শিরোনাম

ফিতা ক্যাসেটের সেই দিন আজ আর নেই

সুমগ্ন সৌর
সুমগ্ন সৌর
ফিতা ক্যাসেটের সেই দিন আজ আর নেই
তাকে তাকে সাজিয়ে রাখা জনপ্রিয় গানের ফিতা ক্যাসেট। সম্প্রতি পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীর গীতিকা রেকর্ডিং সেন্টারে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

আশি ও নব্বইয়ের দশকে পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলী ছিল বাংলাদেশের সংগীত জগতের প্রাণকেন্দ্র। তখন ফিতা ক্যাসেটের ব্যবসা ও গানের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। এখান থেকেই ক্যাসেটগুলো পৌঁছে যেতো সারাদেশের সংগীতপ্রেমীদের হাতে। নির্ধারিত হতো সংগীতশিল্পীদের জনপ্রিয়তা, ক্যারিয়ার এবং অডিও ইন্ডাস্ট্রির ভাগ্য।

নতুন অ্যালবাম বাজারে আসলে উৎসবের আমেজ বিরাজ করতো। ঈদ-পার্বণসহ নানা উৎসব ঘিরে সংগীতপ্রেমী বা ব্যবসায়ীদের কর্মব্যস্ততায় মুখর থাকতো পুরো এলাকা। এখানে প্রয়োজন ছাড়া কারও একটু কথা বলার বা অবসরের ফুসরত ছিল না। সময়টা ছিল দেশের সংগীতের সোনালী যুগ।

কোলাহলমুখর সেই পাটুয়াটুলী এখন অনেক নীরব, আগের সেই জৌলুস নেই। ফিতা ক্যাসেটের সোনালী দিন আজ ধূসর, ধূলোময়। প্রযুক্তির পরিবর্তনের ফলে সিডি থেকে এমপিথ্রি হয়ে ইন্টারনেটের যুগে প্রবেশ করেছে গান। ফলে ২০০০ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে ফিতা ক্যাসেটের বাজার সংকুচিত হতে থাকে।

একসময় এই পাটুয়াটলীতেই ছিল দেশের শীর্ষস্থানীয় অডিও কোম্পানি, রেকর্ডিং স্টুডিও এবং ক্যাসেট ডিস্ট্রিবিউটর কোম্পানি। সারগাম, সাউন্ডটেক, সংগীতা, লেজারভিশন, অনুপম, সিডি চয়েস, একতার মিউজিকসহ শতাধিক প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা পরিচালিত হতো এখান থেকেই। কিন্তু আজ অনেকেই তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। কেউবা অন্যত্র ছোট পরিসরে প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে টিকে আছে।

ফিতা ক্যাসেট বা স্টুডিও বা ডিস্ট্রিবিউটদের সেই দোকানগুলোতে এখন ওঠেছে কাপড়, প্লাস্টিক ও নানা বাহারি জিনিসপত্র।

বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটিমাত্র দোকান এখনো টিকে আছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাটুয়াটুলীর নুরুল হক মার্কেটের দোতলায় গিয়ে দেখা যায়, ‘এস এস প্রোডাক্টস’ ও ‘গীতিকা রেকর্ডিং সেন্টার’-এর ছোট্ট একটি দোকান। তাকে- তাকে সাজানো রয়েছে ধুলোমাখা সোনালী দিনের জনপ্রিয় সব অ্যালবাম। বাজছে পুরোনো দিনের গান। কাজ করছেন দুই জন। এদের একজন প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ও তৎকালীন সংগীতজগতের জীবন্ত ইতিহাস সন্তোষ কুমার রায়। সংগীত অঙ্গনের সবাই ‘সন্তোষ দা’ নামে চেনেন। মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

কথা বলা শুরু করতে যেনো টেপ রেকর্ডারের মতো অনর্গল বাজতে থাকেন। জানালেন সংগীতের প্রতি ভালোবাসার কথা। বলতে থাকেন ফিতা যুগের নানা ঘটনা ও জনপ্রিয় শিল্পীদের শুরুর কথা। তিনি বলেন, ‘ষাটের দশকে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজে পড়ার সময় সংগীতের প্রতি ভালো লাগা থেকে পাটুয়াটুলী আসতাম। পছন্দের গান সংগ্রহ করতাম। তারপর পড়াশোনা শেষ করে গান ঘিরেই ব্যবসা শুরু করি। এখনো টিকিয়ে রেখেছি।’

Untitled design (43)
তাকে তাকে সাজিয়ে রাখা জনপ্রিয় গানের ফিতা ক্যাসেট ও সিডি। সম্প্রতি পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীর গীতিকা রেকর্ডিং সেন্টারে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

অডিও ক্যাসেটের সোনালী দিনগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখনকার জনপ্রিয় সকল শিল্পীর নিয়মিত যাতায়াত ছিলো এখানে। গান বের করার অনুরোধ করতেন অথবা যাদের গান রেকর্ড হয়েছে তাদের অ্যালবাম কবে বাজারে আসবে খবর নিতেন। ঈদের সময় কথা বলারও সময় পেতাম না। দোকানের সামনে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখতাম-আর রেকর্ড হবে না।’

তবে এখনো সৌখিন সংগীতপ্রেমী কেউ-কেউ ওনার কাছে আসেন গান সংগ্রহ করতে। কারণ এখান থেকে গান সংগ্রহ করলে সাউন্ড কোয়ালিটি ভালো পাওয়া যায়। সন্তোষ কুমার রায় ভালোবেসে টিকিয়ে রেখেছেন ব্যবসা। ছেড়ে যাননি প্রিয় পাটুয়াটুলী।

ত্রিশ বছর ধরে ‘গীতিকা রেকর্ডিং সেন্টারে’ রেকর্ডিংসহ নানা কাজ করেন মো.জাভেদ। তিনি বলেন,‘আগে কাজ করতে করতে খাওয়ার সময়ও পেতাম না। এখন অনলাইন, ইন্টারনেট এসব আসার পরে মানুষ গানের জন্য কম আসে।’

ফিতা ক্যাসেটের রমরমা ব্যবসার সময়ের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন শব্দ নিয়ন্ত্রক আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন,‘আগেতো মানুষের ভিড়ে হাঁটাচলা করা যেতোনা। একেক সময় একেক শিল্পীর গান হিট হতো। কী আনন্দ, কী হইহুল্লোড়! সেই দিন আর নাই।’

আগে ক্যাসেটের দোকানে কাজ করতেন আলী হোসেন। এখন কাজ করেন সিসিটিভি ক্যামেরার দোকানে। কথা প্রসঙ্গে জানালেন, ‘আগের মালিক প্রায় ১৫ বছর আগে ব্যবসা বাদ দিয়েছে। তাই সংসার চালাইতে এই কাজ করি। ক্যাসেটের দোকানে যখন ছিলাম তখন অন্যরকম একটা মূল্যায়ন ছিলো।’

বাস্তবে না হলেও অনেকের স্মৃতির ফিতায় এখনো ঘুরতে থাকে পাটুয়াটুলীর ফিতা ক্যাসেটের দিন। আর বাজতে থাকে চিরচেনা সেই গানগুলো। এসব গানের মধ্যে আছে সত্তরের দশকের ‘আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন, কপোলের কালো তিল পড়বে চোখে/ফুটবে যখন ফুল বকুল শাখে, ভ্রমর যে এসেছিলো জানবে লোকে।’এবং নব্বই দশকের জনপ্রিয় ব্যান্ডশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর সেই হৃদয়ছোঁয়া গান ‘আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি, তাই তোমার কাছে ছুটে আসি/আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি, তাই তোমার কাছে ছুটে আসি।’ এসব গান এখনো অনেক মানুষ গভীর আগ্রহ নিয়ে শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

/বিবি/