সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়।

ঢাকা কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের দাবি, ক্লাস শেষে ঢাকা কলেজের বাস সায়েন্স ল্যাব দিয়ে যাওয়ার সময় আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা বাস লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন। এতে বাসের কয়েকটি জানালার কাচ ভেঙে যায়। পরে খবর পেয়ে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাবে গিয়ে আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রতিহত করেন।

অন্যদিকে, আইডিয়াল কলেজের এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, কোনো কারণ ছাড়াই ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের ওপর হামলা চালান। তার দাবি, এতে আইডিয়াল কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। কয়েকজনের মাথায়ও আঘাত লেগেছে। ওই শিক্ষার্থী বলেন, তারা নতুন শিক্ষার্থী এবং বাসায় যাওয়ার পথে হঠাৎ হামলার শিকার হন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ঘটনাটিকেও বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল কারণ আড়ালেই থেকে যাবে। সামান্য কথা-কাটাকাটি, ধাক্কাধাক্কি, বাসে ইটপাটকেল নিক্ষেপ কিংবা একজন শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ দ্রুত দুই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করে। পরে ব্যক্তিগত বিরোধ দলগত সংঘর্ষে রূপ নেয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের অবস্থান কাছাকাছি হওয়ায় সায়েন্স ল্যাব, গ্রিন রোড, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোডসহ আশপাশের এলাকায় প্রতিদিন এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের চলাচল রয়েছে। ফলে যেকোনো ছোটখাটো বিরোধ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়। এর সঙ্গে অতীতের বিভিন্ন ঘটনার জেরে তৈরি হওয়া পারস্পরিক ক্ষোভ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাও নতুন করে উত্তেজনা তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

সায়েন্স ল্যাব এলাকায় শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে অ্যাকশনে যায় পুলিশ
সায়েন্স ল্যাব এলাকায় শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে অ্যাকশনে যায় পুলিশ

সংশ্লিষ্টরা জানান, কোনো একটি ঘটনার পর কে আগে হামলা করেছেন, কে আহত হয়েছেন বা কী ঘটেছে, তা নিশ্চিত হওয়ার আগেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এক পক্ষের শিক্ষার্থীরা জড়ো হলে অপর পক্ষও পাল্টা জড়ো হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

ঢাকার সায়েন্স ল্যাব এলাকায় ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা দীর্ঘদিনের। ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী আহত হন।

সায়েন্স ল্যাব এলাকায় বাসে ওঠাকে কেন্দ্র করে ঢাকা কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে সিটি কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীর হাতাহাতি হয়। এর জের ধরে ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাস থেকে ছেড়ে যাওয়া দুটি বাস সিটি কলেজের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা বাস দুটি ভাঙচুর করেন।

এরপর ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি ও ২০ ফেব্রুয়ারি আবারও সংঘর্ষে জড়ান এই দুই কলেজের শিক্ষার্থীরা। সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ২০২৫ সালের ১৮ মার্চ। ওই সংঘর্ষে অন্তত ৫০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। পরে একই বছরের ১০ এপ্রিল, ১৫ এপ্রিল ও ২২ এপ্রিলও ধারাবাহিকভাবে সংঘর্ষ হয়। বিশেষ করে ২২ এপ্রিলের সংঘর্ষ প্রায় চার ঘণ্টা স্থায়ী হয়। এক সহপাঠীকে মারধরের জের ধরে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে ঢাকা সিটি কলেজে হামলা করেন। এতে অন্তত সাতজন শিক্ষার্থী আহত হন এবং সায়েন্স ল্যাব-নিউমার্কেট এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

অন্যদিকে, ঢাকা কলেজ ও ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও একাধিকবার সংঘর্ষ হয়েছে। ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর সায়েন্স ল্যাব এলাকায় দুই কলেজের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে অন্তত ২৪ জন আহত হন। ঢাকা কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে কথা-কাটাকাটির জেরে ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এরপর ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সিটি কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এবং ২১ আগস্ট ২০২৫ ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের মধ্যে সমঝোতার পরও ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ আবারও সংঘর্ষ হয়। এরপর সর্বশেষ ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা কলেজের একটি বাসে ইটপাটকেল নিক্ষেপকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় সংঘর্ষ ও যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।

ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী মুনতাসির মাহিন আদিত্য বলেন, যখন কেউ জিজ্ঞেস করেন, “কোথায় চান্স পেয়েছ?” আর ঢাকা কলেজের নাম শুনে বলেন, “ওহ, ওখানে তো মারামারি হয়, সাবধানে থেকো!” তখন সত্যিই খারাপ লাগে। ঢাকা কলেজের পরিচয় কখনোই মারামারি দিয়ে হওয়া উচিত নয়। আমাদের পরিচয় হোক এই প্রতিষ্ঠানের গৌরবময় ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সম্মানের মাধ্যমে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের কলেজের কেউ যদি অন্য কলেজের শিক্ষার্থীদের হাতে হামলার শিকার হন, তাহলে আমরা তো আর চুপ করে বসে থাকতে পারি না। ওরা আমাদের ওপর হামলা করলে আমরাও প্রতিবাদ করব। সব সময় তো আর সহ্য করা যায় না। নিজেদের কলেজের বন্ধুদের বিপদে পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব। তবে এসব ঝামেলা না হলে সবচেয়ে ভালো হতো।

ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ এ কে এম ইলিয়াস বলেন, চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষার্থীদের সহনশীল আচরণই এ ধরনের সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ। আমরা কলেজে থাকলে বিষয়টি দেখভাল করতে পারি। তবে ক্যাম্পাসের বাইরে কোনো ঘটনা ঘটলে সেখানে আমাদের করার তেমন কিছু থাকে না। তবুও এখন বাসের সঙ্গে আইডিয়াল কলেজ পার হওয়া পর্যন্ত পুলিশ পাঠানো হচ্ছে, যাতে কোনো হামলার ঘটনা না ঘটে। ওই কলেজকেও বলা হয়েছে, তারাও যেন নিরাপত্তার সঙ্গে তাদের বাস পার করে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের ক্লাসে বোঝাই, যেন তারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে না জড়ায়। একবার পুলিশের খাতায় নাম উঠলে সরকারি চাকরি পেতে সমস্যা হবে। গতকাল আইইউবিএটির একটি বাসে লাঠি নিয়ে হামলা করতে দেখেছি। প্রশ্ন হলো, তারা লাঠি কোথায় পেল? এসব করা তো শিক্ষার্থীদের কাজ নয়। এখন আর বিএনএসের দিকে আমাদের বাস যাবে না। আর আমাদের গত বছর করা কয়েকটি মামলা এখনো চলমান রয়েছে। সম্প্রতি নতুন কোনো মামলা করা হয়নি। আসলে মামলা কোনো সমাধান নয়। মূলত শিক্ষার্থীদের সহনশীল হতে হবে এবং অভিভাবকদেরও তাদের এ বিষয়ে বোঝাতে হবে।’

ধানমন্ডির আইডিয়াল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. খন্দকার মোহাম্মদ সোহেল বলেন, শিক্ষার্থীদের বয়স কম হওয়ায় অনেক সময় আবেগের বশে তারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। আমাদের কলেজের প্রায় ১ হাজার ৬০০ শিক্ষার্থী রয়েছে। ছুটি হওয়ার পর প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে নিরাপদে বাসায় পৌঁছে দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। কলেজের প্রক্টরিয়াল বডি ও সংশ্লিষ্টরা নিয়মিত টহল দেন। বিশেষ করে সায়েন্স ল্যাব এলাকায় নজরদারি রাখা হয়।

তিনি বলেন, আমরাও চাই শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ ধরনের সংঘাত ও বাসে হামলার ঘটনা বন্ধ হোক। শিক্ষার্থীদের বোঝানো হচ্ছে, যাতে তারা কোনো ধরনের সংঘাতে না জড়ায় এবং অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও সহনশীল আচরণ করে। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও এ বিষয়ে সচেতন ভূমিকা রাখার প্রয়োজন রয়েছে।

ধানমন্ডি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুহাম্মদ ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব বলেন, কয়েক মাস আগে এ-সংক্রান্ত একটি মামলা করা হয়েছিল। সেটি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, এ ধরনের সংঘর্ষকে শুধু তাৎক্ষণিক কোনো ঘটনার ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পারস্পরিক অবিশ্বাস, সহনশীলতার ঘাটতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং দ্রুত দলবদ্ধ হয়ে যাওয়ার প্রবণতা একসঙ্গে কাজ করে। ফলে ছোট কোনো বিরোধও বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি দিয়ে এ ধরনের সংঘর্ষ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা সম্ভব নয়। দুই কলেজের প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী প্রতিনিধি ও অভিভাবকদের সমন্বয়ে নিয়মিত যোগাযোগ ও সংলাপের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংঘর্ষের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, গুজব প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা এবং বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের সংস্কৃতি তৈরি করা জরুরি।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শওকত হোসেন সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, তরুণদের মধ্যে উগ্র আচরণের পেছনে পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর দুর্বলতা, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার একসঙ্গে কাজ করছে। সমাজে ভোগবাদী সংস্কৃতির বিস্তার, অভিভাবকদের অর্থকেন্দ্রিক ব্যস্ততা এবং সন্তানদের সঙ্গে মানসম্মত সময় না কাটানোর কারণে পরিবারে মানসিক দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি প্রযুক্তির নেতিবাচক ব্যবহার এবং শিক্ষাক্রমে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা কমে যাওয়াও তরুণদের আচরণগত পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তার মতে, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু অর্থনৈতিক সাফল্য নয়, একজন দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মদ সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, বর্তমান তরুণ প্রজন্মের আচরণগত পরিবর্তনের অন্যতম কারণ একক বা ছোট পরিবারের আধিক্য। সামাজিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও নীতি-নৈতিকতা যথাযথভাবে শেখার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রে কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় আন্তরিকতা ও সময়ের অভাব শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মানসিক দূরত্ব তৈরি করতে পারে, যা তাদের আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

/এমআর/