শিরোনাম

নোবিপ্রবির শিক্ষক দম্পতির বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

নোবিপ্রবি সংবাদদাতা
নোবিপ্রবি সংবাদদাতা
নোবিপ্রবির শিক্ষক দম্পতির বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) পরিসংখ্যান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. ইফতেখার পারভেজ পুইয়ান ও তার স্ত্রী প্রভাষক মীম্মা তাবাসসুম

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) পরিসংখ্যান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. ইফতেখার পারভেজ পুইয়ান ও তার স্ত্রী প্রভাষক মীম্মা তাবাসসুমের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম, নম্বর মূল্যায়নে অসংগতি, মানসিক হয়রানি এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভাগের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক পোস্ট ও মন্তব্যে নানা অভিযোগ প্রকাশ করায় বিষয়টি ক্যাম্পাসজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।

এর আগে সিলেবাসে অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষা সফরের বিল উত্তোলন এবং নম্বর টেম্পারিংয়ের অভিযোগ সামনে আসে। ওই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভাগের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে শুরু করেন। তাদের অনেকের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বিভাগে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যেখানে ভিন্ন মতের শিক্ষার্থীরা অ্যাকাডেমিক ও মানসিক চাপে থাকতেন।

সম্প্রতি বিভাগের ১৩তম ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী কবির হোসেন এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, পরিসংখ্যান বিভাগের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি বিষয়টি প্রকাশ্যে এনেছেন। তার ভাষ্য, পোস্ট প্রকাশের পর বিভিন্ন ব্যাচের অসংখ্য শিক্ষার্থী তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, তারা এখনও প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, অভিযোগ করলে অ্যাকাডেমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তিনি আরও বলেন, যদি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সত্যিই এমন ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়ে থাকে, তবে সেটি বিভাগের জন্য উদ্বেগজনক।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি অধ্যয়নরত আবু তারেক রনি। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ওই শিক্ষক দম্পতির নেওয়া কোর্সে তিনি ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাশার তুলনায় কম নম্বর পেতেন। তার প্রশ্ন, একজন শিক্ষকের কাছে সব শিক্ষার্থী সমান হওয়ার কথা হলেও কেন আলাদা পক্ষ বা গোষ্ঠী থাকবে। তিনি আরও দাবি করেন, সেই অভিজ্ঞতা থেকে সৃষ্ট মানসিক চাপের কারণে তিনি ওই বিভাগে মাস্টার্স করার সাহস পাননি।

ফেসবুকে প্রকাশিত বিভিন্ন মন্তব্যেও গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। ফয়সাল এম রহমান নামের এক শিক্ষার্থী দাবি করেন, নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীদের নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া হলেও মেধাবী অন্য শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত নম্বর পাননি। নিজের মন্তব্যে তিনি লেখেন, ‘স্যারের পক্ষে কথা বলা স্টুডেন্ট পায় ৬৯, আর আমাদের বিভাগের ডিনস অ্যাওয়ার্ড পাওয়া স্টুডেন্ট পায় ৬০। মার্কস টেম্পারিং ছাড়াও মানসিক হেনস্তার অনেক প্রমাণ আছে।’

পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত শিক্ষার্থী সুমাইয়া নূর জান্নাত নাবিহাও দীর্ঘ এক পোস্টে অভিযোগ করেন, প্রথম সেমিস্টার থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রথম হওয়া সত্ত্বেও শেষ বর্ষে নির্দিষ্ট শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে থিসিস বা প্রজেক্ট না করায় তিনি অ্যাকাডেমিকভাবে বৈষম্যের শিকার হন। তার দাবি, ১০০ নম্বরের ভাইভায় ইচ্ছাকৃতভাবে কম নম্বর দেওয়া হয় এবং ভাইভা বোর্ডে তাকে এমনভাবে অপদস্থ করা হয় যে কান্না করতে করতে বের হতে হয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ক্লাসে তাকে বারবার বলা হতো, ‘ভালো রেজাল্ট করলেই ভালো স্টুডেন্ট হওয়া যায় না’ এবং ‘তুমি কোনো কিছুরই যোগ্য নও’। তার ভাষ্য, এসব ঘটনার কারণে সর্বোচ্চ সিজিপিএ অর্জনের পরও ফ্যাকাল্টি ফার্স্ট হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।

১৩তম ব্যাচের আরেক সাবেক শিক্ষার্থী ইমন দত্ত তার পোস্টে দাবি করেন, এই শিক্ষক দম্পতির আচরণের কারণে তাদের ব্যাচের শিক্ষার্থীদের আড্ডার বড় একটি বিষয় ছিল হতাশা ও মানসিক চাপ। তার অভিযোগ, ১২তম ব্যাচ প্রথমবার নম্বর টেম্পারিংয়ের অভিযোগ তোলার পর সহকারী অধ্যাপক ইফতেখার পারভেজ পুইয়ান ১৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ফোন করে বিবৃতি ও স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যদিও শিক্ষার্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করেন।

ইমন দত্ত আরও দাবি করেন, ফলাফল খারাপ হওয়ার পর কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ডেকে বলা হয়েছিল, ‘টিচাররা চাইলে রেজাল্ট তুলতে পারে, নামাতেও পারে’। তার ভাষ্য, কিছু শিক্ষার্থী এতটাই মানসিক চাপে ছিলেন যে আত্মহত্যার চিন্তাও করেছিলেন।

বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী রাকিব রহমান তার পোস্টে পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষক কোরামের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং একটি ‘সিন্ডিকেট’ থাকার অভিযোগ করেন। তার দাবি, যে-সব শিক্ষার্থী শিক্ষক দম্পতির অপছন্দের ছিলেন, তাদের জুনিয়রদের সামনেও অপমান করা হতো। প্রিয় শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে অন্যদের তথ্য সংগ্রহ করা হতো বলেও তিনি অভিযোগ করেন। এমনকি আগের বিভাগীয় চেয়ারম্যানের সঙ্গেও ওই শিক্ষক দম্পতির বিরোধ ছিল বলে তিনি পোস্টে উল্লেখ করেন।

সহকারী অধ্যাপক মো. ইফতেখার পারভেজ পুইয়ান ও তার স্ত্রী প্রভাষক মীম্মা তাবাসসুম
সহকারী অধ্যাপক মো. ইফতেখার পারভেজ পুইয়ান ও তার স্ত্রী প্রভাষক মীম্মা তাবাসসুম

এদিকে, এর আগে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের সিলেবাসে শিক্ষা সফরের বিধান না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষা সফরের বিল উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে। ওই অভিযোগের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত শুরু করে। এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করছেন।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সহকারী অধ্যাপক মো. ইফতেখার পারভেজ পুইয়ান অস্বীকার করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বি-স্তর বিশিষ্ট মূল্যায়ন পদ্ধতির কারণে এককভাবে নম্বর কমানোর সুযোগ নেই এবং আমি ও আমার স্ত্রী কখনো একসাথে যুগল পরীক্ষক ছিলাম না, যার দাপ্তরিক প্রমাণ আছে। এছাড়া ভাইভার গোপনীয় নম্বর ফাঁস করা একটি অপরাধ। ক্লাসে ২০ মিনিট দেরিতে আসা শিক্ষার্থীকে পড়া বুঝার সুবিধার্থে পরবর্তী ক্লাসে আসতে বলা একজন শিক্ষকের স্বাভাবিক দায়িত্ব, কোনো মানসিক হয়রানি নয়। আমি কোনো রাজনীতির সাথে যুক্ত নই, সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিভাগে থেকে নিয়মিত ক্লাস নিই, যা শিক্ষার্থীরাই নিশ্চিত করবে।

তার স্ত্রী সহকারী অধ্যাপক মীম্মা তাবাসসুমকেও মার্ক টেম্পারিং ও মানসিকভাবে হেনস্তার কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি তা অস্বীকার করেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রাব্বানী বলেন, আমি ব্যাপারটি সম্পর্কে অবগত। আমি তদন্ত কমিটির সাথে বসবো, বসে পর্যালোচনা করবো। যদি আসলেই তারা দোষী হয় তাহলে আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থীর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে ওঠা এসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা উচিত। তাদের মতে, এতে বিভাগের অ্যাকাডেমিক পরিবেশ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

/এমআর/

বিষয়:

নোয়াখালী