শিরোনাম

বরফের দেশে অদ্ভুত আইন: ভাল্লুকের জন্য জেলখানা!

সিটিজেন ডেস্ক
বরফের দেশে অদ্ভুত আইন: ভাল্লুকের জন্য জেলখানা!
চার্চিলে মেরু ভাল্লুকের কারগার। ছবি: ম্যানিটোবা প্রদেশ

কানাডার উত্তরের ছোট্ট শহর চার্চিল। চারদিকে বরফ, সামনে হাডসন উপসাগর, আর শীত নামলেই হাজির হয় বিশ্বের বৃহত্তম স্থল মাংসাশী প্রাণী, মেরু ভাল্লুক। খাবারের সন্ধানে কিংবা বরফ গলার কারণে পথ হারিয়ে এসব ভাল্লুক প্রায়ই ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। মানুষের জন্য তা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি ভাল্লুকের জন্যও প্রাণঘাতী হতে পারে। কিন্তু হত্যা নয়, এই সংকটের ভিন্ন সমাধান বেছে নিয়েছে শহরটি। এখানে বিপথগামী ভাল্লুকদের জন্য রয়েছে এক বিশেষ ‘কারাগার’, যা বিশ্বজুড়ে পরিচিত ‘পোলার বিয়ার জেল’ নামে।

মেরু ভাল্লুকের কারাগারের ভেতরের দৃশ্য। ছবি: ম্যানিটোবা প্রদেশ
মেরু ভাল্লুকের কারাগারের ভেতরের দৃশ্য। ছবি: ম্যানিটোবা প্রদেশ

চার্চিলকে অনেকেই বলেন ‘পোলার বিয়ারের রাজধানী’। প্রতিবছর শরৎ ও শীতের সন্ধিক্ষণে হাডসন উপসাগরের পানি জমে বরফে পরিণত হওয়ার আগে উপকূলজুড়ে অপেক্ষা করে থাকে শত শত মেরু ভাল্লুক। এ সময় খাদ্যের অভাব তীব্র হয়ে ওঠে। ফলে শহরের আশপাশে মানুষের বসতিতে ঢুকে পড়া তাদের জন্য অস্বাভাবিক নয়।

এই বাস্তবতায় স্থানীয় বন্যপ্রাণী কর্তৃপক্ষ চালু করেছে সুসংগঠিত একটি ব্যবস্থাপনা। কোনো ভাল্লুক শহরে ঢুকলে প্রশিক্ষিত ‘পোলার বিয়ার প্যাট্রোল’ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। প্রথমে শব্দ, আলোক বা অন্যান্য পদ্ধতিতে তাকে তাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। তাতে কাজ না হলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে তাকে ট্রাঙ্কুইলাইজার ডার্টের মাধ্যমে অচেতন করা হয়।

সীল মাছের মাংস দিয়ে পাতা ফাঁদে একটি ভাল্লুক ধরা পড়েছে। ছবি: ম্যানিটোবা প্রদেশ
সীল মাছের মাংস দিয়ে পাতা ফাঁদে একটি ভাল্লুক ধরা পড়েছে। ছবি: ম্যানিটোবা প্রদেশ

এরপর শুরু হয় আরেকটি ব্যতিক্রমী প্রক্রিয়া। অচেতন ভাল্লুকটিকে নিয়ে যাওয়া হয় একটি সুরক্ষিত স্থাপনায়। কংক্রিটের ছোট ছোট সেলঘেরা সেই ভবনই ‘পোলার বিয়ার জেল’। এখানে প্রতিটি ভাল্লুককে আলাদা কক্ষে রাখা হয়, যাতে তারা একে অপরের ক্ষতি না করে। পুরো সময়জুড়ে প্রাণীগুলোর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয় বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে।

এই বন্দিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এ সময় ভাল্লুকগুলোকে খাবার দেওয়া হয় না। কর্তৃপক্ষের মতে, এর উদ্দেশ্য হলো তাদের মানুষের বসতি বা খাবারের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক তৈরি না হওয়া। অর্থাৎ, তারা যেন না শেখে যে শহরে এলেই খাবার পাওয়া যায়।

একটি বন্দী মেরু ভাল্লুক জেলের শিকের ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। ছবি: ম্যানিটোবা প্রদেশ
একটি বন্দী মেরু ভাল্লুক জেলের শিকের ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। ছবি: ম্যানিটোবা প্রদেশ

কয়েক দিন বা কখনো সপ্তাহখানেক পর, পরিস্থিতি অনুকূল হলে বিশেষ করে উপসাগরের বরফ যথেষ্ট শক্ত হলে ভাল্লুকগুলোকে হেলিকপ্টারে করে দূরবর্তী এলাকায় নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে তারা স্বাভাবিক আবাসস্থলে ফিরে যেতে পারে এবং মানুষের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি কমে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পদ্ধতি ‘প্রবলেম অ্যানিম্যাল’ বা ‘সমস্যাজনক প্রাণী’ ব্যবস্থাপনার একটি মানবিক ও কার্যকর মডেল। উত্তর আমেরিকার অনেক অঞ্চলে যেখানে এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রাণী হত্যা করা হয়, সেখানে চার্চিল দেখাচ্ছে ভিন্ন পথ। ফলে একই সঙ্গে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে এবং সংরক্ষিত থাকছে বিপন্ন প্রজাতি।

মেরু ভালুকদের জেলে রাখার আগে এবং সেখান থেকে বের হওয়ার পরে ওজন মাপা হয়। ছবি: ম্যানিটোবা প্রদেশ
মেরু ভালুকদের জেলে রাখার আগে এবং সেখান থেকে বের হওয়ার পরে ওজন মাপা হয়। ছবি: ম্যানিটোবা প্রদেশ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলে যাওয়ায় মেরু ভাল্লুকের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে মানুষের সঙ্গে তাদের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে চার্চিলের ‘পোলার বিয়ার জেল’ শুধু একটি বিচিত্র ব্যবস্থা নয়, বরং ভবিষ্যতের সহাবস্থানের এক বাস্তব উদাহরণ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

/এসএ/