শিরোনাম

শেকড়ে ফেরার আনন্দে কুবি শিক্ষার্থীরা

কুবি সংবাদদাতা
শেকড়ে ফেরার আনন্দে কুবি শিক্ষার্থীরা
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিয়া জাহান প্রমি, মাকসুদ নুর, ইফাজ উদ্দীন ও মো. ওমর হোসাইন মিশকাত। ছবি: সংগৃহীত

কুরবানির ঈদ মুসলিম সমাজে ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের জীবনে এই উৎসবের প্রভাব কেবল আনন্দ উদ্যাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি পরিবার, বন্ধুত্ব, দায়িত্ববোধ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও সামাজিক সম্পর্কের এক গভীর প্রতিফলন হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাছে ঈদ একটি ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতার নাম।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ব্যস্ততা, অ্যাকাডেমিক চাপ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের মধ্যে ঈদের ছুটি যেন একটুখানি স্বস্তির জায়গা তৈরি করে। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে এটি দীর্ঘদিন পর পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার সুযোগ। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, একসঙ্গে কুরবানির প্রস্তুতি নেওয়া এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা হওয়া—এসব বিষয় শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। ফলে ঈদ তাদের কাছে শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং আবেগ ও শেকড়ে ফিরে যাওয়ার উপলক্ষও বটে

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে কুরবানির ঈদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবিকতা ও সহমর্মিতার চর্চা। অনেক শিক্ষার্থী এই সময়ে অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। কেউ কুরবানির মাংস বিতরণে অংশ নেন, কেউ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও দায়িত্ববোধ তৈরি হয়, যা ভবিষ্যৎ নাগরিক হিসেবে তাদের মানসিক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে

ঈদের এসব ভাবনা নিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছেন সিটিজেন জার্নালের কুবি সংবাদদাতা রাফি হোসেন

কোরবানি ঈদের অনুভূতি নিয়ে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাকসুদ নুর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো বন্ধুদের সঙ্গে তৈরি হওয়া স্মৃতিগুলো। অনেক শিক্ষার্থী পরিবার থেকে দূরে থাকায় বাড়ি ফেরার আনন্দটা আরও আবেগঘন হয়ে ওঠে। আবার কেউ হলে থেকে গেলে বন্ধুরাই হয়ে ওঠে তার ছোট্ট পরিবার। ঈদের ছুটি শেষে ক্যাম্পাসে ফিরে আসার অনুভূতিও দারুণ। সবাই আবার একত্রিত হয়ে ঈদের গল্প ভাগাভাগি করে। তখন বোঝা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পড়াশোনার জায়গা নয়, এটি আরেকটি পরিবার। ঈদ ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এ সময় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। তাই ঈদ এখানে শুধু উৎসব নয়, স্মৃতি, আবেগ ও বন্ধুত্বের এক সুন্দর অনুভূতির নাম। ঈদ মোবারক

ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইফাজ উদ্দীন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ততা, ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট আর প্রতিদিনের ছুটে চলার মাঝে কোরবানির ঈদ যেন এক অন্যরকম প্রশান্তি নিয়ে আসে প্রায় ২৩ দিনের দীর্ঘ ছুটি মানেই পরিবার, প্রিয় মানুষ আর শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার সুযোগ। কোরবানির ঈদের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তগুলোর একটি হলো গরুর হাটে যাওয়া। বন্ধু, ভাই কিংবা পরিবারের সবার সাথে বাজারে ঘুরে পছন্দের গরু খোঁজা— এই অনুভূতির মাঝেই লুকিয়ে থাকে ঈদের আলাদা এক আনন্দ। হাটের কোলাহল, মানুষের ভিড়, দরদাম আর হাসি-মজার মুহূর্তগুলো প্রতি বছর নতুন স্মৃতি তৈরি করে।

তিনি আরও বলেন, তবে এই ঈদ শুধু আনন্দের নয়, এটি ত্যাগ, সহমর্মিতা ও মানবতার শিক্ষাও দেয়। আমাদের কোরবানি যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সাহায্য ও ভাগাভাগির মানসিকতা আরও গভীর হোক। দীর্ঘদিন পর পরিবারের সাথে সময় কাটানো, গ্রামের পরিবেশ, একসাথে খাবার খাওয়া আর আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা হওয়া— সব মিলিয়ে কোরবানির ঈদ হয়ে ওঠে হৃদয়ের সবচেয়ে আপন এক উৎসব

ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. ওমর হোসাইন মিশকাত বলেন, ঈদুল আজহা আমার কাছে ত্যাগ, ভালোবাসা ও মানবতার এক অপূর্ব শিক্ষা। এই ঈদ আমাদের মনে করিয়ে দেয় আত্মত্যাগের মহিমা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সবকিছু উৎসর্গ করার মানসিকতা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের চেনা ছক, ক্লাস, প্রেজেন্টেশন ও ইনকোর্সের ব্যস্ততার মাঝেও ঈদের ছুটিগুলো যেন এক পরম স্বস্তি হয়ে আসে। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে এই ঈদের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো ক্যাম্পাসের যান্ত্রিকতা ভুলে মেস বা হলের ব্যাগ গুছিয়ে চিরচেনা বাড়ির পথে রওয়ানা হওয়া এবং পরিবারের সঙ্গে কোরবানির আনন্দ ভাগাভাগি করা। হাটে যাওয়া, পছন্দের পশু কেনা থেকে শুরু করে ঈদের দিনের চেনা ব্যস্ততা সকালে কসাই, দুপুরে রাঁধুনি, বিকেলে ডেলিভারিম্যান সবকিছুর মাঝেই মিশে থাকে এক অন্যরকম আবেগ ও ভালোবাসা। সব মিলিয়ে ঈদুল আজহা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং পরিবার, ত্যাগ ও মানবিকতার এক অনন্য উপলক্ষ।

ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাদিয়া জাহান প্রমি বলেন, আনন্দ, সম্প্রীতি ও ভালোবাসার এক অপূর্ব মেলবন্ধন নিয়ে আসে ঈদ। সব ব্যস্ততার ঊর্ধ্বে গিয়ে আত্মার সম্মিলনে প্রত্যেকের ঈদ হয়ে উঠে আরো প্রাণবন্ত আর আনন্দের। শুধু নতুন পোশাক বা উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, মানুষের হৃদয়ে সহমর্মিতা, ত্যাগ ও মানবিকতা বোধ জাগিয়ে তুলতে ঈদ অনন্য। ঈদ সমাজের ধনী-গরিব সবাইকে যে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেয়, আমার কাছে বরাবরই সেটি সবচেয়ে সৌন্দর্যের বিষয় বলে বিবেচিত হয়। বর্তমান ব্যস্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে ঈদ মানুষকে আবারও সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় করার সুযোগ এনে দেয়। তাই ঈদ আমাদের জীবনে শুধু উৎসব নয়, মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। সর্বোপরি, এই ইদে কোরবানি হোক মনের পশুর। এই পৃথিবী নিরাপদ হোক, শিশু ও নারীদের জন্য। সুবিচার পাক রামিসা সহ সব ভিক্টিমরা। ঈদ মুবারক।

সবমিলিয়ে, কুরবানির ঈদ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাছে কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি জীবনবোধ, ত্যাগ, দায়িত্ব ও সম্পর্কের গভীরতা উপলব্ধির একটি সময়। এই উৎসব শিক্ষার্থীদের যেমন আনন্দ দেয়, তেমনি তাদের মানবিক ও সামাজিক মূল্যবোধকেও সমৃদ্ধ করে তোলে।

/এমআর/